রবিবার, ৮ মার্চ, ২০১৫

গল্পঃ “নিবিড় ইচ্ছে”

২৫ আগস্ট ২০১২ ইং রচিত ...
                
।।একঃ ‘আলো আঁধারী বিভ্রম’।।

ইচ্ছের ঘুম ভেঙ্গেছে। মাথাটা ভার লাগছে! ঘাড় কাত করে বোঝার চেষ্টা করছে ও কোথায় এখন! ঘরটা খুব অন্ধকার! এত অন্ধকার! এত রাত এখনো! ওফ কখন সকাল হবে!
ডান কাত থেকে গড়িয়ে বাম কাত হয়ে আবার একটু ঝিমিয়ে পরে ও। আর কত! আর কত এভাবে ঘুমিয়ে থাকতে হবে!
খুব ক্ষুধা পেয়েছে। ওফ! অসহ্য! এই ক্ষুধবোধ যদি না থাকতো তাহলে আরো ভালো হতো। সারাদিন এই ঘরটায় বন্দী করে রাখতো নিজেকে। বাইরের কারো সাথে আজকাল অনেকদিন দেখাই হয় না। যারা এই বাড়িটায় আছে তাদের সাথেও দেখা না হলে ভালো হতো।   
ইচ্ছে জানে না এখন সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে চলেছে। বাইরে রোদ ঝলমল করছে। সোনা রোদ! ঝকঝকে রোদেলা প্রকৃতি ইচ্ছের মনকে এখন আর সতেজতা দেয় না। এখন প্রতিটি জীবন্ত দিন পাথর চাপা হয়ে আসে বুকের ভেতর! কাউকে নিজের সামনে আসতে দিতে চায় না ওকারো সামনে নিজেও যেতে চায় না।

।। দুইঃ ‘উৎসব আয়োজন’।।

‘এই লাইজু, আমি কিন্তু হাবিবের গান গাবো!...’
‘ধুর! কি যে বলো ভাইয়া! হাবিব কেন, বালামবালাম’ মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে উঠে তানি।
‘আসিফ ইকবাল হলে কেমন হয়!’ বলে উঠে মাহী
‘আরে যাহ মাহী! তোরা আছিস পিছনে পরে। বিয়েশাদীতে এইসব বাংলা গানটান মানায় না। হিন্দী হিট ফিল্মগুলোর গান সিলেক্ট কর। তারপর ঠিক কর কে কোন পার্ট করবি!’ কথাগুলো ওদের মধ্যে সবার চেয়ে সিনিয়র ও মাত্র কলেজে পা দেওয়া মুকুলের।
মিসেস আজিজ শুনে যাচ্ছেন কথাগুলো। বসার ঘর থেকে ছুটে আসছেবাড়ি ভর্তি আত্মীয় স্বজন। ভালোই লাগছে। অবশেষে ছেলে বিয়ে করতে যাচ্ছে! বোধহয়!
তিনি বসে আছেন বিছানায়। হাফ ডজন সোনার গয়নার বাক্স তার সামনে। ছেলের বিয়ে। একমাত্র ছেলে। নিবিড়।
কোন অপূর্ণতাই রাখবেন না তিনি। একবার নিজের পছন্দ চাপিয়ে দিতে গিয়ে যে কষ্ট পেয়েছেন এবার সেটা আর করবেন না। সবকিছুই নিবিড়ের পছন্দমত করবেন তিনি।
তবে, বুকের ভেতরে চাপা একটা উত্তেজনা। শেষ পর্যন্ত সবকিছু ঠিক থাকবে তো। ইচ্ছের একটা ব্লাউজ এখনো আলমারীতে পরে রয়েছে। আর শাড়িগুলোরও এখনো কিছু কিছু রয়ে গেছে। একটা বিয়ের জন্য কেনা এত্তগুলো শাড়ি কি কোন উপলক্ষ্য ছাড়া সবাইকে দেয়া যায়! মনে রেখো’তে শুধু প্রথম তিনটে শাড়ি ফেরত নিয়েছে। বাকিগুলো থেকেও কিছু কিছু নিজের বোনদের মধ্যে বিলিয়েছেন। এর পরেও রয়ে গেছে কিছুদেখা যাক এই বিয়েতে সেগুলো কাজে লাগানো যায় কিনা। তবে ভেবে চিন্তে দূরে কাউকে দিতে হবে যাদের সাথে ছেলের বৌয়ের দেখা হবার সম্ভাবনা কম। নইলে কথায় কথায় আবার কি ফাঁস হয়ে যায়!
ছেলেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মুখ চোখ লক্ষ্য করেন তিনি। বুঝতে চান ছেলে খুশি হয়েছে তো? আসলেই রাজী তো? তাহলে আগের বার অত নাটকীয়তার কি দরকার ছিলো! এবারেও তো...! তিনি আর ভাবতে পারেন না।
ছেলেটা যে কি চায়! নিজে পেটে ধরেছেন অথচ নিজেই বুঝতে পারেন না। মাঝে মাঝেই তিনি সবার আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। আর উপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করেন আল্লাহ তুমি এবার সবকিছু ঠিক ঠাক মিটিয়ে দিও। কোনমতে কবুল করা হয়ে গেলে আর ছেলে বউ নিয়ে ফিরে গেলে তিনি শান্তি পান। এই চাপ আর তিনি সহ্য করতে পারছেন না।  

।।তিন-‘চেনা অচেনা নির্লিপ্ততা’।।

‘নিবিড়, তুমি তাহলে বিয়ে করতে ফিরেছো?’
‘হ্যাঁ, কেন করবো না?’
‘তোমার ইচ্ছের স্বামী হবার কথা কার!’
‘তুমি তো আমাকে সময় দিলে না। তাছাড়া তোমাকে ফিরিয়ে দিয়ে আমি ঠিক কাজটিই করেছিলাম। পরে শুধু শুধু দুটো জীবন নষ্ট হতো।’
‘কিভাবে? কি দোষ ছিলো আমার?’
‘তোমার কোন দোষ ছিলো না! দোষ আমার নিয়তির!’
‘মানে?’
‘আসলে আমার পরিবার তোমাকে নিয়ে অনেক বেশি তাড়াহুড়া করেছিলো। তোমাকে আরো একটু বুঝতে সময় দরকার ছিলো আমার।’
‘নিতে সময়। কে মানা করেছিলো? তার বদলে তুমি পালিয়ে গেলে!’
‘না! আমি পালিয়ে যাইনি। বিশ্বাস করো। তোমার জন্য মানে আমাদের দুজনের জন্য কক্সবাজারে হানিমুনের রুমও বুকিং দেয়া হয়ে গিয়েছিলো। যেটা আমি তোমার জন্য সারপ্রাইজ রেখেছিলাম। প্রথম দেখার দিন তোমার ঐ একটা ইচ্ছের কথা আমি ভুলিনি।’
‘তুমি মিথ্যে বলছো, নিবিড়!’
‘না! না! ইচ্ছে, তুমি জানো না! তুমি অনেক কিছুই জানো না।’
‘সব মিথ্যে, নিবিড়। তোমার ফ্যামিলি। তোমার বোন। মা। সবাই আমাদের ভালোমানুষীর সুযোগ নিলো। কি পেলো ওরা? কি পেলে তোমরা আমার মনটা ভেঙে দিয়ে, বলো? কি পেলে?’
‘না, ইচ্ছে, না! নাআআআ! তুমি...’ ঘুমের মধ্যে ছটফট করতে করতে বিছানায় হঠাত উঠে বসে নিবিড়জেগে বসেও বলতে থাকে, ‘আমি কাউকে ঠকাই নি। আমি ইচ্ছের ভালো চেয়েছিলাম। সবাইই ঐ বিয়েতে অরাজী ছিলো। অথচ, আগে কেউ বলেনি আমাকে। যখন আমি কথাটা তুললাম, মেয়েটা যেন একটু কম রোমান্টিক! তখন একেক জন একেক মন্তব্য ছুঁড়ে দিলো। আমি তো তোমাদের কিচ্ছু জানতাম না। শুধু মাঝে মাঝে ছবি দেখেছি। দেশ থেকে আমার মা আমাকে ছবি পাঠাতে বড় আপুকে কনভিন্স করতো। আমি বুঝতে পারতাম। সব সময় ‘ভালো’ শুনতে শুনতে একটা সময় আমি হ্যাঁ বলে ফেলি। বিয়েতে রাজী হয়ে যাই। কিন্তু, ইচ্ছে, তুমি তো আমাকে ততটা জানার সুযোগ পাওনি। একটা অচেনা ছেলেকে এভাবে অন্যদের কথায় কনভিন্স হয়ে বিয়ে করে তুমি কি নিজেও একটা বিশাল ভুল করতে না? তোমাকে আমি এই নষ্ট হওয়া জীবন হতে রেহাই দিতে চেয়েছিলাম। আর তুমি আমাকে ভুল বুঝলে!’
বিছানায় উঠে বসে নিবিড় নিজের হাতের তালুর দিকে চোখ রেখে কথাগুলো মনে মনে বলছিলো। অনেকটা সময় পরে আবার বালিশে মাথা ছোয়ালো। পুরনো ঘটনাগুলো কেন বারে বারে ফিরে ফিরে আসছে!  
মায়ের মুখের দিকে তাকালে কেমন কষ্ট হতে থাকে। আগের বার যখন এসেছিলো, মায়ের মধ্যে যে উচ্ছ্বলতা দেখেছিলো সেটা যেন কিছুটা স্তিমিত এবার। মায়ের ভাব ভংগীই বলে দেয় নিবিড়ের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিচ্ছেন তিনি। কিছুটা যেন ভয়ে ভয়ে। যেন অনাকাংখিত কিছু হয়ে যাওয়ার দুঃশ্চিন্তায় রয়েছেন। কিন্তু, এমনটা তো ও চায়নি। ও যদি শুধু নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে বিয়ে করবে তাহলে এখানে আসতে হয়! ফ্লোরিডায় কি বাঙ্গালী মেয়ে নেই? শুধু বাবা-মায়ের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে ও ছুটে আসলো এখানে। অথচ এরা সব ওকেই দোষী করে রেখেছে। আগে বুঝতে পারেনি।
ও কি করবে? ও জীবনসঙ্গিনী হিসেবে এমন কাউকে চেয়েছে যাকে দেখলে হৃদয়ে কম্পন উঠে। সময় থমকে যায়।
শুধু প্রেম নয়। ওর পছন্দ ক্যারিয়ার সচেতন হাসিখুশি মেয়ে। তা নইলে ঘরে বসে বসে ফরেন কান্ট্রিতে বোর হয়ে যাক বউটা তেমনটি ও চায় নিএজন্যেই ভালো রেজাল্ট জরুরী। ভালো চাকরি বা গবেষণা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। মন ফ্রেশ থাকবে। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হাজবেন্ড যতটা সময় কাজ নিয়ে ল্যাবে ব্যস্ত থাকবে ততটা সময় তার নিজেরও একটা জগত থাকবে।
ইচ্ছের মধ্যে সবকিছু না পেলেও ওর ইউএসএ’তে উচ্চ ডিগ্রি নিতে চাওয়ায় ও খুশিই হয়েছিলো।
কিন্তু প্রবলেম বাধালো ওর বর্তমান পড়াশুনাটা। এক বছর সময়ের মধ্যে ও মাসখানেক ছুটি পাবে জেনে নিবিড় প্রস্তাব করলো, ‘আমি রিটার্ন টিকেট করে দেব। তুমি তাহলে আম্মার সাথে ঐ ছুটিতে আমার কাছে গিয়ে থাকতে পারবা।’
কিন্তু ইচ্ছের জবাব শুনে ও থ মেরে গিয়েছিলো। ইচ্ছের উত্তরটা ছিলো এরকম, ‘যে ছুটি পাবো সে সময় আমাকে ভালো করে পড়াশুনা করতে হবে না? ছুটিতে বাইরে গেলে পরবো কিভাবে? ভালো রেজাল্ট না করতে পারলে আমি কিভাবে বাইরে পড়বো?’
‘বাহ! ও যদি এখন এখানেই থাকবে তাহলে কি লাভ বিয়ে করে। বিয়েটা না হয় পরের বছরই তাহলে হোক।’
একটা ইয়াং মেয়েকে বিয়ে করে দেশে রেখে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। ওকে পাহাড়া দিয়ে রাখবে কে! তার চেয়ে কথাবার্তা সব ঠিকঠাক থাক। এক বছরে ইচ্ছের মন যদি পরিবর্তন না হয়ে থাকে বিয়েটা এখানেই হবে। কিন্তু এখন নয়।
কিন্তু, না। ইচ্ছের মামা বাড়ির কেউ এটা মেনে নিতে পারলো না। ইচ্ছেরও নিজের যেন বলার কিছু নেই। নিবিড়ের ক্রমশ ধারনা গেড়ে বসলো যে আসলে ইচ্ছের মধ্যে ওকে বিয়ে করার ব্যাপারে সেরকম আগ্রহ নেই। উন্নত বিশ্বে পড়বার এমন মাধ্যমকে ও বা ওর ফ্যামিলি কিছুতেই ছাড়তে রাজী নয়! তাই বিয়েটা তখনি হয়ে যাওয়াটাই ওরা চাইছে।
বিয়ের নামে একটা রোবটকে চায়নি কখনই নিবিড়। ওর দরকার একটা কথা বলার মানুষ। দুজনের প্রতি আন্তরিকতা থাকলে দূরে থেকেও কাউকে মানসিক সংগ দেওয়া যায়। এই মেয়ে কি তা দেবে? মানসিক গ্রোথ কম আছে মেয়েটির। কেউ বুঝলো না। কেউ বুঝলোনা মেয়েটির মধ্যে কি সমস্যা। শুধু সুইট দেখতে দেখেই সবাই পাগল হয়ে গেছে।
ফ্যামিলি থেকে কেউ বুঝতেই চায় না, আগে ছেলে মেয়ের পরস্পরকে বোঝা দরকার। তারপর বিয়ে ঠিক করা দরকার। তা নয়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ সেটেল ম্যারেজে বিয়ে সম্পূর্ণ ঠিক হয়ে যাওয়ার পরে তারপরে আসল দুজনের কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়। ততদিনে পছন্দ না হয়ে উঠলেও অনেক মেয়েই সেই বিয়ে মেনে নেয়। এমনটা একজন শিক্ষিত সংস্কৃতিবান সচেতন পুরুষ নিবিড়ের জীবনেও ঘটবে!
এক বুক কষ্ট নিয়ে নিবিড় সে বার ফিরে গেছে।

।।তিন- ‘কাগজের খেলাঘরে সলতের আগুণ’।।

‘তুমি কি বলছো, এইসব?’
‘হ্যাঁ, আমার তো তাই মনে হয়। নইলে এত্ত কেনাকাটা। তুমি বুঝে দেখো, নিজের বিয়ের কেনাকাটা করতে কি কোন মেয়ে বের হয়? পিদিমের হাতে আমি এত্ত শপিং ব্যাগ দেখলাম।’
‘তোমাকে দেখেনি?’
‘হ্যাঁ, দেখেছে। একটু আগেই যেখানে আনন্দ ঝিলিক দিচ্ছিলো চোখেমুখে আর যখনি আমার দিকে চোখ পরেছিলো আমার দিকে, কেমন যেন আনন্দটা দপ করে নিভে যেতে দেখলাম ওর চোখে। আমাকে ওখানে আশা করেনি। কেমন বিব্রত হয়ে গেলো যেন। এগিয়ে এসে কথাও বললো না একটু।’
‘ওরা তো জানিয়েছিলো পিদিমের একটা কিছু ব্যবস্থা হয়ে গেলে নিবিড় আর ইচ্ছের কথাটা নিয়ে ভাববে।’
‘তুমি যে কি বলো না! ওরা যদি সেটাই ভাবতো তাহলে এই এক বছরে আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখতো। পিদিমের বিয়ে একটা ওযুহাত মাত্র।’
‘থাক, কণ্ঠ নামাও। ইচ্ছে শুনতে পাবে।’

ইচ্ছে উঠেছিলো ওয়াশ রুমে যাবে বলে। এতক্ষণে আপু ও দুলাভাইয়ের প্রতিটা কথাই শুনেছে ও।
‘ওফ, যতই ভুলতে চাই, ততই এরা দৃশ্যের পরে দৃশ্য তৈরি করতে থাকে। এদেরও কি মান সম্মান নেই কিছু! একটা জীবনের সব আশা না হয় শেষ। স্বপ্ন শেষ। তাই বলে একটা পরিবারের সবার এটা নিয়ে সময় নষ্ট করার কোন মানে আছে! এরা কেউ এটা নিয়ে ভাবাভাবি বন্ধ করে না কেন?’
আস্তে আস্তে হেঁটে হেঁটে নিজের ঘরে ফিরে আসে ইচ্ছে। ইচ্ছে! নামটা কে রেখেছিলো ওর! বাবা! যে ওর ইচ্ছে পূরণ করতে পারার ভয়েই বোধহয় পৃথিবী ছেড়েছিলেন।
রাত তিনটা বাজে। ভোর হতে আর বেশি দেরী নেই। বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে থাকার পরেও দু’চোখ আর এক করতে পারে না।
ঘুমাতে চেষ্টা করেও না পেরে কিছুটা সময় পরে উঠে বসলো।
নিবিড় তাহলে ফিরেছে। এক বছর পরে ঠিকই ফিরে এলো। বিয়ে করবে নিশ্চয়ই। ওয়ার্ডরোব খুলে শাড়ির পাল্লাটা খুলে তাকিয়ে রইলো। নিবিড়দের বাড়ি থেকে পাঠানো একটা শাড়ি ওর কাছে এখনো রয়ে গেছে। যেটা ও কাউকে দেখতে দেয়নি। লুকিয়ে রেখেছিলো।
জামদানী শাড়ি! লাল রঙের। বিয়ের প্রথম রাতের পর সকালে পরার জন্য দিয়েছিলো ওরা। সেই মিষ্টি সকালটা জীবনে আর এলো না।
‘এতদিন পরে এই শাড়ি রেখে লাভ কি! কারো চোখে পরলে কথা উঠবে। তার চেয়ে পুড়িয়ে ফেললে! গন্ধ ছড়াবে? বাথরুমে নিয়ে যদি পুড়াই?’
ইচ্ছের মনে প্রতিশোধ জ্বলে উঠলো। উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে ও ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। হাতে শাড়িটা। লাল জামদানী।

।।পাঁচঃ ‘শুকনো ফুল’।।

ভোর ছটায় কে ফোন দিলো? মিসেস আজিজ বেশ বিরক্তি নিয়ে ফোনে হ্যালো বলেই অবাক এবং উচ্চ চিৎকার করে উঠলেন, ‘ক্কক্কিইই!’
বিয়ে বাড়িতে অনেক আত্মীয় স্বজন। সবার ভিড় ছাপিয়ে নিবিড়কে কিচ্ছু না বলে তিনি একাই বের হলেন। অনেকটা নিশ্চুপে। কাউকে কিছু জানালেন না।
গাড়ি ধানমন্ডি এলাকা হতে ছাড়িয়ে গাজিপুরের দিকে ছুটলো। দেড় ঘন্টার জ্যাম ছেড়ে গাড়ি যখন ইচ্ছেদের বাড়ির কাছাকাছি এলো, ওরা দেখতে পেলো বাড়িটা অনেক লোকে লোকারণ্য।
মিসেস আজিজকে দেখতে পেয়ে ইচ্ছের বড় বোন ছুটে এলো, ‘আপা! সব শেষ! সব শেষ হয়ে গেছে আপা! সব শেষ’ বলে কান্নায় ভেঙে পরলো।
কান্নার বেগে থাকা নীড়কে কোনমতে জিজ্ঞেস করলো মিসেস আজিজ ‘কিভাবে হলো?’
জানি না। সকালে ঘুম হতে উঠে নাশতার আয়োজন করি। ইচ্ছে তো বিশেষ ঘর ছেড়ে বেরোয় না। আপনাদের তো জানানো হয়নি। ওর একটু নিউরোর প্রবলেম শুরু হয়েছে। আমাকেই ওর নাশতা খাওয়ানোর জন্য ঢুকতে হয় ওর রুমে। ওকে রুমে না পেয়ে এটাচ বাথরুমে একটু ফাঁক দেখে ঢুকি। আর তারপরই দেখি মেঝেতে বসে রয়েছে। ঘাড় কাত করে। যেন ঘুমুচ্ছে। পিছনে থেকে ডাক দিয়েও সাড়া না পেয়ে ঠেলা দিতেই কাত হয়ে পরে গেলো। তারপরে ডাক্তার ডাকা হলো। তিনি এসে কি বলবেন। হার্ট এটাক হয়েছে বলে। আপা, ও বড় অভিমান নিয়ে চলে গেলো। আপা, এতটুকু মেয়েটা! আপাগোওও, আপা কেন এমন হলো? কেনওও...
আরেক দিক থেকে ছুটে এসে যোগ করলো ইচ্ছের দুলাভাই, ‘লাল জামদানী পরা ছিলো। ঐ শাড়ি ও কখন পরেছিলো তা আমরা কেউ জানি না।’
ঝড় যে কখন কোন দিক থেকে আসে তা কেউ আগে থেকে জানতে পারে না। কিন্তু মনের ভেতরে যে আরেকটা অচেতন অংশ আছে সে কি বুঝতে পারে? তা নইলে নিজের ছেলের নতুন বিয়ের খুশি কেন তাকে স্পর্শ করছিলো না! কেন তিনি স্বস্তি পাচ্ছিলেন না! কেন যেন কোথাও একটা অঘটনের আভাস তাকে অস্থির করে তুলছিলো! এই কি সেই বিপদাশংকা! নিজের ছেলে বেঁকে বসার পরে ইচ্ছের জন্য ভালো ভালো পাত্র খুঁজে মিলিয়ে দিতে উনি চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু, বিধাতার নিয়মের বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের আসবে কি করে! তাই বলে মেয়েটা এত জলদি সবাইকে ছেড়ে চলে যাবে তা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।

মন ভার করে শেষ বেলায় তিনি নিজের গাড়িতে চড়ে বসলেন। গাড়ি চলতে শুরু করলো...

(সমাপ্ত) 

কোন মন্তব্য নেই: