১৫ ডিসেম্বর (বুধবার),
২০১০
৩:১৩
অপরাহ্ন
আই য়্যাম শ্রাবণ। হাউ আর ইউ, মাই সুইট হার্ট? ডূ ইউ নো, ইউ আর দি বেস্ট রোজ অফ অল রোজেস! ইফ ইউ ওয়ান্ট, আই বিল্ড আপ মাই হাউস ইন দি মুন। বিলিভ ইট অর ন্ আই উইল লাভ ইউ।শ্রাবণ!"
টুং টুং ! করে বেজে উঠল সেল ফোনটা। মেসেজ এসেছে। রিফাত বসে ছিলো ড্রয়িং রুমে। পাশেই খালামনি আর মাও আছে।
মেসেজটি পেয়ে মা এবং ছোট খালামনির দিকে তাকায়। ওঁরা কেন ওর দিকে তাকিয়ে হাসি দিচ্ছে! তাহলে কি এই মেসেজটা পাঠিয়েছে যে, তা কি ওদেরই কারসাজি? রিফাত গিয়ে ধরলো ছোট খালামনিকে......"এই
খালামনি, দেখতো, এই মেসেজটা কে পাঠাল? তোমার চেনা কেউ? কাউকে আবার ভাব করতে পাঠাওনি তো!"
খালামনিতো সুন্দর একটা হাসি দিল আবারও। আর বলল, "নাহ, কি যে বল তুমি? তোমার সাথে কেউ নিশ্চয়ই মজা করেছে, দেখ গে!"
দেখে ওর সন্দেহ আরো গাঢ় হল......"হুম, এটা খালারই কাজ!"
"এটা কার কাজ বের করতেই হবে আমাকে।" নতুন নাম্বার নিয়েছে রিফাত। ওর
বন্ধুরাও ওর সাথে কেউ কেউ মজা করে। তাদের কারও কাজ ও হতে পারে। কে হতে পারে! উফ, আমাকে জানতেই হবে। রিফাতের মাথায় একটা পোকা ঢুকে গেছে।
কিন্তু, ভেবেই মরা। কেউ আর স্বীকার করেনা। কে জানে আমাকে নিয়ে হেসেই খুন হচ্ছে বোধহয় কেউ। নাহ, ফোন করে দেখতে হবেতো, একদিন।
একদিন ফোন ও করলো রিফাত। কিন্তু, ফোন বেজেই চলেছে, ধরেনা তো! ধুৎ!!! পরিচিত কেউই হবে। স্রেফ মজা করেছে!! বলে আশা ছেড়েই দিলো ও।
কিন্তু, এই ঘটনাটা নিয়ে এতটা বাড়াবাড়ির কারণ, জীবনে নাটকীয়তা রিফাতের পছন্দ। সপ্ন , কেউ যদি আসে এমন করে। হঠাৎ বৃষ্টির মত!
কিন্তু, এল আর কই? এ যে
জাস্ট ফান। বন্ধুদের মধ্যেই কেউ করেছে!
ধুরররররররররররর! জমলোনা।
কদিন পর বিশ্ব বন্ধুতা দিবস। রিফাত ওর বন্ধুদেরকে মোবাইল থেকে ফ্রেন্ডশিপ মেসেজ পাঠালো। তারপর......ইনবক্সে মেসেজ দেখতে দেখতে হঠাৎ অজ্ঞাত ওই শ্রাবণ এর মেসেজটাও চোখে পড়ল। ওটা ডিলিট করা হয়নি! ও ভাবলো, অজ্ঞাত শ্রাবণকেও একটা মেসেজ দিয়ে দেই। দেখিনা কোনও রেসপন্স আসে কিনা।
যেই ভাবা সেই কাজ। দিলো একটা মেসেজ পাঠিয়ে।
তারপর, কি আশ্চর্য!!
সেও একটি ফিরতি মেসেজ পাঠিয়ে দিল।
আরে বাহ্, ভালইতো জমে যাচ্ছে! ভাবলো রিফাত। এর
পরদিন সকালে ও ঘুমিয়ে আছে, ফোনে মেসেজ আসার সাউন্ড বেজে উঠল। ও তো ঘুম ঘুম চোখে মেসেজ অন করে দেখে, ওই শ্রাবণের মেসেজ, " গুড মর্নিং!"
আরে, ভালইতো। হঠাৎই কেমন অন্য রকম ভাল লাগায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো রিফাত। তারপর অবশ্য ও আর কোন সাড়া দিলো না। দেখি না ঘটনা কতদূ্র যায়!
এর পর কয়েকদিন আর কোনও খবর নেই। রিফাত ওর প্রিয় বান্ধবীদের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বললো। ওর সবচেয়ে কাছের বান্ধবী লুসি বলল,
"শোন এইসব আউল-ফাউল ফোন নাম্বার থেকে আসে। চেনা নেই জানা নেই। শুধু শুধু ফাঁদে পড়তে যাসনে। তোর মনরে নিয়ে খেলে টেলে স্রেফ মজা দেখে ছেড়ে দিবে।"
এরপর ওর মনে হল, লুসি হয়তো ঠিকই বলেছে। আচ্ছা আর যোগাযোগ করবোনা।
কিন্তু, বান্ধবীর সাথে বললে কি হবে, রিফাতের মন যে বলে অন্য কথা! ওর
তো ভালই লাগছিল। যেন মনে হচ্ছিল, এর সাথেই ওর একটা কিছু হবে।
এরপর একদিন শ্রাবণের নাম্বার থেকে ফোন এলে ও রিসিভ করল। যেন একটা ফোন আসার অপেক্ষাতেই ছিলো। ওহ্, কি সেই কন্ঠস্বর! মুহুর্তেই আবেশ ছড়িয়ে দিল যেন। কিন্তু, নাহ্, এ কি ভাবছি আমি! আরোও ভাল করে না জেনেই, এইভাবে উইক হয়ে যাচ্ছি বোকার মত। আমার ভাবনার মত তো ব্যাপারটা সত্যি নাও হতে পারে। হয়তো সেও জাস্ট ফ্রেন্ডশীপই করতে চায়!
কথা তেমন ফাটাফাটি গোছের কিছু হলনা। যতটা এক্সাইটেড হয়েছিলো ও! জাস্ট কেমন আছেন, ভাল আছি টাইপের। তবু, ওইটুকুতেই ওর আবারও স্বপ্ন দেখা শুরু হয়ে গেল। হায়রে, এই পাগল মনরে নিয়া কি করি!
কিন্তু, একটা ব্যাপার, লোকটা কিছুতেই স্বীকার করছে না তো, ওর ফোন নাম্বারটা সে কই পেল? একটা সন্দেহ দানা বাঁধছে। তাইলে কে এইটা?
আমার পরিচিত কেউই নয়তো!
ধুর, কথা বলতে থাকি। এক
সময় তো এটা জানা যাবেই। আর, যদি ভুয়াই হয়......! ধুর! এত ভেবে কোন লাভ নাই। যা হবার হবে।
রিফাত ভাবতে থাকে উথাল পাথাল।
এরপর শ্রাবণ মাঝে মাঝেই ফোন করে। কথা হয়। হতেই থাকে। এর ভেতর তন্বী জিজ্ঞেস করলো একদিন, কিরে তোর ওই শ্রাবণ আবার ফোন টোন করেছিল? রিফাত তো সোজা অস্বীকার! নাহ, করেনাইতো। কেন যে মি্থ্যা কথা বলে ফেললো! শুধু ভাবল, ওদের বললেও বিশ্বাস করবেনা। উলটো আরও হাসাহাসি করবে। কি দরকার!
চলতে থাকল, কথার পর কথা। কত কথা। আস্তে আস্তে রিফাত তো উইক হতে হতে পুরা কাত। ছেলেটা এত সুন্দর করে কথা বলে। তার সব কথাতেই যেন রসে ভরা। এত মধুর! ওহ!
ধীরে ধীরে এটা দুজনের মধ্যেই কাজ করতে লাগল। দুজনেরই দেখি দুজনকে ভাল লাগতে শুরু করেছে।
একদিন শ্রাবণ ওকে সরাসরি দেখতে চাইল। কিভাবে দেখাব, ওকে? ও থাকে সেই কোথায়! মুন্সিগঞ্জ। ওখান থেকে সে আসবে আমার কাছে!
একদিন শ্রাবণ বলল, চল আমরা দেখা করি। রিফাতও তো তাই চায়। কে লোকটা? দেখতে হবে। আসলেই কেউ ফান করছে কিনা তা জানতে হবে।
কিন্তু কই, বলাই সার। দেখা করার ডেট আর ঠিক করেনা শ্রাবণ। এর ভেতর, রিফাত আবার ওর চাচাতো বোনকে এই ব্যাপারে একটু বলে রেখেছে। জাস্ট পূ্র্বাভাস দিয়ে রেখেছে আরকি। পুরোপুরি ঘটনা কিছুই বলেনি। ওর আম্মাকে ওর কাকী আবার বলেছে," তোমার মেয়ের তো বোধহয় কাউকে পছন্দ হয়েছে। এরকমই শুনা যাচ্ছে। যাক পছন্দ হলেতো ভালই, আমরাও এটাই চাই।"
মিতু রিফাতের কাজিন। ওকেও একটু বলেছে। কাকীর কথায় রিফাত বলে উঠলো মনে মনে, মিতু দেখি আমার জাস্ট পুর্বাভাস থেকেই ঘটনা চারিদিকে প্রচার করে দিচ্ছে।
ব্যাপারটায় অবশ্য রিফাতের রাগের পরিবর্তে মজাই লাগছে। "হুম, দেখ, আমিও নিজে পছন্দ করতে পারি। ভাল জিনিসই আনতেছি, অপেক্ষা কর।"......
এখন শ্রাবণ আর রিফাতের সম্পর্ক আরও গভীরে পৌঁছে গেছে। সবচেয়ে আগে, বলব, মামিকে, না না বলব চাচিকে।
এই দুজন মানুষ আমাকে খুব আদর করেন। আর, আমার কথারও মূ্ল্যায়ন করেন খুব। আগে তাদেরকে জানাতে হবে। তারপর তারাই ছেলে দেখে বাসায় বাবা-মাকে জানাবে। বড় ভাইয়াকে বলতে পারলে বেশ হত। কিন্তু, উনি ভীষণ রাগী। এসব ভাবনার পাশাপাশি, রিফাতের মনের ভেতর একটা বেপার এখনও খচ খচ করছে, আসলেই লোকটা আসবেতো! নাকি মিতু, তন্বীদের কথাই সত্যি হয়ে যাবে। খুব টেনশন হচ্ছে!!
এর ভেতর কথা বলা থেমে নেই। রিফাতের এখন ফোন করাই লাগেনা! শ্রাবণই সারা দিন ওকে ফোন করছে। ওর
খোঁজ খবর নিচ্ছে। ও এত
কেয়ারিং! আর আমি কিভাবে ওকে মিথ্যে ভাবছি। মনকে আবার শাসনও করে, আগে দেখাই করিনা। তারপর দেখা যাবে।
তাররররররররপরররর.........আসলো সেই বিশেষ দিন। আজ
পরস্পরের দেখা হবে। ও আসবে আজ আমার কাছে। আমার সাথে দেখা হবে। খুশিতে মনটা নেচে বেড়াচ্ছে! কি মজা কি মজা! আজ
আসবে আমার প্রিয় আমার সাথে দেখা করতে। পারলে খুশিতে রিফাত নেচে বেড়ায়!! কিন্তু, আগে নিজেই সবকিছু সম্পর্কে ধারণা না নিয়ে বাসার সবার চোখে ধরা পরতে চাইছেনা। তাই নিজেকে অনেক কষ্টে দমিয়ে রেখেছে।
কোথায় দেখা করবে? শ্রাবণের এই প্রশ্নে ও ওর নিজের নিরাপত্তা আর বাসার কাছে যেন ধরা না পরে যায় সেজন্য, ওর এলাকার কাছাকাছি একটা জায়গার কথা বললো।
রিফাত ভাবছে, কি পড়ে যাব আজ? প্রথম দিন দেখা। শাড়ি পড়ব কি? উফ্, কার সাথে এই ব্যাপারে আলোচনা করি! কারো সাথে করার উপায় নাই। আবার, হঠাৎ শাড়ি পড়লে মা সন্দেহ করতে পারে! থাকগা, শাড়ি পড়া লাগবেনা। ড্রেসই পড়ি। কিন্তু, তাতেও ঝামেলা। কোনটা পড়বে? অবশেষে অনেক ভেবেচিন্তে, একটা গোলাপী জর্জেট জামা আছে , ওটাই পড়লো।
তারপর, আচ্ছা, একটু দেরি করেই যাই। সব জায়গায় দেখা যায়, কোথাও পৌঁছানোর কথা থাকলে আমি সবচেয়ে আগে গিয়ে উপস্থিত। আর, তাছাড়া, এখানে, ছেলে আগে এসে পৌঁছাক, তারপরে আমি যাই। লজ্জা করছে। খুব।
রিক্সা করে যাচ্ছে আর ভাবছে, আমাকে সামনাসামনি দেখে ও পছন্দ করবেতো! যদি, আমাকে ওর ভাল না লাগে।
এমনি কত চিন্তা। কত রকম ভাবনা। আহারে! কতদিন পর, আমার সপ্ন পূ্রন হতে যাচ্ছে। আমার প্রেমিক পুরুষ। অবশেষে.........!!!
ভাবনায় ডুবে যায় রিফাত।
কিন্তু, রিফাত পৌঁছে গেলো জায়গামত নির্দিষ্ট সময়ের কিছুটা আগেই। আশে পাশে কত লোক যাচ্ছে। আসছে। ওর
দিকে ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে। সন্দেহ করছে? কি জানি!
লজ্জা করছে!
৩০মিনিট পার হয়ে গেল! ওর তো কোন খবরই নাই। কি বেপার? দিলো ফোন। ধরেনা। তবে, ব্যাক করল। বলে," এইতো সোনামনি, আর একটু অপেক্ষা কর।"
আহা, ওর কথা শুনে মনটা গলে গেল আবার। আচ্ছা , ঠিক আছে, থাকি আরও কিছুক্ষন। এভাবে কেটে গেল আরও কিছুটা সময়। কিন্তু, আর ভাল্লাগছেনা রে বাবা! এতক্ষন লাগবে কেন? ঢাকা থেকে মুন্সিগঞ্জ কি অনেক দূরে! দূরে হলেই কি, আগে থেকে রওনা দিলেই পারত। ধুর, আর
ভাল্লাগছেনা যে! আবার ফোন দিলো। এবার দেখে ফোন বন্ধ। একি! আবার দিলো ফোন , নাহ সত্যিই বন্ধ। ধুর.........!!!
খুব রাগ হল। মনও খারাপ হল। ধুর, বাসায় যাইগা! আর থেকে কি হবে!!!
বলে গাল ফুলিয়ে প্রচন্ড অভিমান নিয়ে বাসায় ফিরে এলো রিফাত।
পরে, বাসায় গিয়েও ওর মন টিকছেনা। চলে আসা কি ঠিক হল? এছাড়া আর কিইবা করার ছিল! এলনাতো সে।
সারাদিনটাই খারাপ গেল। রাতও কাটেনা। এটা কি হল! আর, কোন খবরও তো দেয়না। পরে, রিফাত আবার ফোন করলো এভাবে থাকতে না পেরে। ফোন বাজল অনেক বার। ধরেনা কিছুতেই। কাছে পেলে, খাইয়া ফেলতাম!!! ধুৎ!!! রেগে গেলো ও।
পরে, অ-নে-ক পরে একটা মেসেজ এলো। শ্রাবণ??!!
"ইস্, ও বোধহয় অসুস্থ, তাই আসতে পারেনি।" পাগল মনকে বুঝালো। কিন্তু, নাহ্!!! মেসেজ পড়ে জানা গেল, ওর এই অনুমান সঠিক নয়। কোন অসুখ টসুখও নয়। মেসেজ এ লিখেছে,......" তোমার কন্ঠস্বর এত সুন্দর! কথা বলতে বলতে এতটা হয়েছে। আসলে, তুমি যে বংশই-মর্যাদায় মানুষ হয়েছ, আমার সাথে তোমাকে কল্পনাই করা যায়না। আমাকে ক্ষমা করে দিও। এর বেশি আর কিছু বলার নাই।"
কি কথা!!! এক কথায় সম্পর্ক শেষ! এত সোজা! রিফাত একেবারে পাগলের মত হয়ে গেলো। ওর
মন মানে না। আবার ও ফোন দেয়। ধরেনা। আর কোনদিনই ধরলোনা ফোনটা শ্রাবণ। বছর পেরিয়ে গেল।
কয়েক বছর পর......
বিয়ের কথা বার্তা চলছে একটা। ছেলে ভালই। আমেরিকায় পিএইচডি করেছে। তারপরে ওখানেই গুগলে জয়েন করেছে। ছুটিতে দেশে এসেছে। বিয়ে করার উদ্দেশ্যে। খালার বাসায় রিফাতকে দেখেই পছন্দ করে ফেলেছে। তারপর আর কি!
জানালা দিয়ে রাতের আকাশের তারা দেখতে দেখতে.........অনেক দিন পর শ্রাবণের কথা মনে পড়ল আজ। লোকটা আসলে কে ছিলো জানাই হলনা আর। কেন যে মানুষ এমন করে! একবার ভাবেও না তার বিপরীত মানুষটার পরে কি হবে। মরেও যেতে পারতো তো ও। কিন্তু, নাহ্, আছে তো বেঁচে। এটাই কি জীবন!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন