শনিবার, ৩১ মার্চ, ২০১২

তরুনীর বিবাহ সমাচার (পর্ব-০২)

পর্ব-০২

রিকশায় বসিয়া তরুণী রাস্তার দুই পার্শ্বের বাটীসমুহ ও কাঁচাবাজারের দৃশ্যাবলী অবলোকন করিতে করিতে চলিল। তাহার নিজ এলাকা। এইখানে তাহার জন্ম হইয়াছে। এইখানেই তাহার শিশুকাল হইতে তরুণীকাল পর্যন্ত জীবনকাল অতিবাহিত হইয়াছে।

বাড়ি হইতে পঞ্চাশ ভাগ পথ অতিক্রম করিবার পর তরুনীর মনে উদয় হইলো তাহার নিকট সকলই বিশাল নোটের কথা। টাকা যে ভাংতি করিতে ভুলিয়া গিয়াছে তাহাও মনে পরিয়া গেলো। রিকশার ভাড়া প্রদান করা যে বিপদের হইবে তাহা লইয়া সে চিন্তিত হইয়া উঠিলো। এতক্ষণে নিজের এলাকা ছাড়িয়া বহুদূর আসিয়া পরিয়াছে। এইস্থানে কেহ তাহাকে চেনে না। এইক্ষণে একমাত্র উপায় থাকে যেইখানে যাইতেছে সেইস্থানে যদি ভাংতি মিলে। অথবা যদি রিকশাওয়ালা অতখানি সময় সহ্য করিয়া দাঁড়াইয়া থাকে। তাহা না হইলে আজকে সম্মুখে মহা বিপদ হইবে। তাহা হউক, যখন উহা ঘটিবে তখনই দেখা যাইবে।

অতঃপর আবারো সে রাস্তার দুই পার্শ্বের দোকানপাট অবলোকন করিতে লাগিলো। এক্ষণে তাহার রিকশাযান ঢাকা শহরের বড় রাস্তায় আসিয়া উঠিয়াছে।

তাহাকে দেখিতে যে কোন দিবসে এক লম্বা সুপুরুষ যুবকের আগমনের কথা সে শুনিয়াছে। পাত্র নিজের দুইখানা ছবি পাঠাইয়াছে। সাথে পরিবারের সকলের বৃত্তান্ত। তরুণীর মাতার সহিত সেই পাত্র কয়েকবার কথাবার্তা বলিয়াছে। তাহার নিজের মাতা নাই। দুই বৎসর পূর্বে তিনি তাহার নব্বই বৎসর অধিক বয়সী স্বামী ও এক পুত্র, এক কন্যা রাখিয়া গত হইয়াছেন। তাহাদের নিজেদের বাড়ি রহিয়াছে। পুরাতন ঢাকায়। পাত্র তাহার কনিষ্ঠ ভগ্নীর সম্প্রতি বিবাহ দিয়াছেন। পাইলটের সহিত। ভগ্নী জামাতা এতদিন বাহিরে বাহিরে থাকিবার কারণে বধুকে নিজ বাটীতে লইয়া যান নাই। এইবার নিজের নিকটে লইয়া যাইতে চাহিতেছেন। বৃদ্ধ পিতার সার্বক্ষণিক দেখাশোনা ও পরিচর্যার হেতু উপস্থিত হইয়াছে। পাত্র মহোদয় সারাদিন চাকরীজনিত কারণে বাটীর বাহিরে অবস্থান করেন। সারাদিন পিতার সহিত একজন আপনার কেহ থাকিলে নিশ্চিন্ত হইতে পারেন বলিয়া এতদিনে তিনি বিবাহ করিতে ইচ্ছা পোষণ করিয়াছেন। অথচ বিবাহ তাহার আরও কয়েক বৎসর পূর্বেই আবশ্যক হইয়াছিলো। কোন এক সুন্দরীর পাণি গ্রহণ করিতে চাহিয়াও সেই সুন্দরীর সম্মতি আদায় করিতে না পারিয়াই তাহার বোধকরি এইরকম বিবাহের বয়স অতিক্রান্ত হইতে চলিতেছে। এই গোপন খবর যাহার মাধ্যমে তরুণী ও তরুণীর মাতার কানে আসিয়াছে সে এক অন্য কাহিনী।

পাত্র চলতি সপ্তাহের রবিবার আসিবে বলিয়া কথা রাখিবার পরেও আসিতে পারে নাই। তরুণীর মাতা অদ্যাবধি অধীর আগ্রহে বসিয়া রহিয়াছেন। যদিও তাহার কন্যার ধারনা হইয়াছে, তিনি আসিবেন না। কারণ হিসাবে যাহা মনে হইয়াছে; পাত্র ধবল কন্যা খুঁজিতেছেন বিবাহের জন্যে। সে তো ধবল নহে। তাহাকে সকলে ধবলের নিকটবর্তী শ্যামল কহিয়া থাকে। উজ্জ্বল বর্ণের শ্যামল বর্ণ তাহার। এই কথা পাত্রকে তাহার মাতা কয়েকবার করিয়া বলিয়াছে।

মাতা কহিতেছে, “পাত্রকে তোমার গায়ের বর্ণের কথা কয়েকবার বলিয়াছি। তাহার পরেও পাত্র আসিতে চাহিয়াছে। আমি নিজ কর্ণে শ্রবণ করিয়াছি। সুতরাং পাত্র আসিবে।“

মাতার এইরূপ কথার পরে তরুণীর বুঝিয়া লইয়াছে পাত্র তাহাকে তাহার আসল রূপে অবলোকন করিতেই বোধ করি নির্দিষ্ট করিয়া কোন দিন ধার্য করিয়া তাহাদিগকে জানাইতেছে না। তাহাকে তাইলে দেখিতে আসিবেই। যদি তাহাই করিবে বলিয়া পাত্র মনস্থির করিয়া থাকে, তাহা হইলে তাহাকেও তো পূর্ব প্রস্তুতি লইয়া রাখা কর্তব্য।

“দিদি, কোন পার্শ্বে থামিবো?” রিকশা গন্তব্যস্থলে আসিয়া পৌঁছিয়াছে।

“বাম পার্শ্বে রাখিতে পারেন। আপনার নিকটে কি পাঁচশত টাকার ভাংতি হইবে?”

রিকশাওয়ালা না সূচক জবাব প্রদান করিলে তাহাকে কিয়দক্ষণ অপেক্ষা করিতে বলিয়া তরুণী সৌন্দর্য্য বাটীতে প্রবেশ করিলো। প্রবেশ করিয়াই লম্বা লম্বা লাইন দেখিতে পাইলো। “এই রে! সারিয়াছে! এই লম্বা লাইন পার হইয়া টাকা খুচরা হইতে হইতে যদি রিকশাওয়ালা অগ্নিশর্মা হইয়া ছুটিয়া আসে তাহা হইলেই সর্বনাশ হইয়া যাইবে।” ভাবিয়া তরুণী লাইনে খাড়াইলো।

তাহার পরে, যতখানি দেরী হইবে বলিয়া ধারনা করিয়াছিলো ততখানি দেরী হইবার পূর্বেই তাহার কাজ সমাধা হইতেই সে ছুটিয়া গিয়া রিকশাওয়ালার পাওনা পরিশোধ করিয়া এই এতক্ষণে নিশ্চিন্ত হইতে পারিলো।
তাহার পরে তরুনী আবারো সৌন্দর্য্য বাটীতে প্রবেশ করিলো। মুখমন্ডল পরিস্কার করিবার কক্ষের দিকে আগাইয়া গিয়া কি কাজ করিতে আসিয়াছে বলিতেই ‘তাহাকে কয়েকজনের পরে ডাকিবে’ বলিয়া বসিতে বলা হইলো। সে অপেক্ষা করিতে লাগিলো।

(চলিবে...)

শুক্রবার, ৩০ মার্চ, ২০১২

তরুনীর বিবাহ সমাচার (পর্ব-০১)

পর্ব-০১:

বিবাহ আসন্ন।

তরুণীর পিতা-মাতা ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছে। গৃহের কোথায় কি লাগাইয়া গৃহকে আরও সজ্জিত করিবেন তাহা নিয়া তরুণীর পিতার আগ্রহ ও চিন্তার কমতি নাই। লোকজন নিযুক্ত করিয়া সারাদিন রাত্র ধরিয়া তিনি তাহাই সম্পন্ন করিতেছেন।

তরুণী তাহার পিতামাতাকে ইত্যাকার ব্যস্তসমস্ত হইতে পূর্বেও আরো কয়েকবার দেখিয়াছে। পাত্রপক্ষ বিপুল আগ্রহ লইয়া উহাকে কয়েকবার দেখিয়া গিয়াছে। পড়াশুনা, সূচিকর্ম, রন্ধনকার্যসহ তরুণীর নানাবিধ গুণের বাহার দেখিয়া বিপুল পরিমাণ প্রশংসা বাক্য ঝরাইয়া তাহাদিগের জন্য প্রস্তুত খাদ্যদ্রব্যের সমূহ গূণকীর্তন করিয়া হাসিমুখে প্রস্থান করিয়াছে এই বলিয়া যে, অতিসত্তর তাহারা শুভকার্য সম্পন্ন করিতে এই গৃহে প্রত্যাবর্তন করিবেন। কিন্তু, বলা বাহুল্য, তাহারা যদি তাহাদের বাক্য রক্ষা করিতেন তাহা হইলে উক্ত তরুণী আজকে দুই-তিন সন্তানের মাতা হইয়া তাহাদিগকে লালনপালনেই নিজেকে নিয়োজিত রাখিতে ব্যস্ত থাকিত।

এহেন নতুন করিয়া বিবাহের প্রস্তাবের সম্মুখে তরুণীর কোনও ভাবান্তর লক্ষ্য করা যাইতেছে না। তাহা হইলে সে কি এতটুকুও বিচলিত নহে?

তরুণীর মাতা ইদানিংকাল লক্ষ করিতেছেন, তাহার কন্যা রাত্র দ্বিপ্রহরের আগে বিছানাগ্রহণ করে না। তাহার কক্ষের আলোখানা জ্বলিতে থাকে অনেক রাত্র অবধি। জিজ্ঞাসা করিলে কন্যা উত্তর প্রদান করে, তাহার কাজ থাকে। মাতা ভাবিয়া পায়না, কি তাহার এত কাজ যাহা রাত্রী জাগিয়া করিতে হয়। তিনি কন্যার মুখপানে চাহিয়া চাহিয়া লক্ষ করিতে থাকেন। তাহার কন্যাকে যেন কিঞ্চিত মলিন মলিন দেখা যায়। ইহা কি উহার রাত্রী জাগরণের ফল নহে! আসন্ন বিবাহের প্রস্তুতিতে তাহা যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া বর্ষণ করিবে না তাহা কে বলিতে পারে। মাতা মনে মনে স্থির করিলেন, কইন্যার এহেন রাত্রী জাগরণ অবিলম্বে বন্ধ করিতে হইবে।

একদা কইন্যা বসিয়া রহিয়াছিলো। আপন চিন্তায় বিভোর হইয়া কি যেন ভাবিতেছিলো। মাতা আসিয়া তাহার নিকটে বসিলেন। এবং কহিলেন, “রাত্রী জাগরণ কমাইয়া দিয়া নিজ সাস্থ্যের দিকে মনযোগ দাও। তোমার দিগে তো চাহিয়া দেখা যায় না। কিরকম মলিন দেখিতে হইয়া যাইতেছ।“

কন্যা পিতামাতার অবাধ্য নহে। সে নিজেও বুঝিতে পারিতেছিলো। তাহার উক্ত অভ্যাস পরিবর্তন আবশ্যক হইয়াছে। তথাপি, কোন কাজেকর্মে নিজেকে ব্যতিব্যস্ত না থাকিয়া থাকিয়া তাহার মনের ভিতরে জং ধরিয়া যাইতেছিলো। নিজেকে এহেন বিষন্নতার খনির আঁধারে ডুবাইয়া দিতে না চাওয়ার কারণেই নিজেকে ইদানিং ইন্টারনেট পাঠকের খাতায় নাম লিখিয়া লইয়াছে। উহা করিবার পরে, তাহার এহেন বদ অভ্যাস হইয়া উঠিয়াছে। নানাবিধ লেখক, অ-লেখকের গল্প-কাহিনী-কবিতা পাঠ করিতে করিতে কখন যে সময় অতিবাহিত হইয়া ঘুমের স্বাভাবিক সময় উত্তীর্ণ হইয়া যায় তাহা নিজেরও বোধগম্য হইয়া উঠেনা।

যাহা হউক, উক্ত আদেশের পরে দুই-তিনদিন অতিবাহিত হইয়াছে।

তরুণী সক্কাল বেলা ঘুম হইতে উঠিয়া সকালের আহারাদি সম্পন্ন করিয়াছে। অতঃপর, নিজেকে প্রস্তুত করিতেছে। বাহিরে যাইবে। গন্তব্য সৌন্দর্য বটিকা। নিজের মুখমন্ডল উত্তমরুপে পরিস্কার করিবে। নিয়মিতই উহা সে করাইয়া থাকে। আজকাল ইহাই ফ্যাশন হইয়া দাঁড়াইয়াছে।

তরুণী নিজ ব্যাগে টাকা-পয়সা গুছাইয়া লইতে গিয়া দেখিতে পাইলো উহাদের সকলই অতিশয় বিশাল। যানবাহনে চড়িবার পূর্বে উহাদিগকে খুচড়া করিয়া লইতে হইবে। অতি অবশ্যই। তাহা না করিলে রিকশাওয়ালার নিকটে নিজেকে কর্তন করিতে হইতে পারে।

নিজেকে সম্পূর্ণরুপে প্রস্তুত করিয়া তরুণী ব্যস্তসমস্ত হইয়া বাহির হইয়া আসিলো। গৃহের প্রধান দ্বারের নিকটে বাহির হইতে সময় দূর হইতেই তিনজন পরিচিত চেহারা নজরে আসিলো। নিকটে যাইয়া নিজে কথা কহিবার পূর্বেই অপেক্ষাকৃত আকৃতিতে ছোটজন বলিয়া উঠিলেন, “কোথায় যাইতেছো, পারুল?” তরুণী উত্তরে কিছুই না বলিয়া স্মিত হাসি উপহার প্রদান করিল। তাহার পরে উক্ত রমণী তাহার শুভ্র বর্ণের উপরে হালকা নীল বর্ণের ছটা সম্বলিত পোশাকের প্রশংসা প্রকাশ করিতে লাগিলো; কোথা হইতে ক্রয় করিয়াছ, দোকানী কত লইয়াছে, কোথা হইতে উহাকে বানাইয়াছ ইত্যাকার প্রশ্নের কারণে টাকা খুচরা করিয়া লইবার কথা বেমালুম ভুলিয়া গেলো সে।

রিকশাযান ঠিক করিয়া তরুণী উঠিয়া বসিলো। রিকশা চলিতে আরম্ভ করিলো।

(চলিবে....)

সোমবার, ১৯ মার্চ, ২০১২

প্রেমে, শব্দশৈলীতা!



আঙ্গুলের ছন্দে শব্দের বুনন বেঁধে
কথার পরে কথা সাজানো?
সে সব এখন বাক্সবন্দী;
হাতে বাঁধা শব্দের শৈল্পিকতায়
তো প্রাণ থাকেনা,
থাকেনা তোমার কণ্ঠের উত্তাপ,
নিঃশ্বাসের গভীরতা;
আদরনীয় অদৃশ্য স্পর্শ!
কথাগুলো যে পথে বেরিয়ে আসে,
সে পথের উপরে একটু আশ্রয়ের আহ্বান
তো থাকেনা, হাতে বাঁধা ছন্দের শিল্পে

কণ্ঠের বুননে থাকে প্রাণের স্পন্দন,
হাসিতে ঝরে পরে উপলব্ধি,
নিজেকে ধরা দেবার মাঝেও
এক অন্যরকম তৃপ্তি!
সে কথায় না থাক কোন নির্দিষ্টতা,
না থাক ছন্দ, বা গতি;
না হয় থেমে থাকে, কিছুটা সময়।

তবু কথা হোক
দিনে,
রাতে,
শত ব্যস্ততার ফাঁকে,
তোমার আমার।