ছানা চিতুইঃ
অনেকেই ছেলেবেলা হতেই পাকের ঘরের গিন্নি হয়ে থাকেন। অনেকেই। আমার
মায়ের কথায়, “আমার মেয়েটা বড্ডো অলস! এ যে শশুড় বাড়ি গিয়ে কেমনে চলবে আল্লাহই
জানেন!” সম্ভবতঃ মায়ের এরকম তিরস্কারের জন্যই এখনো শশুড় বাড়ির পথ দেখতে পাচ্ছি না।
এনি ওয়ে, আমি রাধুনী’র দিক থেকে আসলেই ফাঁকিবাজ। কিন্তু, আমার হাতে আমি যেটাই
প্রথম করি, একেবারে পাকা গিন্নির মতন রাধা হয়ে যায়। ওয়াও! খুব মজা! এরকমটাই শুনে
থাকি। বছর দুই আগে জীবনের প্রথমবার, গরুর গোশ রান্না করেছিলাম, বাবার কাছে শুনলাম,
“উম্ম! খুব টেস্টি হয়েছে!” এখানে বলে রাখি, আমার বাপ-চাচাদের চাছাছোলা মুখ; এঁরা
কোন নতুন জায়গায় গিয়েও রান্না সাদের না হলে মুখের উপরেই বলে দেয়, “এঁদের কি সাথে
জিহবা নেই?” যাই হোক, বাবার কাছে চিংড়ির দোপেঁইয়াজা রেধেও খুব সুনাম পেয়েছিলাম।
এই বছর ঈদ-উল-আজহায় বাবা-মা দু’জনের হজ্জ্ব গমনের কারণে, আমি আমার
নানু বাড়ির সকলকে গরুর গোশ, চিকন সেমাই, সেমাই জর্দা, কাস্টার্ড বানিয়ে খাইয়েছি যা
মা কাছে থাকতে অসম্ভব ব্যাপার। আমার মা কাজে খুব পটু তো, ওনার ভাষায় তাঁর মেয়ে
“আলসির হদ্দ; কাজ কর্মেও ভীষণ স্লো। এই বয়সী মেয়েরা সারা সংসার সামলায়। আমার মেয়ে
কিচ্ছু পারে না!” মায়ের কথা শুনে শুনে গাল ফুলিয়ে রাগ করে আমিও জবাব দিয়ে দিতাম,
“ঠিক আছে! যে কাজে প্রশংসা নেই, সেখানে আমি সম্ভব হলেও কিচ্ছু করবো না।”
সত্যি কথা কি জানেন? মায়ের সামনে কিচ্ছু কাজ করে মজা নেই। খালি তুলনা
করবে। ঐরকম হয়নি। সেইরকম হয়নি। আরে বাবা, আমি কোনকিছু প্রথম রাধলে বা বানালে তাঁর
একটু এদিক ওদিক হতেই পারে। আর, তেল, চিনি, নুন, মিষ্টি, ঝাল আমি আমার সুবিধামতনই
তো দেব। হুবহু তা আরেক জনের মতন হতে হবে কেন? কাজ করার পরে একশো একটা ভুল ধরবে!
অসহ্য লাগে!!
সেদিন মঙ্গলবার, হরতালের দিন। বিকেলে ক্লাস হবে না। তাই দুপুরে বসে
বসে টিভি দেখছিলাম। খালামনিও ছিলো। হাতে প্রথম আলো’র ‘নকশা’তে পিঠার রেসিপি
পড়ছিলেন। আমিও নিয়ে চার রকম পিঠার রেসিপি পড়ে দেখলাম, সুজির রসবড়া’র উপকরণ সব এই
মুহুর্তে বাসায় আছে। শুধু ডিমটা দোকান থেকে আনিয়ে নিলেই চলবে।
সন্ধ্যায় তাই বানাতে শুরু করলাম। রেসিপি সামনেই নিয়ে নিলাম। সবকিছু
ঠিকঠাক। ৩টা ডিম এর সাথে আধা কাপ সুজি মেশালাম। ভালোমত ফেটে আধা কাপ চিনিও একসাথে
ফেটে নিলাম। এর পরে চুলায় তেল দেব। তেল নাই। সব সময় তেল থাকে, বড় ক্যান ভরা।
“শালার আমি কিছু বানাতে বসছি, আর এখন তেল নাই!” ডুবো তেল দিয়ে ইচ্ছে মতন ভাজা
যাচ্ছে না। সামান্য তেল। এতে আমার ঝামেলা হচ্ছে, একটা করে পিঠার বড়া বানানো যাবে।
যাই হোক, ঐ তেলই গরম করে টেবিল চামচের গোলা একবার করে ছেড়ে ছেড়ে পিঠা ভেজে একটি
বাটিতে টিস্যু পেপার বিছিয়ে তাঁর উপরে পিঠাগুলো রাখলাম। এদিকে আরেকটি চুলায় আগুন
দিয়ে সসপ্যানে দুই কাপ চিনি সাড়ে তিন কাপ পানির মধ্যে জ্বাল দিলাম। হাত দিয়ে নেড়ে
চিনি পানির সাথে গুলিয়ে নিয়েছি। চুলায় মাঝে মাঝে নেড়ে দিলাম। নইলে নিচে দিয়ে আঠা
লেগে যেতে পারে। চিনির সিরা দিয়ে কোনকিছু আমি জিন্দেগীতে বানাই নাই। নিজের হাতে না
বানাইলে আমার আবার উচিত শিক্ষা হয় না। যতই দেখি না, কামের সময় সেইসব মনে থাকেনা।
আম্মাকে একবার ইচ্ছে হলো জিজ্ঞেস করে নিতে, চিনির সিরা ঠিক আছে কিনা, বা চিনির
সিরায় বড়া কিভাবে ছাড়বো, “ঠান্ডা করে নাকি গরম সিরাতেই?” মায়ের সাথে আমার
ডায়াবেটিকস পেশেন্ট নানী বসা ছিলো। ওনার সামনে নিয়ে যাওয়া মানে, ওনার মধ্যে ছোছা
ভাব জাগিয়ে দেওয়া! মানে, যেটা মানা করা হয়, বা নিষিদ্ধ ওনার জন্য, সেটাই খাবার
জন্য ছোঁক ছোঁক করতে থাকেন। আমরাও দিতে পারিনা, ডায়াবেটিকস এর সাথে ওনার যে
কিডনিরও সমস্যা। নানীর কারণে কিছুই জিজ্ঞেস করা হলো না। পিঠার বড়া ভাজা শেষ। চিনির
সিরাও। আমি সবকিছু নিয়ে এসে আমার ঘরে ঠান্ডা করতে শুরু করলাম। চিনির সিরা মোটামুটি
টেনে এসেছে। আমি বড়াগুলো ওতে বসিয়ে দিলাম। “কিন্তু, ডুবছে না তো! কি মুশকিল!” এই
অবস্থাতেই ঢেকে রেখে সরে পরলাম। ১০-১৫ মিনিট পরে গিয়ে ঢাকনা উঠিয়ে দেখি, সব চিনি মিছরির মতন চাকা হয়ে গেছে!! কেমন
টা লাগে!! তাঁর আগে খালামনিকে বলে সেরেছি, “আপনি যে পিঠার রেসিপি দুপুরে দেখলেন
ওটা আমি বানিয়ে ফেলেছি।” “এখন ওনাকে
দেখানোর সময় যদি পিঠার এই চেহারা হয়, কান্দন আসে না, কন তো?” ফ্রিজে লিটার দুধের
প্যাকেট ছিলো। ওটা থেকে এক কাপ মত জ্বাল দিলাম। দিয়ে গরম দুধটা ঐ চিনির মিছরির মতন
পিঠার উপর ছেড়ে দিয়ে আচ্ছা মতন গুললাম। এটা এখন আর চিনির সিরায় ভেজানো রসবড়া নয়;
হয়ে গেছে দুধে ভিজানো রসবড়া। সমস্যা হয়েছে এই, দুধে ভেজানোর ইচ্ছায় দুধের ভেতর
চিনির পরিমাণ সামান্য হলেই চলতো। কিন্তু, চিনির সিরা করেছিলাম বলে, এখন মাথা
ঘুরানো মিষ্টি হয়েছে ওটা খেতে। যাই হোক, পিঠাকে জাত করা গেছে। এখন ঠান্ডা করে
ফ্রিজে ঢুকালাম। এখন পর্যন্ত খেয়েই চলেছি। আর ২টা বড়া রয়েছে। রস রয়েছে আরো এক
গ্লাস খানিক। ওটা খেলে মাথা ঘুরাবে। এতই মিষ্টি!!
মায়ের টেনশনে আমার সব কাজ ভন্ডুল হয়ে যায়। গতকাল দুপুরে আমাদের একটা
বিয়ের দাওয়াত ছিলো। আমি যাইনি। মা গিয়েছিলো। মায়ের সেই বিয়ে হতে আসতে মাগরিব
পেরিয়ে গেছে। এদিকে মাগরিবের আজানের পরে, আমাদের কাজের বুয়া আটটি চিতুই পিঠা নিয়ে
ঘরে ঢুকেছে। মা আমাকে বলে রেখেছিলো, “বুয়া সন্ধ্যায় আসলে পিঠার কথা মানা করে দিও,
আজকে পিঠা ভিজাবো না।” আমি তো পিঠা দেখে অবাক! যাই হোক, দুধ চিতুই আমার ভীষণ
পছন্দ। শুধু শুকনা চিতুই খেতে আমার ভালো লাগে না। আমি করলাম কি, দুধ জ্বাল দিলাম
একটা চুলায়। আর আরেকটা চুলায়, সামান্য দুধ নিয়ে গুড় জ্বাল দিয়ে টেস্ট করে নিলাম,
অনেক সময় গুড় খারাপ থাকার কারণে, দুধে গুলালে দুধ ছানা হয়ে যায়। ওটাই টেস্ট
করছিলাম। দুধ ছানা হয়ে গেলে তো সমস্যা। দুধ চিতুই করা যাবেনা। জ্বাল দিয়ে দেখলাম,
গুড় ভালো আছে, ওতে কোন সমস্যা নেই। এর মধ্যে গেছে আবার কারেন্ট। চার্জার লাইটেও
চার্জ নেই। মোমবাতি জ্বালিয়েই কাজ করছিলাম। একবার ভাবলাম, সবকিছু রেডি করে রেখে
দেই। মা আসলে পরে পিঠা ভিজালে হবে। এর মধ্যে সেই খালামনি আসলো আমাদের বাসায়। ওনাকে
দেখিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিলাম, গুড়ে কোন সমস্যা আছে কিনা। যেই গুড় সহ দুধ জ্বাল
দিয়েছি, সেটা ছানা হয়ে গেছে কিনা। খালামনি দেখে জানালেন, “দুধ ঠিক আছে। দুধের
পাতিলে মেশাতে পারো।” খালামনির কথামত, দুধে গুড়ের মিশ্রণটা মিশিয়ে নিয়ে আরো
খানিকটা জ্বাল দিয়ে বলক উঠিয়ে নিলাম। এর পরে একটা করে পিঠা ছেড়ে দিলাম। আটটি পিঠা
এক লিটার দুধে ডুবানোর পরেও মনে হচ্ছিলো, আরো ৫-৬টা পিঠা ছাড়া যাবে। অর্থাৎ, ঢলঢল
করছে। এতে আমি সন্তুষ্ট হলাম। দুধ ও পিঠার অনুপাত তাহলে ঠিক আছে। ঝামেলা হবেনা।
কিন্তু, পিঠা তো গরম দুধে ছাড়লাম। এটা কি করতে হবে? চুলা কি বন্ধ করে দেব? আমার
কাজের বুয়াটা, বুইড়া বেটি। কিন্তু, কিচ্ছু কাজ জানে না। সে আমাকে কোন বুদ্ধিই দিতে
পারলো না। পরে, আমি জলদি করে সিদ্দিকা কবীর এর রান্নার বই বের করে রেসিপি তে দেখে
নিলাম, পিঠা গরম দুধে ছাড়ার পরে একটু জ্বাল দিয়ে নিতে হবে। আমিও সেইমত কাজ করলাম।
দুধ বলক উঠার পরে দেখি, পিঠা ভেঙে যাচ্ছে। তখন জ্বাল নিভিয়ে দিয়ে একটা লম্বা বড়
প্লেট দিয়ে ঢেকে রাখলাম, নইলে ময়লা পরতে পারে। সামান্য ফাঁক রেখেছিলাম। পুরো গরম
জিনিস, নাক চোখ ঢেকে রাখতে হয় না, গন্ধ হয়ে যায় বলে।
কারেন্ট আসতে আরো ৩০ মিনিটের মতন বাকি। আমি বসে বসে ডাইনিঙে একটা
প্যাডে হিসেব করতে বসলাম, মাহী তো পিঠা খেতে চেয়েছে। কয় জন আছে আমাদের সংকাশ
গ্রুপের? হিসেব করতে করতে ১২-১৩ জন হয়ে গেলো। এত জনের জন্য পাটিসাপটা পিঠা করলে
কেমন হয়? পাটিসাপটাও আমি নিজের হাতে কোনদিন বানাই নাই। এইবার যখন শুরু করেছি, ওটাও
বানিয়ে ফেলবো। আমাদের সংকাশ মিটিঙের আগে বানিয়ে ১৫-১৬ টা নিয়ে যেতে হবে। মোটামুটি
সাইজের বানাবো যাতে বিকেলের নাশতার কাজ হয়ে যায়। নতুন কিছু শিখলেই সেটা করতে ইচ্ছে
করে আর বানিয়ে সবাইকে খাওয়াতে ইচ্ছে করে। যেমন- কদিন আগে আমার জন্মদিনে কাস্টার্ড
বানিয়ে সবাইকে খাওয়ালাম। এইবার মাহীর চাওয়া পূরণ তথা সংকাশ গ্রুপে। ...এইসব ভাবতে
ভাবতে কারেন্ট বাবাজি ফিরে এলো। আমি ঢাকনা উঠিয়ে দেখি, ওনারা মানে আমার পিঠা
বাবাজিরা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন। আর দুধের গুষ্টিও নাই। পরিবর্তে ছানা গায়ে
লেগে রয়েছে ওনাদের। আমি জাস্ট হতভম্ব হয়ে গেলাম। গুড় ভালো ছিলো। দুধ জ্বাল দেয়ার
পরেও, পিঠা ভেজানোর পরেও কোন সমস্যা ছিলো না। এখন কি পিঠায় ভুতে আছর করলো!! এর
মধ্যে মা’ও ফিরে এসেছেন। পিঠার তেরোটা দেখে ওনার মেজাজ সপ্তমে!! আমি কাজ এগিয়ে
রাখতে চাইলাম। একটা ভালো কাজে হাত দিলাম। ফিনিশিঙে এসে এইরকম দেখলে মেজাজ খারাপ হয়
না বলেন?!
আমি মা’কে কি করে বুঝাবো যে, সবকিছু প্রসেসিঙে কোন ত্রুটি ছিলো না।
খালামনিকে ফোনে বললাম, পিঠা তো নষ্ট হয়ে গেছে! খালামনি শুনে বললেন,
ছানা গুলো আলাদা করে রেখে দাও, কাজে লাগবে। কিসের কি! মা তো পিঠার ধারে কাছেও
আমাকে আর সহ্য করতে পারবেন না। আমার নিজেরও রাগে দুঃখে কি আর বলবো!!!
তবে, সকালে ঘুম হতে উঠে, ছানা ওয়ালা চিতুই পিঠার স্বাদে অভিভূত হয়ে
গেলাম। উফ!! দু’বার খেয়েছি। অত পিঠা রেখে দিলে নষ্ট হবে ভেবে, সব খালামনি ও মামার
বাসায় বিলিয়ে দিয়েছি।
এখনো মুখে লেগে রয়েছে স্বাদটা। রাতে এম এড এর ক্লাস শেষ করে বাসায়
ফিরে খুব ঐ পিঠা খেতে ইচ্ছে করছিলো। মাকে বলেছি, আমি ছানাওয়ালা দুধ চিতুইই আবার
বানাবো। মা হেসে সম্মতি দিয়েছেন। ওটা দুধ চিতুই না হলেও ‘ছানা-চিতুই’ তো হয়েছে।
___
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন