রবিবার, ৮ এপ্রিল, ২০১২

ছোটগল্পঃ “একদিন স্বপ্নের দিন”


কথাতো প্রায় প্রতিদিনই হয়। হচ্ছে সেই এক বছর, কিংবা তার বেশিও হতে পারে। কিন্তু দেখা হয়নি। একবার অনেক জোরাজুরির পর নিজের ফটো পাঠিয়েছিল ইমেইলে। তাও শুধু এক পলক দেখেই ডিলিট করে দেয়ার শর্তে!
মাঝে হারিয়ে গিয়েছিল প্রায় এক বছর? না না , এক বছর নাহ! আমার নেপাল শিক্ষা সফরের দিনও সকালে ফোন করেছিল। তবে আর যোগাযোগ না করার শর্ত জুড়েছিল!!
ও এক পশলা বৃষ্টির মত আমার কাছে আসে যায়। আসে! যায়! চলে যায়। আবার ফিরে ফিরে আসে! এ এক অন্য রকম!
আমাকে ওর ইদানিং খুব দেখার শখ হয়েছে। দেখবে , কথা বলবে। বলবে ওর সব বলা না বলা যত কাহিনী। আমাকে কেন যে ওর এত বেশি ভাল লাগে সেটা আমি বুঝিনা। ছেলেরা সাধারণতঃ যে কারনে কোন মেয়ের প্রতি দূর্বল হয় সেরকম কিছু তো ভাবা যায়না। আমাদেরতো দেখাই হয়নি। ফেসবুক-এ শুধু একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি দেখে কি কারো প্রতি প্রেমানূভূতি জাগতে পারে! আমি অবাক হয়ে যাই। বার বার!
ও খুব সুন্দর করে কথা বলে! আর আমি? আমার মেজাজেরতো কোন ঠিক ঠিকানা নেই। এই ভালো, এই মন্দ! আমি আমার মেজাজের সবটাই ঝেরে ফেলি ওর উপর। ওহ, এতক্ষনও বলাই হয়নি, কার কথা বলছি। ও আমার প্রিয়! খুব প্রিয় একজন! ও শুধু আমার খুব প্রিয় একজন মানুষই নয়, ও আমার সবকিছু। সে আমার প্রতিটি মুহুর্তে জড়িয়ে আছে!
ইদানিং ও অফিসের কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকছে আমার সাথে একটু দেখা করার জন্য ওর সময় হয়ে উঠছেনা!


আমার ছিল ভাইভা পরীক্ষা। কথা ছিল আমাকে আমার ভাইভা শেষে নিতে আসবে বাসায় পৌঁছে দিবে। অতটা আশা করিনি যে বাসা পর্যন্ত আসার সময় হবে। ওর অফিস ছুটি হয় সন্ধা সাড়ে সাতটার পর। তবে, আগে হতে বললামনা কিছু, যদি রাগ করে আসাই বাদ দিয়ে দেয়! তারপর, এলো সেই দিন! আমি আমার ভাইভার চেয়েও অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি আজ মাহীর সাথে দেখা হবে! বলা যায় ওর কারণেই আমি ভাইভা বিষয় নিয়ে ছিলাম শংকামুক্ত!
ভাইভা পরীক্ষাকেন্দ্রে জায়গামত পৌঁছে বাসায় ফোন দেবার আগে ওকে মেসেজে জানালাম। এর মাঝে আমি ব্যস্ত হয়ে গেলাম ভাইভা বোর্ডে সাইন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য। ফোন ছিল ভাইব্রেশনে। ও যে একবার ফোন করেছিল টেরই পাইনি। আমি আবার যখন ট্রাই করলাম, দেখি ফোনটা বন্ধ। আরে এসময় আবার বন্ধ কেন? ভাবতেই কেমন জানি মনে কু-ডাক দিল! হু, বুঝছি , আসবেনা! তাই গেলাম রেগে। দিলাম একটা রাগী এস এম এস, 'কি ব্যাপার, ফোন কেন বন্ধ থাকে?' পরে মেসেজ এলো, "আমি মিটিং এ" ! "ধুর ছাই , আজ আবার কেন মিটিং আর এই সময়ে!" আসলে, মিটিং তো হতেই পারে! এইসব অফিসিয়াল ব্যাপার। আগে হতে কোন কিছু বলা যায়না প্রাইভেট ফার্মে। আমি অযথাই ক্ষেপে যাচ্ছি! মনকে বুঝালাম। আবার এক ঘন্টা পরে আমি ওকে মেসেজ পাঠালাম, "শোন, আমার ভাইভা আর একটু পরেই শেষ হয়ে যাবে। তুমি চারটায় অফিস হতে বেরিয়ে পরো।" আবার মেসেজ এলো, " "আমি এখনও মিটিং-এ"। এইবার মেজাজ গেল খিচড়ে! যাহ্, বুঝছি, আর আজ দেখা হবেনা! আমার চেহারায়ও সেটা প্রকাশ পেয়ে গেল। অনেকক্ষণ ধরে , ইডেন কলেজ হতে আসা আরেক ক্যান্ডিডেট এর সাথে পাশাপাশি বসে কথা হচ্ছিল। আমার পরেই ওর সিরিয়াল। সে আমাকে বললো, "আপু, আপনার কি খুব টেনশন হচ্ছে?" আমি বললাম, "কেন? আমার চেহারায় প্রকাশ পেয়েছে বুঝি?" ও বললো, "হ্যাঁ"!
আসলে, সত্যি কথা জানেন, মাহীকে আমি যতই বলি, ও আমাকে যতটা ভালবাসে, আমি তার এক কানাকড়িও ভালবাসিনাওকে মিস করিনা। কিন্তু, আমার চেয়ে সেটা আর কে বেশি জানে যে, আমি ওকে পাগলের মত মিস করি। ও আমাকে এতটা দিয়েছে যে, সেটা আসলে কথা দিয়ে বলে বোঝান যাবেনা বা শেষ করা যাবেনা। ওর কথা পুরোপুরি বলতে গেলে একটা উপন্যাস লেখা হয়ে যাবে।
আমারতো মেজাজের কোনও ঠিক ঠিকানা নেই। দিনের মধ্যে হাজার বার আমার মনটার দিক বদল হয়। আমি ওকে সকাল সন্ধ্যা কত উপদেশ যে দেই! এই করোনা, ওই করোনা, এটা ঠিক নয়, ওটা ঠিক নয়, এভাবে চলো, ভাল হবে! যেন ও একটা শিশু! আমি ওকে শিশুর মত আগলে রাখি। বা রাখতে চাই। আসলে ওকে সামনাসামনি দেখিনিতো, তাই বোধ হয় এমন করে বলতে একটুও বাঁধেনা! মাঝে মাঝে বকাঝকাও করি! অবশ্য আর একটা কারণও আছে! আসলে হয়েছে কি জানেন, ওর বাবা-মা না আমাদের সম্পর্কটা মেনে নিচ্ছে না!কিন্তু, ও খুব পাগল আমার প্রতি! খুব! প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পথে ও আমাকে একবার ফোন দেবেই। অফিস ছুটির পর হতে একেবারে বাসায় পৌঁছানো পর্যন্ত ওর সারাদিনে কি হলো না হলো সব আমাকে বলা চাই। সেজন্যে ও বসুন্ধরার অফিস হতে বের হয়ে কল্যাণপুরে বাসা পর্যন্ত যেতে যেতে পুরো সময়টা আমার সাথে কথা বলবে।
সে যাই হোক, যে কথা বলতে চেয়েছিলাম। ওতো বললো, ওর মিটিং। আমি আমার ভাইভা শেষ করে দেখি ওর মোবাইল বন্ধ। আমার একটা মজা করার ইচ্ছে হলো। ওকে একটা মেসেজ পাঠালাম, "শোন, বুঝেছি, শুধু আজ কেন, তোমার সাথে আর কোনদিনই মনে হয় আমার দেখা হবেনা। আমি এখন বাসে। বাসায় চলে যাচ্ছি।" কিন্তু, বাস ধরলাম আসলে, বসুন্ধরার উদ্দেশ্যে। ওর অফিস এর কাছে। বাস ঠিক ওর অফিসের সামনে দিয়ে যাবেনা। তবে, একটু হেঁটে গেলেই ওর অফিসে যাওয়া যাবে।
বাসে চড়ে বসার পরও খালি মন দোনোমনো করতে লাগলাম, যাব নাকি যাবনা। এই করতে করতে বাস ওর অফিসের রাস্তা কিছুটা ছাড়িয়েও গেল। দুজন লোক নামছিল বাস হতে। আমি আমার পাশের লোকটাকে বললাম, "এটা বসুন্ধরা ছাড়িয়ে গেলনা?" লোকটি হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়তেই আমি ছুটে নেমে গেলাম বাস থেকে। তারপরেরটুকুতো ইতিহাস!!
আমি প্রথমে ওর অফিসে ঢোকার রাস্তাটা পাচ্ছিলাম না। বিশাল এরিয়া। বেজমেন্টে নেমে সিক্যুরিটিকে বলতেই বুঝিয়ে দিল কোন পথে ঢুকতে হবে। আমি অফিসের দরজা দিয়ে ওর অফিসের সামনে বসা সিক্যুরিটিকে নাম জানালে, "খন্দকার মাহী স্যারের কাছে এসেছে" জানিয়ে আমাকে একেবারে সরাসরি ওর রুমে নিয়ে গেল। ওইখানে বসা আরো তিন জন ভদ্রলোক। অফিসার। ওর কলিগ। আমি এতক্ষণ ধরে ছুটে চলা স্বপ্ন হতে বেড়িয়ে এলাম। কবে ওর ছবি দেখেছিলাম! ভুলেই গেছি! আর, শুনেছিলাম এই নামে আরো একজন আছে এই অফিসে। আর তাছাড়া, সেই মূহুর্তে মনে হলো, যদি দেখা গেল, আসলে এই অফিসে ওই নামে যে থাকে সে আসলে অন্য কেউ! কেমন ভয় ভয় করতে লাগলো। অথচ, কে নিয়ে আমার এরকম টেনশনের কোনও কারন নেই! ইন্টারনেট দুনিয়ার মানুষগুলো অধিকাংশই ভুয়া হলেও, আমার মানুষটাকে আমি কখনোই অবিশ্বাস করতে পারিনি এক পলকের জন্যও। ওর প্রতিটা কথা আমি বিশ্বাস করে গেছি একেবারে শুরু হতে শেষ পর্যন্ত। তবু, আজ এই মুহুর্তে কেমন অস্বস্তি লাগছে!
'উনি অফিস হতে চলে গেছে!' 'না চলে যায়নি''আরে না এই মাত্র বেরিয়ে গেল!' এরকম কয়েক রকম কথা শুনতে লাগলাম ওর কলীগদের মুখ হতে। তার মধ্যে একবার দেখি, ও এসে দাঁড়িয়েছে, ওই রুমের দরজায়! কার সাথে জানি কথা বলছে! একটু বাঁকা হয়ে দাঁড়ানো। আমি ভাবলাম, থাক্, দেখি, ও আগে আমাকে দেখে কিনা!
পরে যখন ও ওই রুমে ঢুকলো, ওর কলীগরা মনে হয় মজা পেয়ে গেছে! আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো, "এই কি 'আপনার মাহী'?" আমার হাসি পেয়ে গেল। সম্মতি জানালাম। আর ওকে বললো, "কি ভাই, আপনি না একটু আগে এই দরজার কাছে আসলেন, ওনাকে (আমাকে) দেখেন নাই?" ঘাড় নেড়ে না সূচক জানালো।
ও মনে হয় এখনি বেরোবে। আমাকে দেখে ও সত্যি অবাক হয়ে গেছে! ওর প্রমি যে অফিসে যাবে ওকে না জানিয়ে এটা ও ভাবতেই পারেনি!! তবে, কলিগের সামনে সেটা ধরা দিল না। আমি নিজেওতো ভাবতে পারিনি যে কখনো, কোনদিন ওর অফিসে যাবো। সারপ্রাইজ দেয়ার ইচ্ছে ছিলো এবং তা সত্যিই দিয়ে দিলাম!!
তার পর আর কি! বেরিয়ে এলাম দুজনে! হেঁটে হেঁটে পার করলাম অনেকটা পথ। ও রিকশা নিতে চেয়েছিল। আমার বাসায় পৌঁছে দিতে চাইলো। আমি বললাম, "রিকশা নিওনা, তাহলে পথ ফুরিয়ে যাবে দ্রুত!" শুনে ও হেসে দিল, "আচ্ছা, ঠিক আছে , চলো।" হেঁটে হেঁটে চলে এলাম বাসা পর্যন্ত! একটা দিন যেন স্বপ্নের মত কেটে গেল! যে স্বপ্ন ঘুম ভেঙ্গে মুছে যাবেনা!

বড় গল্পঃ “তরুণীর বিবাহ সমাচার” (৪র্থ পর্ব)

পর্ব-০৪

তরুণী ব্যাংকে গিয়াছিলো টাকা তুলিতে। কর্ম সমাপ্ত করিয়া বাহিরে আসিলো। “বস্ত্রের দোকানে যাওয়া আবশ্যক বোধ হইতেছে। কিন্তুক, বস্ত্রের নমুনা তো আনা হয় নাই। অন্য আরেকদিন কিনিলেই চলিবে।” ভাবিতে ভাবিতে ভাড়া ঠিক করিয়া রিকশাযানে চড়িয়া বসিলো। অদ্য নিজ বাটীর অভিমুখে রিকশাযান চলিতেছে।

হঠাৎ সুর করিয়া তাহার মুঠোফোনখানি গান গাহিয়া উঠিলো। তরুণী ব্যস্ত হইয়া ব্যাগ হাতড়াইয়া উহা খুঁজিয়া বাহির করিয়া কানে লাগাইয়া কিছু কহিবার পূর্বেই শুনিতে পাইলো তাহার মাতার ব্যস্ত কন্ঠস্বর, “শুনো, আতিক আসিতেছে!” তরুণীর মনে পরিলো, “আতিক! সেই লম্বা সুদর্শন!”...

মাতা পুনরায় কহিলেন, “তুমি কোনস্থানে রহিয়াছো? অন্য কোন স্থানে আজগে যাইবার আবশ্যক নাই। বাটীতে ফিরিয়া আসো।“ তরুণী তখন মাতাকে আস্বস্ত করিয়া কহিলো, “বাটীতে ফিরিতে আমার আর মিনিট কয়েক লাগিবে। তুমি উতলা হইয়ো না।“ মাতা আস্বস্ত হইয়া টেলিফোন সংযোগ কাটিয়া দিলেন।

তরূণী বাসায় ফিরিতে ফিরিতে ভাবিতে লাগিলো, “আমাকে কিরুপ দেখিতে লাগিতেছে!” যুবকের বহুত উচ্চাশা রহিয়াছে পাত্রীকে লইয়া। ‘ফরসা হইতে হইবে। লম্বা হইতে হইবে’ ইত্যাকার নানাবিধ শর্ত! বাহির হইতে ফিরিয়া আসিবার সময় উপস্থিত হইলে তরুণীর চেহারায় রাজ্যের তৈল ভিড় জমায়! আজ যদিও অতি বেশিক্ষণ সময় সে বাহিরে অবস্থান করে নাই; রৌদ্রে ঘুরাঘুরিও করে নাই তাহাতে তৈল জমিবারও অবকাশ পায় নাই।

পাত্র খবর দিয়াছে সে আসিতেছে। অদ্যাবধি আসিয়া উপস্থিত হয় নাই। তাহার মানে তো এইরুপও হইতে পারে যে, পাত্রকে তরুণীরই আবাস চিনাইয়া গৃহে প্রবেশ করাইতে হইতে পারে। এহেন ভাবনায় তাহার অতিশয় হাস্য আসিলো।

গৃহের নিকটে পৌঁছাইয়া গিয়াছে প্রায় এমন সময় তরূণী দেখিতে পাইলো, কে জানি এক যুবা একটুখানি ঘাড় গুজ করিয়া দাঁড়াইয়া! খয়েরী বর্ণের টি-শার্ট পরিয়া। এক হস্তে একখান চওড়া মিষ্টান্নের প্যাকেট। তাহার অতি নিকটেই তরুণীর নিজের বাটীর কাজের বুয়াও রহিয়াছে। তাহারা কি জানি আলাপচারিতা করিতেছে। এই কি তবে সেই যুবক! আতিক! কবে হইতে আসিবে আসিবে করিতে করিতে মাতার মুখে শুনিতে শুনিতে তাহার নামখানি হৃদয়ে গাঁথিয়া গিয়াছে।

তাহার দিকে পেছনে ফিরিয়া যুবক বাটীর সদর দরজায় না ঢুকিয়া আরো সামনের দিকে অগ্রসর হইয়াছে। এই সুযোগে তরূণী তাহার বাহনের ভাড়া মিটাইয়া দ্রুত পদে বাটীর ভিতরে প্রবেশ করিলো।

মাতা তাহার বাটীতে অস্থির হইয়া অপেক্ষা করিতেছিলেন। তিনি এই অকস্মাৎ আগমণের অতিথিকে প্রায় দ্বি-প্রহর হইয়া আসিতেছে এরুপ সময়ে কি করিয়া আপ্যায়ন করিবেন তাহা ভাবিয়া না পাইয়া উতলা হইয়া যাইতেছেন বারংবার। তরুণীর পিতাও বাটীতে উপস্থিত নাই।

তরূণী তাহার নিজের কক্ষে প্রবেশ করিয়া দেখিতে পাইলো, সেইস্থানে তাহার দুই খালা তাহার বিছানার দুই পার্শ্বে বসিয়া তাহারই অপেক্ষা করিতেছেন। তাহাদের মইধ্যে কনিষ্ঠজন রন্ধনকক্ষে যাইয়া মাতার সহিত খাদ্য দ্রব্যাদির ব্যবস্থা করিতে লাগিলেন। আর বাকি জন তাহার রুপচর্চা ও কোন পোশাক পরিধান করা আবশ্যক হইবে তাহা বাতলাইয়া দিতে লাগিলেন।
তরূণী বাহির হইতে আসিয়াছে বলিয়া তাহার মুখমন্ডল ধৌত করিতে চাহিলো। তাহার খালা তাহাকে তাহা করিতে নিবৃত্ত রাখিলো এই বলিয়া যে, মুখ ধৌত করিলে চেহারার লাবন্যখান চলিয়া যাইবে, তাহার চাইতে যেরুপ আছে সেরুপই থাকা উত্তম হইবে।

ইতোমধ্যে কয়েক মিনিট অতিক্রান্ত হইয়াছে। মাতা তাহাকে পাত্রের সহিত দেখা করাইবার জন্যে ডাকিতে আসিলেন। আসিয়া তিনি দেখিলেন, কইন্যা তাহার যেরুপ ছিলো সেরুপই রহিয়াছে। পোশাক বা রুপের কোন ব্যত্যয় ঘটায়নাই। তাহাতে মাতা বিরক্ত হইলেন। তথাপি, দুই বহিনের সম্মুখে কিছুই কহিতে না পারিয়া তাহাকে ডাকিয়া সাথে লইয়া বাহিরের কক্ষে যেইস্থানে আতিক বসিয়া রহিয়াছে সেই স্থানে যাইয়া ঢুকিলেন।
মাতার পেছন দিয়া প্রবেশ করিয়া দেখিলো তাহার ভবিষ্যৎ পুরুষ হইতে যিনি আসিয়াছেন, অতি নিকটেই সোফায় বসিয়া। তরূণী তাহাকে দেখিয়াই সালাম জানাইলো।

আতিকও সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া সালামের উত্তর কহিলো। আতিকের এহেন দাঁড়াইয়া সালামের উত্তর প্রদানের প্রক্রিয়ায় তরুণীর ভিতরকার সমস্ত ভয় ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব মুহুর্তেই উড়িয়া চলিয়া গেলো। “উনি কি তাহার নিজের পার্শ্বে তরুণীর উচ্চতা মাপিতেই এরুপ করিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন?” ভাবিতে ভাবিতে তরুণী আতিকের সম্মুখে টেবিলের অপর পার্শ্বে সোফায় উপবেশন করিলো।

মাতা পাশে বসিয়া নিজ বাটী, তাহার সংসার ও সন্তানাদির সমূহ বর্ণনা প্রদান করিতে লাগিলেন। তরুণী বসিয়া বসিয়া কি করিবে? সে বসিয়া বসিয়া সম্মুখে বসা পাত্রটিকেই পর্যবেক্ষণ করিতে লাগিলো। কয়েকবার পাত্রের সহিত চোখাচোখিও হইয়া গেলো।

কিছুক্ষণ পরে মাতা তাহার কন্যার সহিত পাত্রের একান্ত কথা বলিবার সুযোগ করিয়া দিয়া সেখান হইতে সরিয়া গেলেন। তাহাকে তো দুপুরের খাবারেরও বন্দোবস্ত করিতে হইবে। খবর প্রদান না করিয়া এরূপ মধ্যাহ্নেই কেহ আসে নাকি পাত্রী দেখিতে! তাও খালি হাতে আগমণ করে নাই তাই রক্ষা!

পারুল ও আতিকের বহুক্ষণ কথাবার্তা চলিল। কিছুক্ষণ পরে তাহার মাতাও আসিয়া তাহাদের সাথে একত্রিত হইলেন। মাতার দুই বহিন বার বার করিয়া বলিয়া দিয়াছিলেন, “পাত্রের সম্মুখে যেন পারুলকে বেশিক্ষণ রাখিও না। তাহা হইলে অযথা ক্ষুত বাহির করিতে সুযোগ খুঁজিবে।“ এদিকে কাজের দোহাই দিয়াও মাতা ও পাত্রের সম্মুখ হইতে পারুল অত সহজে ছাড়া পাইলো না। পাত্র তাহাকে জোর করিয়া বসাইয়া দিল এই কহিয়া, “উঠিতেছেন কেন? বসিয়া থাকুন না!” এহেন কথা বলিবার পর পারুল আর সে জায়গা ছাড়িয়া উঠিতে পারিল না। বসিয়া বসিয়া কথা শুনিতে লাগিলো। তাহাতে লাভ হইবার বলিতে যাহা হইলো তাহা এই, মাতা তাহাকে অনেক কথা যাহা বলিতে চাহেন নাই ইতিপূর্বে, অথবা খুশির আতিশয্যে মাতার কর্ণকুহরে আতিকের সমস্ত কথা প্রবেশ করিলেও মর্মভেদ করিতে পারিতেছিলো না। এই আতিক আসিবে আসিবে করিয়া, কতদিন ধরিয়া অপেক্ষা করিতে করিতে সকলের নিকটে হেনস্থা হইতেছিলো, “আতিক আর আসিবেনা” শুনিয়া। সেই আতিক আসিয়াছে! তাহার কথাই সত্য প্রমাণিত হইয়াছে। এই খুশি তিনি কোথায় রাখিবেন ভাবিয়া পাইতেছেন না। তাহার ইচ্ছা করিতেছে বাটীশুদ্ধ সমস্ত লোকজনকে ডাকিয়া খবরখান এখনি জানাইতে।

আরও কিছুক্ষণ বসিয়া থাকিবার পরে, মাতা তাহাকে ভেতরে তাহার নিজের কক্ষে যাইতে আদেশ করিলেন। এক্ষণে পাত্রের সম্মুখ হইতে সরিতে ইচ্ছা করিতেছিলো না যদিও। তথাপি যাইলো। নিজের কক্ষে আসিতেই খালামনিদ্বয়কে দেখিল তাহার রসমালাই খাইতেছেন। তাহাকে দেখিয়া হাসিয়া বলিয়া উঠিলো, “তোমার বিবাহের মিষ্টি খাইতেছি!” তরুণী ভাবিলো, উহা নিশ্চয়ই পাশের দোকান হইতে তাহার মাতাই কিনিয়া লইয়া আসিয়াছিলো। পরে শুনিলো উহা আতিকই আনিয়াছে।

পাত্র আরো কিছুক্ষণ তাহার মাতার সহিত কথা বলিয়া বিদায় লইলো। মাতার নানী আসিয়া কহিলো, “কিরুপ দেখিলি তোর জামাইরে?” পারুল কহিল স্বলজ্জ হাসিয়া, “লোকটা খুবই সর্মিন্দা আছে। মিনমিন করিয়া কথা কহে!“ মাতার দিকে তাকাইয়া কহিলো, “ছবিতে তাহাকে আরো অধিক সুদর্শন দেখিতে লাগিয়াছে। সামনাসামনি তাহাকে খানিকটা নির্বুদ্ধির বলিয়া ঠেকিলো।“ মাতা তাহাতে একমত হইতে পারিলেন না। আতিককে তাহার কন্যার জামাতা হিসাবে অতিশয় পছন্দ হইয়াছে। এখন, শুভকাজটা সম্পন্ন হইলেই হয়। তাহার মন বলিতেছে এইস্থানেই কথা পাকাপাকি হইবে!

(চলিবে...)

বুধবার, ৪ এপ্রিল, ২০১২

বড় গল্প: তরুনীর বিবাহ সমাচার (পর্ব-০৩)

পর্ব-০৩

আকাশ গুড়ুম গুড়ুম শব্দ করিয়া বাজিয়া চলিয়াছে। সেই কখন হইতে। তরুণীর মনের অন্দরেও আকাশের মতনই গুড়ুম গুড়ুম বাদ্য বাজিতেছে। মুখ ভার!

সকালের সূর্য উঠিয়াছিলো ফকফকা হইয়া। মাড় দেওয়া সাদা কাপড়ের মতন চারিদিকে চকচক করিতেছিলো। দিনে্র প্রথম ভাগ হইতে প্রকৃতির অনুরূপ ভাব মনের মধ্যে বিরাজ করিতেছিলো তরুণীরও। সারা সকাল হইতে মধ্য দুপুরের গনগনে রৌদ্রের আলোর মতন তাহার মনের মধ্যেও আলো চমকিত হইতেছিলো। বৈকালের পূর্বাবধিও ঘুমাইবার আপ্রাণ চেষ্টা করিয়াও দুই চক্ষের পাতা এক করিতে পারিতেছিলো না। অশান্ত হইয়া যাইতেছিলো বারে বারে। যতই সে শান্ত রাখিতে চেষ্টা করিতেছিলো, তথাপি পারিয়া উঠিতেছিলোনা।

বৈকাল হয় হয় এমন সময়ে আচমকা আকাশ গাল ভার করিয়া কাহার উপরে জানি তাহার সমস্ত আবেগের ভাব গোপন করিয়া রাখিতে না পারিয়া হাউমাউ করিয়া কান্দিয়া বুক ভাসাইলো। এহেন আকাশের ক্রন্দন দেখিয়া তরুণী কিঞ্চিৎ আশান্বিত হইয়া উঠিলো এই ভাবিয়া যে আজগে আর কোন ঘটনা ঘটিবে না।

বৈকাল গড়াইয়া যাইয়া সন্ধ্যা হইয়া আসিতেছে। এতক্ষণে আকাশের ক্রন্দনও থামিয়াছে। বোধকরি, মেঘের সাথে তাহার অভিমানেরও সমাপ্তি ঘটিবার তোরজোড় চলিতেছে।
নতুন করিয়া ঝগড়া বাঁধিবার সম্ভাবনাও একেবারে উড়াইয়া দেওয়া যাইতেছে না যদিও।

উত্তর পাশের কক্ষের কাছ দিয়া যে বারান্দা রহিয়াছে, সেইখানে দাঁড়াইয়া তরুণীর মাতা কাহাকে যেনো টেলিফোন করিয়া কুশল জিজ্ঞাসা করিলো। তাহার পরে কাহার আগমনজনিত কারনে রন্ধনগৃহে নানাবিধ খাদ্য সজ্জিত করিতে নিজেকে ব্যপৃত রাখিতে চলিয়া গেলো।

তরুণী ইহার সকলই জানিতো। “কাহার আসিবার কথা আর কে আসিতেছে!” তরুণী স্মিত হাসিয়া উঠিলো আপন মনে।

দিন দুয়েক আগে তরুণী সৌন্দর্য্য চর্চাকেন্দ্র হইতে আপন বাটীতে ফিরিয়া আসিবার পর মাতার সহিত মাতার কামরায় বসিয়া রহিয়াছিলো। মাতা তাহার পত্রিকার পাতা উল্টাইয়া পত্রিকায় প্রদত্ত বিবাহ শাদীর বিজ্ঞপ্তিগুলান চোখ বুলাইয়া যাইতে যাইতে একখান ঠিকানায় আসিয়া থামিয়া গিয়া আপন কন্যাকে অস্থির হইয়া বলিয়া উঠিলেন, “পারুল, লক্ষ্য করিয়া দেখো, এইখানে কি একটিবার টেলিফোন করিতে পারি?”
পারুলও উৎসুক নয়নে মাতার ডাকে পত্রিকায় চক্ষু বুলাইলো। যেই লম্বা সুদর্শন যুবকের আসিবার কথা ছিলো তাহারই প্রতীক্ষা করিতে করিতে বোধ করি তরুনী তাহাকে কিঞ্চিৎ ভালোবাসিয়া ফেলিতেছিলো। আর তাহার আগমনের কথা থাকিলেও সে আসিতেছিলো না বলিয়া তাহার উপরে অভিমানও হইতেছিলো। সেই অভিমানবশেই সে আচমকা এক সিদ্ধান্ত লইলো। মাতাকে বলিয়া উঠিলো, “বার্তা লও উক্ত পাত্রের।“ বলাই বাহুল্য এই পাত্র বলিতে আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত নতুন এক যুবকের কথাই সে বলিতেছে যাহাকে সে চেনে না; এমনকি তাহার বৃত্তান্তও কিছুই জানা হয় নাই। মাতা তৎক্ষণাৎ টেলিফোন করিয়া বসিয়াছেন। বিবাহের হেতু একজন যুবকের আশায় বসিয়া থাকিলে তো চলিবে না। দেখাই যাউক না, আল্লাহ কাহার সাথে তাহার কন্যার জীবন বাঁধিতে চান। আর তরুণীর এইরুপ ব্যবহারের হেতু হইলো এই, যে তাহার সেই সুদর্শনকে দেখাইবে, “তুমি না আসিলে কি হইবে, আমাকে দেখো আরো অনেকেই বিবাহ করিতে আগ্রহী!” এইসবের কিছুই যদিও উক্ত সুদর্শনের জানা সম্ভব ছিলো না কোনপ্রকারেই।

সেই সেইদিন যাহাকে হঠাত করিয়া ফোন করিয়া বসিয়াছিলো মাতা, আজ অপরাহ্নে তাহারই আসিবার কথা। পাত্রের মাতা। পাত্র লম্বায় তরুণীর সমান উচ্চতা। সরকারী চাকুরে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত হইয়াছে। ইহার আগেও আরো দুই দুইবার এই দুই মাতার কথা হইয়াছিলো। এইবার লইয়া তৃতীয়বার। একবার তরূণীর পিতা এবং আর দুই বার উক্ত ভদ্রমহিলা বিবাহের সম্বন্ধ ঘটাইবার ইচ্ছা পোষণ করিয়া পত্রিকায় বিবাহের বিজ্ঞপ্তি প্রদান করিয়াছিলো।

তরূণীর মাতা সেই লম্বা যুবকের জন্য কয়েক পদ মিষ্টান্ন ও অন্যান্য আয়োজন করিয়া রাখিয়াছিলেন। মাতাও একখান দীর্ঘশ্বাস গোপন করিলেন, “কাহার জন্য খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুত করিলাম আর কে আসিয়া এইসব সাবাড় করিবে!”

তরুণী তখন গৃহের মধ্যে এক কামরা হইতে আরেক কামরায় অস্থির পদে হাঁটিতেছিলো। এমন সময়, বাড়ির সদর দরজায় কেহ আসিয়াছে বলিয়া সাড়া দিয়া উঠিলো দরজা স্বয়ং। অর্থাৎ বেল বাজিয়া উঠিলো। তরুণী অভ্যাসবসে দরজার ছিদ্রে যাহাকে লুকিং গ্লাস বলা হইয়া থাকে তাহাতে চোখ বুলাইয়া দেখিতে পাইলো, এক ভদ্রমহিলা সালোয়ার কামিজ পরিধান করিয়া তাহাদেরই দরজায় দাঁড়াইয়া!

তরুণী দরজা না খুলিয়া ভিতর হইতে তাহার মাতাকে ডাকিয়া “ঐ ভদ্রমহিলা আসিয়াছেন বোধকরি!” কহিয়া দ্রুত পদে নিজের কক্ষে যাইয়া প্রবেশ করিলো। এবং উক্ত কক্ষের দাঁড় টানিয়া দিয়া বিছানার এক কোণায় বসিয়া তাহাকে ডাকিবার অপেক্ষা করিতে লাগিলো। এ এক পরীক্ষা! রোজ রোজ! পুরুষ সম্প্রদায় যদি জানিতো এইরকম হেনস্থার কথা, বুঝিতে পারিতো!

অপরিচিত ভদ্রমহিলা আসা হইতে তিনি চলিয়া যাইবার পর সময়কাল পর্যন্ত কোনরুপ অনিষ্টকর ঘটনা ঘটে নাই। তরুণীর হৃদয়ের মধ্যকার উথাল পাথালও অনেকখানি শান্ত হইয়া গুমোট গরমের পরে হঠাত একপলক দমকা বাতাস যেমন করিয়া প্রশান্তি জুড়াউয়া যায় মনের মধ্যে সেইরকম প্রশান্তি দিতেছিলো। কিন্তুক, আগমনী হেতু হইয়া মনকে প্রশান্ত করিয়া দিয়া গেলো যিনি তাহার একখান কথাতেই চাপা ক্ষোভ দানা বাঁধিয়া উঠিতে লাগিলো।

না, ক্ষোভ তাহার সমীপে নহে যিনি কন্যা দেখিতে আসিয়াছেন। ক্ষোভ তাহার আপন পিতা-মাতার প্রতি।

(চলিবে...)