কথাতো প্রায় প্রতিদিনই হয়। হচ্ছে সেই এক বছর, কিংবা তার বেশিও হতে পারে। কিন্তু দেখা হয়নি। একবার অনেক
জোরাজুরির পর নিজের ফটো পাঠিয়েছিল ইমেইলে। তাও শুধু এক পলক দেখেই ডিলিট করে দেয়ার শর্তে!
মাঝে হারিয়ে গিয়েছিল প্রায় এক বছর? না না , এক বছর নাহ! আমার নেপাল
শিক্ষা সফরের দিনও সকালে ফোন করেছিল। তবে আর যোগাযোগ না করার শর্ত জুড়েছিল!!
ও এক পশলা বৃষ্টির মত আমার কাছে আসে যায়। আসে! যায়! চলে যায়। আবার ফিরে ফিরে
আসে! এ এক অন্য রকম!
আমাকে ওর ইদানিং খুব দেখার শখ হয়েছে। দেখবে , কথা বলবে। বলবে ওর সব বলা না বলা যত কাহিনী। আমাকে কেন যে
ওর এত বেশি ভাল লাগে সেটা আমি বুঝিনা। ছেলেরা সাধারণতঃ যে কারনে কোন মেয়ের প্রতি
দূর্বল হয় সেরকম কিছু তো ভাবা যায়না। আমাদেরতো দেখাই হয়নি। ফেসবুক-এ শুধু একটি
পাসপোর্ট সাইজের ছবি দেখে কি কারো প্রতি প্রেমানূভূতি জাগতে পারে! আমি অবাক হয়ে
যাই। বার বার!
ও খুব সুন্দর করে কথা বলে! আর আমি? আমার মেজাজেরতো কোন ঠিক ঠিকানা নেই। এই ভালো, এই মন্দ! আমি আমার মেজাজের সবটাই ঝেরে ফেলি ওর উপর। ওহ,
এতক্ষনও বলাই হয়নি, কার কথা বলছি। ও আমার প্রিয়! খুব প্রিয় একজন! ও শুধু আমার
খুব প্রিয় একজন মানুষই নয়, ও আমার সবকিছু। সে আমার প্রতিটি মুহুর্তে জড়িয়ে আছে!
ইদানিং ও অফিসের কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকছে আমার সাথে একটু দেখা করার জন্য ওর সময় হয়ে উঠছেনা!
আমার ছিল ভাইভা পরীক্ষা। কথা ছিল আমাকে আমার ভাইভা শেষে নিতে আসবে। বাসায় পৌঁছে
দিবে। অতটা আশা করিনি যে বাসা পর্যন্ত আসার সময় হবে। ওর অফিস ছুটি হয় সন্ধা সাড়ে
সাতটার পর। তবে, আগে হতে বললামনা কিছু,
যদি রাগ করে আসাই বাদ দিয়ে দেয়! তারপর, এলো সেই দিন! আমি আমার ভাইভার চেয়েও অধীর আগ্রহ নিয়ে
অপেক্ষা করছি আজ মাহীর সাথে দেখা হবে! বলা যায় ওর কারণেই আমি ভাইভা বিষয় নিয়ে
ছিলাম শংকামুক্ত!
ভাইভা পরীক্ষাকেন্দ্রে জায়গামত পৌঁছে
বাসায় ফোন দেবার আগে ওকে মেসেজে জানালাম। এর মাঝে আমি ব্যস্ত হয়ে গেলাম। ভাইভা বোর্ডে
সাইন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য। ফোন ছিল ভাইব্রেশনে। ও যে একবার ফোন করেছিল টেরই পাইনি। আমি আবার যখন ট্রাই
করলাম, দেখি ফোনটা বন্ধ। আরে
এসময় আবার বন্ধ কেন? ভাবতেই কেমন জানি মনে
কু-ডাক দিল! হু, বুঝছি , আসবেনা! তাই গেলাম রেগে। দিলাম একটা রাগী এস এম এস,
'কি ব্যাপার, ফোন কেন বন্ধ থাকে?' পরে মেসেজ এলো, "আমি মিটিং এ" ! "ধুর ছাই , আজ আবার কেন মিটিং আর এই সময়ে!" আসলে, মিটিং তো হতেই পারে! এইসব
অফিসিয়াল ব্যাপার। আগে হতে কোন কিছু বলা যায়না প্রাইভেট ফার্মে। আমি অযথাই ক্ষেপে যাচ্ছি! মনকে বুঝালাম।
আবার এক ঘন্টা পরে আমি ওকে মেসেজ পাঠালাম, "শোন, আমার ভাইভা আর
একটু পরেই শেষ হয়ে যাবে। তুমি চারটায় অফিস হতে বেরিয়ে পরো।" আবার মেসেজ এলো,
" "আমি এখনও মিটিং-এ"।
এইবার মেজাজ গেল খিচড়ে! যাহ্, বুঝছি, আর আজ দেখা হবেনা! আমার চেহারায়ও সেটা প্রকাশ পেয়ে গেল।
অনেকক্ষণ ধরে , ইডেন কলেজ হতে আসা আরেক
ক্যান্ডিডেট এর সাথে পাশাপাশি বসে কথা হচ্ছিল। আমার পরেই ওর সিরিয়াল। সে আমাকে
বললো, "আপু, আপনার কি খুব টেনশন হচ্ছে?" আমি বললাম, "কেন? আমার চেহারায় প্রকাশ
পেয়েছে বুঝি?" ও বললো, "হ্যাঁ"!
আসলে, সত্যি কথা জানেন, মাহীকে আমি যতই বলি, ও আমাকে যতটা
ভালবাসে, আমি তার এক কানাকড়িও
ভালবাসিনা। ওকে মিস করিনা। কিন্তু, আমার চেয়ে সেটা
আর কে বেশি জানে যে, আমি ওকে পাগলের মত মিস
করি। ও আমাকে এতটা দিয়েছে যে, সেটা আসলে কথা
দিয়ে বলে বোঝান যাবেনা বা শেষ করা যাবেনা। ওর কথা পুরোপুরি বলতে গেলে একটা উপন্যাস
লেখা হয়ে যাবে।
আমারতো মেজাজের কোনও ঠিক ঠিকানা নেই। দিনের মধ্যে হাজার বার আমার মনটার দিক
বদল হয়। আমি ওকে সকাল সন্ধ্যা কত উপদেশ যে দেই! এই করোনা, ওই করোনা, এটা ঠিক নয়,
ওটা ঠিক নয়, এভাবে চলো, ভাল হবে! যেন ও
একটা শিশু! আমি ওকে শিশুর মত আগলে রাখি। বা রাখতে চাই। আসলে ওকে সামনাসামনি
দেখিনিতো, তাই বোধ হয় এমন করে বলতে
একটুও বাঁধেনা! মাঝে মাঝে বকাঝকাও করি! অবশ্য আর একটা কারণও আছে! আসলে হয়েছে কি
জানেন, ওর বাবা-মা না আমাদের সম্পর্কটা মেনে নিচ্ছে না!কিন্তু, ও খুব পাগল আমার
প্রতি! খুউব! প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পথে ও আমাকে একবার ফোন দেবেই।
অফিস ছুটির পর হতে একেবারে বাসায় পৌঁছানো পর্যন্ত ওর সারাদিনে কি হলো না হলো সব
আমাকে বলা চাই। সেজন্যে ও বসুন্ধরার অফিস
হতে বের হয়ে কল্যাণপুরে বাসা পর্যন্ত যেতে যেতে পুরো সময়টা আমার সাথে কথা বলবে।
সে যাই হোক, যে কথা বলতে চেয়েছিলাম।
ওতো বললো, ওর মিটিং। আমি আমার ভাইভা
শেষ করে দেখি ওর মোবাইল বন্ধ। আমার একটা মজা করার ইচ্ছে হলো। ওকে একটা মেসেজ
পাঠালাম, "শোন, বুঝেছি, শুধু আজ কেন,
তোমার সাথে আর কোনদিনই মনে হয় আমার দেখা হবেনা।
আমি এখন বাসে। বাসায় চলে যাচ্ছি।" কিন্তু, বাস ধরলাম আসলে, বসুন্ধরার উদ্দেশ্যে। ওর অফিস এর
কাছে। বাস ঠিক ওর অফিসের সামনে দিয়ে যাবেনা। তবে, একটু হেঁটে গেলেই ওর অফিসে যাওয়া যাবে।
বাসে চড়ে বসার পরও খালি মন দোনোমনো করতে লাগলাম, যাব নাকি যাবনা।
এই করতে করতে বাস ওর অফিসের রাস্তা কিছুটা ছাড়িয়েও গেল। দুজন লোক নামছিল বাস হতে।
আমি আমার পাশের লোকটাকে বললাম, "এটা বসুন্ধরা ছাড়িয়ে গেলনা?" লোকটি হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়তেই আমি ছুটে নেমে গেলাম বাস থেকে।
তারপরেরটুকুতো ইতিহাস!!
আমি প্রথমে ওর অফিসে ঢোকার রাস্তাটা পাচ্ছিলাম না। বিশাল এরিয়া। বেজমেন্টে নেমে সিক্যুরিটিকে বলতেই বুঝিয়ে দিল কোন পথে ঢুকতে হবে। আমি অফিসের দরজা দিয়ে ওর
অফিসের সামনে বসা সিক্যুরিটিকে নাম জানালে, "খন্দকার মাহী স্যারের কাছে এসেছে" জানিয়ে আমাকে একেবারে সরাসরি ওর
রুমে নিয়ে গেল। ওইখানে বসা আরো তিন জন ভদ্রলোক। অফিসার। ওর কলিগ। আমি এতক্ষণ ধরে ছুটে চলা স্বপ্ন
হতে বেড়িয়ে এলাম। কবে ওর ছবি দেখেছিলাম! ভুলেই গেছি! আর, শুনেছিলাম এই নামে আরো একজন আছে এই অফিসে। আর তাছাড়া, সেই মূহুর্তে মনে হলো, যদি দেখা গেল, আসলে এই অফিসে ওই নামে যে থাকে সে আসলে অন্য কেউ! কেমন ভয় ভয় করতে লাগলো। অথচ, ওকে নিয়ে আমার এরকম টেনশনের কোনও কারন নেই! ইন্টারনেট দুনিয়ার
মানুষগুলো অধিকাংশই ভুয়া হলেও, আমার মানুষটাকে আমি কখনোই
অবিশ্বাস করতে পারিনি এক পলকের জন্যও। ওর প্রতিটা কথা আমি বিশ্বাস করে গেছি
একেবারে শুরু হতে শেষ পর্যন্ত। তবু, আজ এই মুহুর্তে কেমন অস্বস্তি লাগছে!
'উনি অফিস হতে চলে
গেছে!' 'না চলে যায়নি'। 'আরে না এই মাত্র
বেরিয়ে গেল!' এরকম কয়েক রকম কথা শুনতে
লাগলাম ওর কলীগদের মুখ হতে। তার মধ্যে একবার দেখি, ও এসে দাঁড়িয়েছে, ওই রুমের দরজায়! কার সাথে জানি কথা বলছে! একটু বাঁকা হয়ে দাঁড়ানো। আমি ভাবলাম,
থাক্, দেখি, ও আগে আমাকে দেখে কিনা!
পরে যখন ও ওই রুমে ঢুকলো, ওর কলীগরা মনে হয়
মজা পেয়ে গেছে! আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো, "এই কি 'আপনার মাহী'?" আমার হাসি পেয়ে গেল। সম্মতি জানালাম। আর ওকে বললো, "কি ভাই, আপনি না একটু আগে
এই দরজার কাছে আসলেন, ওনাকে (আমাকে) দেখেন নাই?"
ও ঘাড় নেড়ে না সূচক জানালো।
ও মনে হয় এখনি বেরোবে। আমাকে দেখে ও সত্যি অবাক হয়ে গেছে! ওর প্রমি যে অফিসে যাবে
ওকে না জানিয়ে এটা ও ভাবতেই পারেনি!! তবে, কলিগের সামনে সেটা ধরা দিল না। আমি নিজেওতো ভাবতে পারিনি যে কখনো, কোনদিন ওর অফিসে যাবো। সারপ্রাইজ দেয়ার ইচ্ছে ছিলো এবং তা সত্যিই দিয়ে
দিলাম!!
তার পর আর কি! বেরিয়ে এলাম দুজনে! হেঁটে হেঁটে পার করলাম অনেকটা পথ। ও রিকশা
নিতে চেয়েছিল। আমার বাসায় পৌঁছে দিতে চাইলো। আমি বললাম, "রিকশা নিওনা, তাহলে পথ ফুরিয়ে যাবে দ্রুত!" শুনে ও হেসে দিল, "আচ্ছা, ঠিক আছে ,
চলো।" হেঁটে হেঁটে চলে এলাম বাসা পর্যন্ত!
একটা দিন যেন স্বপ্নের মত কেটে গেল! যে স্বপ্ন ঘুম ভেঙ্গে মুছে যাবেনা!

