রবিবার, ৮ মার্চ, ২০১৫

।। প্রবন্ধ ।। একটি লেখক সত্ত্বা ও কিছু খুচরো ভাবনার সমন্বয়।।




একজন কলম পেশাদারী বা কলম ব্যবহারকারী যাকে আমরা লেখক বা কবি বলে থাকি। কিংবা পত্রিকার সম্পাদক বা একজন সাংবাদিক যার কথাই বলি না কেন মোট কথা যিনি লেখেন তিনি বোধহয় সারাক্ষণ তার আশেপাশের ঘটনার মধ্যে থেকে তার লেখার উপকরণ খুঁজতে থাকেন। সকালে ঘুম থেকে জেগে আড়মোড়া ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমোতে চলে যাওয়া পর্যন্ত এমনকি ঘুমের মধ্যেও গল্পের উপকরণ নিয়ে ভাবেন। সমস্ত দিন যা ভাবেন তার ভেতর থেকে উপযুক্ত সূত্রগুলো তুলে আনার চেষ্টা করেন এবং একটা সূত্রের সাথে আরেকটা সূত্র জোড়া দিতে থাকেন। সেই জোড়া দেয়া পাঁচ সাত প্যারা নিয়েই বোধহয় একটি করে ছোট গল্প তৈরি হয়। অন্তত আমার তাই ধারণা। চারপাশের ঘটনাগুলোতে কিছুটা বাড়তি স্নো পাউডার মেখে ভালোমত মেক আপ করিয়ে পাত্রপক্ষের সামনে তথা পাঠকের সামনে মেলে ধরা হয়। অধিকাংশ পাঠকই সাধারণ মানের। যা দেওয়া যায় গিলে খেয়ে ফেলে। কিন্তু কিছু জাঁদরেল পাঠক আছে ভীষণ খুঁতখুঁতে। যত যোগ্যতাসম্পন্ন রূপসীই হাজির করো না কেন কোনভাবেই সন্তুষ্ট করা যায় না। আমি সেরকম জাঁদরেল পাঠকদের লেখকই হতে চাই। যারা বলে উঠবে-ওয়াও! দারুন একটা গল্প লিখেছেন।
কয়েকদিন থেকে একটা ভৌতিক গল্প লেখার শখ চেপেছে। ভীষণ ভিরু প্রকৃতির মানুষ হয়ে কিভাবে এটা সম্ভব করবো বুঝতে পারছি না। সেরকম ভয়াল রাতের কোন বাস্তব অভিজ্ঞতাও নেই যে সেই ঘটনাটা হুবহু লিখে ফেলবো। সামান্য ধুপ ধাপ শব্দে চমকে ওঠা আমার জন্য নিয়মিত ঘটনা। ছোট ভাই-বোনরাও আমাকে ভয় দেখায়। দরজার কোণা কানায় লুকিয়ে থেকে হঠাত আমার সামনে এসে ‘হুপ’ বলতেই আমি ‘আউক’ করে বিকট এক চিৎকার দিয়ে ফিট লেগে যাওয়ার অবস্থা হয়ে যায়! সেই আমি হবো কিনা ভৌতিক গল্পের লেখক!
তাছাড়া লেখক হতে হলে কল্পনাশক্তি প্রবল থাকা উচিত। পুরোপুরি চাপার জোরে লিখতে গেলে আমার আবার প্রেশার নরমাল থাকে না। উত্তেজনায় কাঁপাকাঁপি চলে আসে। লেখা ছাড়া অন্য সব বিষয় তখন শিকোয় ওঠে।
প্রসংগক্রমে অনেক দিন আগের একটা ঘটনা মনে পরলো। তখন সামনে আমার এসএসসি পরীক্ষা। গভীর রাত। সবাই ঘুমে। আমি দেয়ালের এক পাশে রাখা খাবার টেবিলের সবচেয়ে কোণার দিকের চেয়ারে বসে পরীক্ষার পড়া করছিলাম। হঠাত আমার মনযোগ ছিন্ন করে নিলো কিছু একটার খস খস শব্দ। যেখানে বসে আছি তার পেছনে বারান্দার দরজা। আমার মনে হলো সেই দরজা দিয়ে একটা ছায়া আমাকে জাপটে ধরতে এগিয়ে আসছে। ভাবনাটা ভাবাও শেষ আমার চিৎকার দেয়াও সারা! কিন্তুসাথে সাথেই দেখি  কোই শালা ভুত? ভুত না! একটা ত্যালাপোকা খসখস শব্দ তুলে আমার চেয়ারের পাশ দিয়ে উড়ে আরেক দিকে চলে গেলো! আমি দিলাম আরেক চিৎকার। কেননা তেলাপোকা উড়লেও আমার কেমন জানি গা শিরশির করে। এদিকে আমার চিৎকারে বাবা-মা ঘুম ভেঙ্গে ঐ ঘরে চলে এসেছেন! না জানি কি হয়েছে! চরম বকা খেতে হয়েছিলো সেদিন। সামান্য একটা তেলাপোকা দেখে যার এত্ত ভয় তার সায়েন্সে পড়ার যৌক্তিকতা কোথায়! এক বছর পরেই এই তেলাপোকার পেট অপারেশন করতে হবে! ইত্যাদি ইত্যাদি বলে তারা দুজনে ঘুমোতে গেলেন।
কথা যখন উঠলোই আরেকটা ঘটনা বলি। আমার ছোট ভাইটা ভীষণ দুষ্টু। অনার্স করছে এখন তবু দুষ্টামী বাঁদরামি ছাড়লো না। এক রাতের ঘটনা। রাত তখন দুইটা। তখন সবাই ঘুমিয়ে গেছে। বাবা-মা, ভাই। সবাই। ওদের সব ঘরের লাইট নেভানো। সারা বাড়ি ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমি সেদিন সোফার ঘরে শুয়েছিলাম। যাহোক, ওয়াশরুমে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম। আমার সোফার ঘর থেকে ওয়াশরুমটা বেশ খানিকটা দূরে। আমি ফ্রেশ হয়ে অন্ধকার করিডোর পেরিয়ে বসার ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকে দেখি বিছানার পাশের দেয়ালে সোফার চিপায় একটা লোক দাঁড়ানো। আমি তো ‘ও মাগোওওও’ বলে দিলাম এক রাম চিৎকার! আর ওদিকে আমার বাঁদর ভাইটা হেসে কুটিকুটি। আমার এদিকে আত্মা খাঁচাছাড়া হয়ে গেছে আর বাঁদরে হাসে! সে রাতের কথাটা মনে হলে এখনো বুকটা ধ্বক ধ্বক শব্দ তোলে।
লেখক হতে হলে নাকি বেশি বেশি পড়তে হয়। যত বেশি পড়াশুনা করবো তত বেশি শব্দ সম্ভার বাড়বে আমার। কিছুদিন আগে ভাবলাম ভৌতিক গল্পের বইই পড়ি না হয়, তাহলে গল্পের বৈশিষ্ট্য জানা যাবে। একটা গল্পের কাহিনী একটু এদিক ওদিক করে ভেবে নিলেই নতুন একটা গল্প হয়ে উঠতে পারে। যদিও সেটা কপি পেস্ট এর মতন ব্যাপার হয়ে যায়। তবু তো একটা লিখে শিখতাম না হয়।কিন্তু আনকোড়া নতুন একটা টাটকা চমক ভরা কাহিনী লিখে সারা ফেলে দিতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সেরকম কিছু তো লিখতেই পারছি না। আজকালকার নতুন অনেকের লেখাই পড়তে খুব ভালো লাগে। ঠিক আমারই মতন বয়স আমারই মতন শিক্ষাগত যোগ্যতা আমারই মতন সামাজিক অবকাঠামোতে গড়ে উঠা বেঁচে থাকা একটা মানুষের মধ্যে লেখার কি সুন্দর প্রতিভা বিরাজ করে দেখে আমার ভেতরে ঈর্ষা জ্বলে উঠতে থাকে। সে পারে তবে আমি কেন পারি না? কেন পারবো না? লেখার গুনটাও কি তাহলে বাই বর্ন? জন্মগত প্রতিভা? মায়ের বা বাবার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া? আমাদের বংশে কেউ লেখক বা কবি ছিলো বলে মনে পরে না। এমনকি চৌদ্দ গুষ্টির মধ্যে সংবাদপত্রের সাথে জড়িত নেই একজনও। তাহলে আমার মধ্যে সেই প্রতিভা আসবে কোত্থেকে?
কিন্তু- আমাকে যে একটা কিছু লিখতেই হবে। ওহ সরি! একটা কিছু না! একটা কিছু তো সেই কবে থেকেই আমি লিখি। এক সময় ছড়া লিখতাম। কবিতা লিখতাম। তারপর একদিন জনপ্রিয় কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদ এর গল্প পড়ে মনে হলো গল্প লেখা খুব সহজ। তখন একটা দুটো গল্প লিখতে শুরু করলাম। গল্প নয় ঠিক। চারপাশের চেনা ঘটনাগুলোকে ভিন্ন নাম দিয়ে দিয়ে মুখোশে আবৃত করেই বলতাম গল্প লিখেছি। মানুষও দেখি বাহবা দেয়। এর পরে ধীরে ধীরে চেনা কাহিনীগুলোর ভেতরে অচেনা কাহিনী ঢুকিয়ে দিতে শুরু করলাম। এভাবে একটা পর্যায়ে এসে নেশা চেপে গেলো। চারপাশে যা দেখি তাই যেন গল্প। বাইরে কোথাও বেড়াতে গেলাম সেটাও একটা গল্প। আত্মীয়-স্বজন আড্ডায় বসে গল্প করছে সেগুলোও গল্প। গল্পে গল্পে হাত পাকতে শুরু করলো। কিন্তু সেরা হয়ে উঠলো কি? সেরা বা আলাদা কিছু লেখার তাড়নায় মাথাটা মাঝেমাঝে ঝিম ঝিম করে। গত কয়েকদিন ধরে সেই আলাদা এবং সবার চেয়ে সুন্দর লেখাটি কি বিষয় নিয়ে হবে ভেবে ভেবে আমি সারা। কিছুই হলো না। সামাজিক দায়বদ্ধতা আর ভালোবাসার গল্প বহু লিখেছি। লিখতে লিখতে একঘেয়েমী চলে এসেছে। এখন আমি চাই একটা ভৌতিক গল্প লিখতে। ভৌতিক গল্পের উপকরণ খুঁজতে আমি আমার ভাবনাকে প্রসারিত করি। দৈনিক জীবনের বহু শব্দের ভিড়ে নিঃসঙ্গতাকে অনুভব করার চেষ্টায় নামি।
অবশেষে ভৌতিক গল্পের বই কিনতে গেলাম। সন্ধ্যা পেরিয়ে গিয়েছিলো। গল্প লেখা শিখবার জন্য গল্প পাঠ তো তাই আমি অপেক্ষাকৃত সস্তায় বই খুঁজতে থাকি। নীলক্ষেত বইয়ের দোকান ছাড়িয়ে রাস্তার ধারে ফুটপাথে সজ্জিত বইগুলোর মধ্যে খুঁজতে থাকি আমার জিনিস। একটা দোকানে পেয়েও যাই। দোকানীর বইয়ের মধ্যে বেশিরভাগই ভৌতিক বইয়ে ঠাঁসা! আমি একটি বই টেনে নিয়ে প্রচ্ছদটা দেখতে থাকি। কুচকুচে কালো রঙের ভেতর থেকে বের হয়ে আছে একটা রক্তমাখা ছোরা! মেরুদন্ড বেয়ে কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি হতে থাকে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি ছোটবেলায় দেখা ইংরেজী সিনেমা দি ওমেন এর মতো আশেপাশে ঘন কুয়াশা জমতে শুরু করেছে। রাস্তার সোডিয়াম লাইট যেন নয় সব পরিবেশ পালটে যাচ্ছে! ভৌতিক গল্প লেখার জন্য আমার চারপাশ আমাকে তার রুপ বদলে দিচ্ছে। এইবার আমি একটা সার্থক ভৌতিক গল্প লিখে উঠে ফেলবোই। ইস যদি একটা মাইন্ড টাইপিং যন্ত্র থাকতো। তাহলে সমস্ত ভাবনা আর অনুভূতিগুলো সেখানে লিপিবদ্ধ হয়ে যেত। বইয়ের দোকানে গল্পের বইটা হাতে নিয়ে দর কষাকষি করেও কেনা হয়ে ওঠে না। দোকানী ভৌতিক চেহারা নিয়ে বলে-এই দামে ছাড়া এই বই কোনখানে পাইবেন না! নিলে নেন না নিলে ভীড় বাড়ায়েন না! ব্যাটার কণ্ঠের মধ্যে কি যে ছিলো পেটের মধ্যে গুড় গুড় করে উঠে। মনে হয় এখান থেকে এখুনি কেটে পড়তে হবে। নইলে বইয়ের মধ্যে দেখা রক্তমাখা ছুরিতে নিজেকে এফোঁড় ওফোড় হতে হবে।
আজ বার বার দি ওমেন সিনেমার দৃশ্যগুলো মনে পরছে। কিন্ডার কার্টেনের কোন শ্রেণিতে পড়ি তখন প্রথম কিংবা দ্বিতীয়। সবাই মিলে চাচার বাসায় ভিসিআর-এ বসে সিনেমাটা দেখছিলাম। বড় বড় দাঁড়কাক অনেক উঁচু কোন জায়গায় বসে থাকে। তারপর লক্ষ্যস্থির করে শাঁ করে এসে জীবন্ত মানুষের চোখ উপরে খুন করে ফেলে! ওফস! কি ভয়ানক দৃশ্য! আমি অর্ধেকটা দেখে পাশের ঘরে এসে খুব কান্নাকাটি করেছিলাম। এমনকি মা’কেও টেনে এনেছিলাম! না নিজে আর দেখতে গিয়েছিলাম না মাকে দেখতে দিয়েছিলাম। সেই ছোট্ট বয়সে ছবিটা মারাত্মক এটাক করেছিলো আমাকে। এর পর থেকে বাথরুমে একা যেতেও গা ছমছম করতো!  আমার হঠাৎ খুব বমি পেতে লাগলো। ওয়াক ওয়াক করলাম! না, গলা পরিস্কার হচ্ছে না কিছুতেই! নীলক্ষেত পেরিয়ে এসে কাঁটাবন আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট পর্যন্ত চলে আসলাম। এখন পর্যন্ত কোন রিকশা পাইনি। হঠাৎ হ্যাঁচকা টান আর আমি নিজেকে ঠান্ডা পিচের রাস্তায় আবিষ্কার করলাম। কার ধাক্কায় পরলাম আমি না উসটা খেলাম দেখতে না দেখতেই বগল থেকে একটু নিচের দিকে খচ খচ করে দুটো কোপ। তার সাথে সাথে আরও চার পাঁচটা পোচ দিয়ে হাতটাকে আলাদা করে ফেলা হচ্ছে। শুকনা মানুষের হাড় তো শক্ত হয় তাই এখনো মাংস কেটে গেলেও হাড় জোড়া লেগেই রয়েছে। রক্তের কোন গন্ধ নেই। এমনকি ব্যাথাও অনুভূত হচ্ছে না। রাস্তা ছুঁয়ে হাতের কাঁটা হাতের কাছে দু’জোড়া প্যান্ট পরা পা চোখে পরছে শুধু। এরা কারা? আমাকে কেন জবাই করতে চায়? গলায় চাপাতি বসিয়ে দিক। তা না করে এরা আমার ডান হাতটা কেন কেটে নিচ্ছে! ওফ! আমি যে এই হাতেই আমার চারপাশের চিত্র তুলে ধরি আমার লেখার পাতায়।  

পোওওওওও...পোওওওও...ঠাস করে ডান হাতে ডান গালের ওপরে একটা মশা মারলাম। উফ! গালে খুব জোরে চড় মেরেছি। ব্যথা লাগছে! আমি আমার বিছানায় ল্যাপটপটা কোলে নিয়ে ব্যাকাত্যাড়া হয়ে শুয়ে আছি। কী-প্যাডে চাপ দিয়ে দেখি কম্পিউটারের ঘড়িতে পাঁচটা চল্লিশ। বিকেল? মোবাইলে চাপ দিয়ে দেখি –না! এখন ভোর হতে চলেছে! ইন্টারনেট ডিসকানেক্ট হয়ে গেছে। ধ্যেত! ওয়াচ থার্টিটুডটকম-এ লিজি বর্ডেন’স রিভেঞ্জ মুভিটা অর্ধেক দেখা হয়ে গিয়েছিলো; এখন পুনরায় লোড দিতে হবে! ভৌতিক গল্পের রসদ কুড়নোর জন্যই সিনেমাটা দেখতে বসেছিলাম কিন্তু কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি। জাগিয়ে দিলো মশাটা একেবারে ফজরের আজানের আগে দিয়ে। যাই, ওজু করে নামাজটা পড়ে নিয়েই ঘুমোই আবার। কম্পিউটার বন্ধ করে আমি বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দিলাম।

-----
-----
জাকিয়া জেসমিন যূথী
২৯ জানুয়ারী ২০১৪ইং
[নক্ষত্র ব্লগে প্রকাশিত]

কবিতাঃ “নিয়ম ভাঙার নেশা”


বড় বেশি হিসেবের সুতোয় বাঁধা এ জীবন আমার
লজ্জাবনত নিচু মুখে চেয়ে থাকি
নিজের তুলনায় অন্যের সম্মান আগে ভাবি
ভুল করার আগে ভাবি দশবার;

ভাবতে ভাবতে বাড়ে হাঁটুর বয়স,
ভাবতে ভাবতে বাড়ে মনের সাহস,
ভাবতে ভাবতে মনের আগল খুলে,
ভাবতে ভাবতে পাক ধরে চুলে।

কখনো যে বাড়াইনি পা ভুল অলি গলি’তে
সম্মানে সম্মানিত জানি আত্মীয় বন্ধু’তে!

আজ হঠাত পেয়েছে নেশা নিয়ম ভাঙার,
স্নায়ুতন্ত্রে পোকার কামড় চলছে বারংবার,
উত্তেজনায় কাঁপছে তনু, আজ নতুন স্বাদ নেবার।
----------------------------------------------------------
১১।১২।১৩
ধানমণ্ডি
www.nokkhotro.com এ ১ বছর আগে সাহিত্য, কবিতা বিভাগে প্রকাশিত

ছোটগল্পঃ বরিশাইল্যা!


জাকিয়া জেসমিন যূথী ১ বছর আগে সাহিত্যবিবিধগল্পরসরচনা বিভাগে লিখেছেন।

মাইশার বিয়ের বয়স হয়েছে। বেশ ভালো ভালো প্রস্তাবও আসছে। কিন্তু বিয়ে হই হবো করে করেও শেষ পর্যন্ত কোনটাই হয় না। মাইশার দোষ আছে যে তাও না। শিক্ষা-দীক্ষা দেখতে শুনতে আর পাঁচ জনের চেয়ে কোন অংশে কম না। আসল সমস্যা বোধহয় অন্যখানে। পাঁচ ভাইয়ের একমাত্র ছোট বোন মাইশা। মা-বাবার শখের মেয়ে। দাদাবাড়ির দিকের একমাত্র নাতনী। সুতরাং সবার চোখের মনি। আদরের ধন। একে ভালো ঘরে ভালো পাত্রের হাতে তুলে দিতে না পারলে চলবে কি করে! তাই জাত, কাল, শিক্ষা, বংশ বাছতে বাছতে একমাত্র মেয়ে যে বুড়িয়ে যেতে চলেছে সেদিকে কারো খেয়াল নেই। ওদিকে পাড়া প্রতিবেশিরও ঘুম নেই। ঘটক খালি আশেপাশে ঘুরতেই থাকে। একমাত্র কইন্যার বিয়ে বলে কথা। মোটা অংকের দান মারা যাবে! তাই একটার পর একটা প্রস্তাব আসতেই থাকে।
সম্প্রতি একটা ভালো প্রস্তাব এসেছে। ছোট সংসার। শিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পরিবার। বাবা মা বেঁচে নেই। তিন ভাইয়ের মধ্যে ছেলে সবার ছোট। বড় দু’ভাই সংসারী। এবং কারু ভরণপোষণের দায়ও নেই। এমন হাত পা ঝাড়া নির্ঝঞ্ঝাট পরিবার ভাগ্য গুণে পাওয়া যায়। ছেলেপক্ষ এবং ছেলে মাইশাকে দেখে পছন্দ করেছে। মাইশারও অমত নাই। কিন্তু তবুও বিয়েটা হবার নয়। কেন? কারণ মাইশার ফুফি বিয়েতে রাজী নয়। কেননা ছেলের বাড়ি বরিশাল। বরিশালের লোক খুব ঘাউড়া। এখানে একমাত্র ভাস্তির বিয়ে দেয়া যাবে না। কিছুতেই না! জামাই মাইশার হাড়-হাড্ডি জ্বালিয়ে খাবে!
মাইশার বাবা-মা’রও এই প্রস্তাব খুব পছন্দ হয়েছে। তাই বোনকে ডেকে কাছে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- তোর এত আপত্তি কিসের?
ফুফি রেগে বলে উঠলো- নতুন কইরা বলার কি আছে? তোমাগো জামাই যে বরিশালের! তা কি মনে নাই? সব ভুইলা গ্যাছো? সেই ঘটনাটা মনে নাই-তোমার ভাগ্নী রিফা যখন ছোট, অফিস থেকে ফিরাই জিজ্ঞেস করছে- মামণিকে ডিমটা সেদ্ধ কইরা খাওয়াইছিলা? আমি যেই বললাম- ওহ, না তো আজকে তো খাওয়াইতে ভুইলা গেছি কালকে খাওয়াবো নে! আর ওমনি ডিমটা ফ্রিজ থেকে বাইর কইরা জানালা দিয়া ফালায় দিলো! আমি ক্যান ভুইলা গ্যালাম সেইটাই আমার দোষ!
মাইশার বাবা হাত নেড়ে বোনকে বলেন- আরে বাদ দে না। সে না হয় রিফার বাবা একটু ঘাউড়া। তাই বইলা কি সবাই একই রকম হইবো? আর তাছাড়া তার অন্য গুণগুলা দেখিস না ক্যান? দেখা হইলেই কি সুন্দর সালাম দিয়া কথা বলে। সব সময় আমার খোঁজ খবর নেয়। টাকা পয়সার সমস্যায় পরলে কখনোই মুখ কালা করে না। মাঝেমাঝে তোকে পর্যন্ত জানতে দেয় না।
মাইশার ফুফি আবার কথা বলে উঠলো কিছুটা রাগ অভিমান ভরা উচ্চ কণ্ঠে- আর সারাদিন আমি ছেলে মেয়ে দুইটারে স্কুল থেকে আনা নেয়া করি। কোচিঙে দিয়া আসি নিয়া আসি। আমার কোন রেস্ট আছে? সংসারের দুনিয়ার কাজ-কর্ম করি। সেই ভোর বেলায় উঠি সকালের নাশতা বানাইতে। একই সাথে আবার অর অফিসে নেয়ার খাবারটাও তো আমাকেই রাইন্দা দিতে হয়। আমার তো আর বান্ধা বুয়া নাই। উনি আবার বাসায় ফিরা কই একটু বিশ্রাম দিবো তা না! সারাদিনে কি করলাম না করলাম তার দুনিয়ার ফিরিস্তি নেন। কোন কিছু গড়বড় অইলেই হয় ফালায় দিবো নয় নিজেই করতে লাগব। আবার এদিকে হইছে আরেক যন্ত্রণা!
মাইশার মা-বাবা দুজনেই উৎকণ্ঠা নিয়ে সাথে সাথে জিজ্ঞেস করলেন-কি হইছে? কি হইছে?
দু’জনের উৎকন্ঠা দেখে ফুফি এবার হেসে ফেললো। বললো-আর কইয়ো না! কি কমু, যেমন বাপ তেমন তার পোলা। রাকিব আর ওর বাবা প্রতিদিন রাতের খাওয়ার পরে মাছের কাটাকুটা, গোশতের হাড্ডি সিড়ি ঘরে কোণায় রাইখা দিতো। সেইটা বিড়ালে খাইতে আসতো। একদিন হাড় হাড্ডি দিছে-বিড়াল গন্ধ শুঁকে না খেয়ে চলে গেছে। সেদিন হাড্ডিগুলা একদম বেশি শুকনা আছিলো। রাকিব বলতেছিলো- ঝোল ছাড়া দিছো তো এইজন্যে খায় নাই। ওগুলারে মনে হয় রাইন্ধা দিলে খাইতো। ওমনি পোলার বাপে হৈ হৈ কইরা উঠলো- আরে তাইতো! দেখছো-তোমার পোলায় কি সুন্দর আইডিয়া দিছে? যেমন বলা তেমন কাজ! এখন আমার প্রতিদিনের কাজ হইছে মুরগীর চিকন হাড় হাড্ডি-মাছের কাঁটা সব খাওয়ার পরে জমা কইরা রাখো। তারপরে হেগুলিরে আবার মশলা দিয়া জ্বাল দেও। তারপরে বিড়ালরে খাওয়াও। সারা সিড়ি জুইড়া হাইগ্যা মুইত্যা বাড়ি-ঘর গান্দা বানায় রাখবো আর আমি ওইটার জন্য রানবো! আবার একটা প্লাস্টিকের চ্যাপটা বাটি রেডি করছে। ঐটাত কইরা দুধ দেয়। কয়- বিড়ালের পুষ্টির দরকার আছে না? যত্তসব! বরিশাইল্যা ভূত! আমি ভুগতাছি ভুগতাছি মাইশার য্যান ভুগতে না হয় সেইজন্যেই কইতেছিলাম!... শেষের দিকে বলতে বলতে রসিকতা ছেড়ে ফুপি পুনরায় ক্ষেপে উঠতে থাকেন।
মাইশার মা বলে উঠলো- তা তো ভালো কাজই করতেছে। সোয়াবের কাম করতেছে।
ফুফি বললো-হ! সোয়াব না কত! সারাদিন কাম করতে করতে আমার জান শেষ! মাঝেমধ্যে ইচ্ছা কইরাই করিনা আমি! না করলে এখন আবার বাপ-পুতে দুইজনেই করে। তাও বিড়ালরে খাওয়ানো চাইই। আর বিড়ালেও পাইছে মজা! ডেইলী খাওয়ার সময় হইলেই দরজার কাছে আইসা ম্যাঁও ম্যাঁও করতে থাকে! মাছের কাঁটাতো সব খায়ই হাড্ডিগুলার একটা গুড়াও এখন পইড়া থাকে না! এখন কয় দিন ধইরা বাপ পোলার লগে মাইয়াও জুড়ছে। ওনারা হাড্ডি থেকে খুব যত্নের সাথে মাংসগুলা আলাদা কইরা খাইয়া হাড্ডিটা বেড়ালের জন্য রাইখা দেয়। বলে- যার খাবার তাকেই দেয়া উচিত। অযথা নিজেরা খাওয়ার দরকার নেই। হাড়ের ভেতরের রসটা খাইলে বরং শারীরিক নানারকম সমস্যা হইতে পারে। কোলেস্টেরল বাড়ে! ইত্যাদি ইত্যাদি! বিড়ালেও খাইয়া বাঁচল। সাথে আমরাও বাঁচলাম। মোট কথা ওর মনে হইছে এটা করা লাগবে ব্যস করবে! বাপটা পাগোল! পোলা মাইয়ারেও পাগোল বানাইয়া ছাড়তেছে! এখন আবার শীত নামছে। তাই কালকে রাত্রে কয়-সিড়ি ঘরে একটা মোটা পাপোশ কিনে আনবে। যেখানে প্রতিদিন খাইতে দেয় সেখানেই একটা মোটা বোর্ডে খাইতে দিবে। আর পাশেই পাপোশটা রাখবে যাতে ঘুমাইতে পারে। শীতের মধ্যে যাতে বিড়ালের ঠান্ডা না লাগে!
মাইশার বাবা বোনের জামাইয়ের সম্পর্কে আগে এত শুনেন নাই। কথাগুলো শুনে ওনার খুব ভালো লাগলো। বোনের কথা শেষ হতেই বলে উঠলেন-তুই আর যাই কস আমার এই বরিশাইল্যা ভূতরেই লাগবো। মাইশার বিয়া আমি এই পোলার লগেই দিমু। আর ছাড়ন নাই। তুই বুঝলি না তুই কোন ফেরেশতারে পাইছোস! সময় থাকতে মূল্যায়ণ কর কামে দিবো।
মাইশার বাবা গিন্নিকে বিছানা রেডি করতে বললেন। ঘুমোবেন। তিনি মনস্থির করে ফেলেছেন। আল্লাহ সঠিক মানুষকেই তাদের মেয়ের জন্যে পাঠিয়েছেন। কথায় আছে না শেষ ভালো যার সব ভালো তার!

 
জাকিয়া জেসমিন যূথী
২৮/০১/২০১৪