২৫/১০/২০১২ ইং রচিত...
।এক।
রু তাকিয়ে আছে একটা ইলেকট্রনিক গ্লাসের দিকে। ও মনস্থির করে
নিলো কিভাবে সাজবে।
প্রিজমিক ড্রেসিং টেবিলের ডান পাশে ছোট ছোট কয়েকটা বোতাম। রু সবচেয়ে নিচেরটায় চাপ
দিলো। সেখান থেকে মৃদু ক্রিং শব্দ তুলে বেরিয়ে এলো একটা অটোমেটিক ব্রাশ। ব্রাশটা
কয়েক সেকেন্ড রু এর পুরো অবয়বে তার প্রভাব ফেললো এবং শেষে জায়গামত বসে সেট হয়ে
গেলো।
রু এইবার চোখ খুলতে পারবে। কিন্তু ওর চোখ খুলতে ইচ্ছে করলো না। ওর সারা
অবয়বে অদ্ভূত শিহরণ। ওর মনে হতে লাগলো, ও আকাশী নীল একটা চারকোণা জায়গায় দাঁড়িয়ে
আছে। আর ওর চারপাশটা শুধু ঘুরছে। ধীরে ধীরে ঘুরছে। ওর দু’হাত দুই দিকে ছড়িয়ে পরলো
নাচের ভঙ্গিতে। ও এখনো চোখ বুজেই আছে। চোখ বুজেই প্রেমময় অনুভূতি উপভোগ করছে।
রু’র ঘরটা একটা উঁচু পাহাড়ের উপরে। গোল অর্ধডিম্বাকৃতি
বাসা। বাইরে থেকে মনে হয় একটা উল্টানো বাটি। সহজ করে বললে ফিল্টারের ঢাকনা। কয়েক
যুগ আগের পৃথিবীর মানুষেরা ব্যবহার করতো। খাবার পানি বিশুদ্ধীকরণের জন্য।
ঘরের ভেতরে রয়েছে একটা ছোট শোবার ঘর। এক পাশে একটা
ড্রেসিং টেবিল। রু খুব সাজতে ভালোবাসে। আরেক পাশে একটা আলমারী রাখা যাতে রয়েছে রু
এর পোশাক। বেশিরভাগই শাড়ি। নানা রঙ এর শাড়ি। এক পাশে একটা ছোট্ট পড়ার টেবিল। আর
তার ওপরে একটা নেল। হাতের পাঁচ আংগুলের মত আকৃতির একটা ইলেকট্রনিক ডিস্ক। তার মধ্যে অসংখ্য ছোট ছোট নখের মতন ‘কী’ বসানো। অনেক
বছর আগে এটার একটা ভার্সন ছিলো যেটাকে তখন ট্যাবলেট বলা হতো। রু এর তখন শৈশব কাল।
।দুই।
রিকি একটা কাঁচে ঘেরা রুমে দাঁড়িয়ে। রুমের এক পাশে সূর্য্যের আলো প্রবেশ করছে। আর সেই
আলোয় রিকির কঠিন মুখাবয়বের এক পাশে আলো পরে উজ্জ্বল আভা ছড়াচ্ছে।
আজ রিকি খানিকটা উৎফুল্ল। ওর এত দিনের প্রচেষ্টা
আলোর মুখ দেখতে চলেছে। খুশী হবারই কথা। শুধু
খুশী না। হঠাৎ অট্টহাসি দিয়ে উঠতে ইচ্ছে করে ওর। কিন্তু নাহ! শেষ হাসিটা হাসবে যখন ও পূর্ণ সফলতা পাবে। যখন
ওর আবিষ্কার সত্যিকারে কাজে লাগবে।
কয়েক যুগ আগে রিকি এ দেশে এসেছিলো। মাত্র ওর তখন একুশ
বছর বয়স। আমেরিকায় রোবোটিক সায়েন্স এর ওপর পড়াশুনা করছিলো ও। এ দেশে পা দিতে না
দিতেই এক সুন্দরী ছিমছাম বঙ্গ ললনার প্রেমে পরে যায় ও। কেমন যেন পাহাড়ি বন্য ছায়া চোখে
মুখে। ওকে দেখে প্রথম যে কথাটা মনে প্রবেশ করে, এই মেয়েকেই ওর চাই। ওর সফলতার সাথী করে নিতে এমন
তেজী পার্টনারই দরকার...
... চোখের সামনে থেকে স্মৃতির পর্দা দূরে সরে
গিয়ে সেখানে চলে আসে কয়েকটা শাড়ি। শাড়ি পরিহিতা রু!
রিকি আবার কাজে মগ্ন হয়ে পরে। ওকে কাজটা দ্রুত
শেষ করতে হবে।
।তিন।
একটা ঘরে তন্তু বিষয়ে পড়াশুনা করছে কিছু ছেলে
মেয়ে। তাদের সবার মনে প্রাণে একই স্বপ্ন। একটা ভালো কাজের জন্য প্রস্তুতি।
সবাই প্রতিদিন আসে রিকির শিক্ষালয়ে। রিকি ছেলে ও
মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠের অংশ আলাদা করে দিয়েছে। প্রতি সাত দিন অন্তর এক একটি
বিষয়ের পাঠ ও সেই অনুযায়ী পরীক্ষা।
মেয়েরা প্রথম সপ্তাহে শিক্ষা নিলো পোশাক বিশেষভাবে
পরিধানের ব্যাপারে। পুরুষদের চোখে কিভাবে
আকর্ষণ জুগিয়েও সংযম রক্ষা করা যায়।
ছেলে শিক্ষার্থীদের দ্বারাই সেটি পরীক্ষা নেয়া
হলো। সপ্তাহের শেষে।
হাজার খানেক এই পরীক্ষায় সফল হলো। বাকি রয়েছে
আরো। পুনরায় প্রশিক্ষণ নিতে হবে। একটা বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। সেটাকে ভেঙে ছোট গ্রুপে ভাগ করে ছড়িয়ে
দেয়া হবে। এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে প্রশিক্ষণ দেবে ও কাউন্সিলিং এর কাজ চলতে থাকবে।
পুরুষদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হলো সংযম অনুশীলনের।
নারীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠার। সুন্দর করে কথা বলার। ইতিবাচক আচরণ
প্রদর্শনের।
দ্বিতীয় সপ্তাহে সামান্য অগ্রগতি হলো ওদের। টানা
ছয় সপ্তাহের প্রশিক্ষণ শেষে গ্রুপের প্রত্যেকেই পরীক্ষায় পাস করতে সক্ষম হলো।
এর পরের কাজটা আরো কঠিন। এবং ঐটাই মূলত রিকির
গবেষণার আসল ধাপ। ঐ কাজটি সফল করা গেলে একটা কাজের কাজই হবে। সারা দেশে-বিদেশে ওর
নাম ছড়িয়ে পরবে।
।চার।
নানা ধরনের কাপড়ের বুনন নিয়ে কাজ করা ছিলো রু এর
নেশা। নীল পাহাড়ের পাদদেশে জন্ম নেয়া রু ছিলো ওর বাবার মতই সাহসী। সবুজ প্রকৃতির
লীলা সৌরভ উপভোগ করতে করতে ও ভাবতো, ‘ইস! যদি হাজার বছর বেঁচে থাকতে পারতাম!
পৃথিবীর নতুন নতুন আবিষ্কারের সাথে তাহলে পরিচয় হতো!’ পাহাড়ের কোলে জন্ম নিলেও বেশ
বিজ্ঞানমনষ্ক মন ওর।
মানুষের ইচ্ছে শক্তি তাকে তার স্বপ্ন পূরণের পথে
ঠিকই নিয়ে যায়। এখন ও ওর স্বপ্নের কাছাকাছি। রিকির মত একজনের ছত্রছায়ায়
ওর দিন মন্দ কাটছে না। শুধু বড্ড এক রোখা। ওকে আটকে রেখেছে। বলেছে, গবেষণা যেদিন আলোর মুখ
দেখবে, সেদিন তুমি বাইরে পা রেখো। আমি কিছু বলবো না।
রু তাই অপেক্ষায় আছে...
।পাঁচ।
সারা দেশজুড়ে বছর বছর ধরে একটা সমস্যা
মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে চলেছে। রাস্তা দিয়ে কোন মেয়েই বাড়িতে শান্তিতে ফিরতে
পারছে না। মেয়েগুলো বাসায় ফিরে জানাচ্ছে রাস্তায় নাকি কতগুলো আজব প্রাণী আজব আজব
আবদার করছে। দেখতে মানুষের মতই। সকলের ভীড়ে যখন থাকে তখন কিচ্ছু বুঝা যায় না। একা
হলেই সমস্যাটা স্পষ্টতায় রূপ নেয়।
এই হঠাৎ উদয় হওয়া অদ্ভূত জীবগুলোর আনাগোণা দেখা
যাচ্ছে দেশের সর্বত্র। কিন্তু জীবগুলোকে সনাক্ত করা যাচ্ছে না। আইন শৃঙ্খলা
বাহিনীগুলোও তাই কোন কাজে আসছে না।
তবে প্রেসিডেন্ট মতিহিতো দু’দিন আগে খবর পেয়েছেন,
দেশের দক্ষিণ ও উত্তরের কয়েকটি নেটওয়ার্কে আগে যেখানে মাত্রাতিরিক্তভাবে ছড়িয়ে
পরেছিলো এই অচেনা আতংক, সেখানে নাকি সপ্তাহখানিকের মধ্যে প্রায় অর্ধেকে
নেমে এসেছে। একটা দেশের আইন চুরি, ডাকাতি, হত্যা, রাহাজানির মত কাজে কঠোর শৃংখলা ও
কাজের বাহাদুরি দেখাতে পারে। কিন্তু এই আজব জন্তুকে বাগে আনতে পারে কে!
“কে উদ্ধার করবে দেশের বাচ্চা মেয়েগুলোকে!” “...না
না ভুল হলো। শুধু বাচ্চা মেয়েই নয়। একটু বয়সীরাও আক্রান্ত হচ্ছে!” “তাজ্জব ব্যাপার হলো, এরা কোন পুরুষ, ছেলে,
বুড়োকে আক্রমণ করে না! শুধুই মেয়ে বা নারী!!” “এরা নাকি সবার
সাথে মিশে থাকে। কখন ওদের চেহারা পালটে কিম্ভূত হয়ে যায় তা কেউ বলতে পারে না!”
মতিহিতোর কানে নানা দিক থেকে এরকম
নানান বক্তব্য ভেসে আসতে থাকে। তিনি ভেবে পান না কি করবেন! এই অদ্ভূত শত্রুর
নিশানা করাও যে ভীষণ কঠিন কাজ!
মোতিহিতো আইন শৃংখলা মন্ত্রী ঘাতুমোইকে ডেকে
প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে দিলেন। আর বসে বসে ভাবতে লাগলেন, সরকার পক্ষের নির্দেশ
ছাড়া যে এই দেশ সেবায় লেগেছে সে নিঃসন্দেহে সরকারের শত্রু। পরবর্তী নির্বাচনে লোকে
তাকেই মেনে নেবে। এটা হতে দেয়া যায় না। খোঁজ নিতে হবে। দ্রুত খোঁজ নিতে হবে।
ঘাতুমোই অলস প্রকৃতির লোক। মন্ত্রীত্ব নিয়েছে
আরামে থাকবে বলে। “কোথাকার কে দেশ সেবা করে বেড়াচ্ছে সেই খোঁজ এনে আমার লাভ কি!
করুক না কেউ দেশ সেবা! বেশিরভাগ লোকই তো আরাম খোঁজে। সত্যিকার দেশ সেবায় এগিয়ে আসে
কয়জন!” বলে গজগজ করতে করতে সরকারের রুমে পা রাখলেন।
সরকারের উপর রেগে গেলেও উপরে কিছুই বলতে পারলেন
না। নিজের মনের কথা গোপন রেখে ভাবতে ভাবতে পুনরায় নিজের অফিস রুমের দিকে পা
বাড়ালেন ঘাতুমোই।
।ছয়।
রিকির নেটওয়ার্ক এখন বেশ শক্তিশালী। সারা দেশের
আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পরেছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মিনি রোবট মস্তিষ্কের হাজার হাজার ছেলে
মেয়ে। রিকির শিক্ষালয়ের শেষ সার্টিফিকেট হিসেবে প্রত্যেকের মগজের ভেতরে ‘ইতিবাচক
আচরণ’ এর একটা নিউরণ যুক্ত করানো হয়। ফলে কেউ একবার প্রশিক্ষিত হবার পরে খারাপ
সঙ্গে পরে বিগড়ে যেতে পারে না। বরং প্রতিটি সদস্য নিজ নিজ নেটওয়ার্কে পৌঁছে দ্রুত
কাজ শুরু করে দেয়। একমাত্র এই সার্টিফাইড প্রশিক্ষণার্থীরাই মানুষের ভেতরে লুকিয়ে
থাকা আজব অদ্ভূত ব্যবহার করিয়েদের সনাক্ত করতে পারে। তাই সন্দেহভাজন ব্যক্তির উপর
পর্যবেক্ষণ চালাতে থাকে। এক সময় তাকেও ইতিবাচকে অন্তর্ভূক্ত করে নেয়। এভাবেই কমে
চলেছে মানুষের ভেতরে গুপ্ত অবস্থায় থাকা নেতিবাচক স্পৃহাগুলো।
।সাত।
মোতিহিতো মন্ত্রীবর্গদের নিয়ে মিটিং বসিয়েছেন।
সকল নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ একমত যে, বিজ্ঞানী রিকি একাই পুরো দেশের আইন শৃঙ্খলা
বাহিনীর জন্য একজন উপকারী বন্ধু হয়ে উঠছেন। একে সম্মানী দেওয়া প্রয়োজন। এখানে
উপস্থিত ছিলেন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হেড জেড জে।
জেড জে একটা প্রস্তাব রাখলেন, “রিকি একজন স্বনামধণ্য
বিজ্ঞানী। ওনার ‘ইতিবাচক নেটওয়ার্কিং’ এর বিষয়টা আমরা মনিটরিং করে দেখেছি যে এটা
অত্যন্ত কার্যকরী একটা পদক্ষেপ। আমাদের ডিপার্টমেন্টে আমরা ওনাকে চাই।”
প্রেসিডেন্ট নিজেও সন্তুষ্ট হয়ে উঠছিলেন। সবার
সম্মতিক্রমে তিনি অনুমতি দিয়ে দিলেন।
কিছুক্ষণ পরে সকলের উপস্থিতিতে এসিস্টেন্ট ও
উপদেষ্টা গেরিগেরিকে যথাযথ নির্দেশনা দিলেন। আগামীকাল সূর্যোদয়ের রক্তিমাভা ছড়ানোর
সময়ে রু ও রিকিকে এই অসাধারণ কাজের স্বীকৃতিস্বরুপ রাষ্ট্রীয় সম্বর্ধনা দেওয়া হবে।
-(সমাপ্ত)-
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন