রবিবার, ৮ মার্চ, ২০১৫

।। প্রবন্ধ ।। একটি লেখক সত্ত্বা ও কিছু খুচরো ভাবনার সমন্বয়।।




একজন কলম পেশাদারী বা কলম ব্যবহারকারী যাকে আমরা লেখক বা কবি বলে থাকি। কিংবা পত্রিকার সম্পাদক বা একজন সাংবাদিক যার কথাই বলি না কেন মোট কথা যিনি লেখেন তিনি বোধহয় সারাক্ষণ তার আশেপাশের ঘটনার মধ্যে থেকে তার লেখার উপকরণ খুঁজতে থাকেন। সকালে ঘুম থেকে জেগে আড়মোড়া ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমোতে চলে যাওয়া পর্যন্ত এমনকি ঘুমের মধ্যেও গল্পের উপকরণ নিয়ে ভাবেন। সমস্ত দিন যা ভাবেন তার ভেতর থেকে উপযুক্ত সূত্রগুলো তুলে আনার চেষ্টা করেন এবং একটা সূত্রের সাথে আরেকটা সূত্র জোড়া দিতে থাকেন। সেই জোড়া দেয়া পাঁচ সাত প্যারা নিয়েই বোধহয় একটি করে ছোট গল্প তৈরি হয়। অন্তত আমার তাই ধারণা। চারপাশের ঘটনাগুলোতে কিছুটা বাড়তি স্নো পাউডার মেখে ভালোমত মেক আপ করিয়ে পাত্রপক্ষের সামনে তথা পাঠকের সামনে মেলে ধরা হয়। অধিকাংশ পাঠকই সাধারণ মানের। যা দেওয়া যায় গিলে খেয়ে ফেলে। কিন্তু কিছু জাঁদরেল পাঠক আছে ভীষণ খুঁতখুঁতে। যত যোগ্যতাসম্পন্ন রূপসীই হাজির করো না কেন কোনভাবেই সন্তুষ্ট করা যায় না। আমি সেরকম জাঁদরেল পাঠকদের লেখকই হতে চাই। যারা বলে উঠবে-ওয়াও! দারুন একটা গল্প লিখেছেন।
কয়েকদিন থেকে একটা ভৌতিক গল্প লেখার শখ চেপেছে। ভীষণ ভিরু প্রকৃতির মানুষ হয়ে কিভাবে এটা সম্ভব করবো বুঝতে পারছি না। সেরকম ভয়াল রাতের কোন বাস্তব অভিজ্ঞতাও নেই যে সেই ঘটনাটা হুবহু লিখে ফেলবো। সামান্য ধুপ ধাপ শব্দে চমকে ওঠা আমার জন্য নিয়মিত ঘটনা। ছোট ভাই-বোনরাও আমাকে ভয় দেখায়। দরজার কোণা কানায় লুকিয়ে থেকে হঠাত আমার সামনে এসে ‘হুপ’ বলতেই আমি ‘আউক’ করে বিকট এক চিৎকার দিয়ে ফিট লেগে যাওয়ার অবস্থা হয়ে যায়! সেই আমি হবো কিনা ভৌতিক গল্পের লেখক!
তাছাড়া লেখক হতে হলে কল্পনাশক্তি প্রবল থাকা উচিত। পুরোপুরি চাপার জোরে লিখতে গেলে আমার আবার প্রেশার নরমাল থাকে না। উত্তেজনায় কাঁপাকাঁপি চলে আসে। লেখা ছাড়া অন্য সব বিষয় তখন শিকোয় ওঠে।
প্রসংগক্রমে অনেক দিন আগের একটা ঘটনা মনে পরলো। তখন সামনে আমার এসএসসি পরীক্ষা। গভীর রাত। সবাই ঘুমে। আমি দেয়ালের এক পাশে রাখা খাবার টেবিলের সবচেয়ে কোণার দিকের চেয়ারে বসে পরীক্ষার পড়া করছিলাম। হঠাত আমার মনযোগ ছিন্ন করে নিলো কিছু একটার খস খস শব্দ। যেখানে বসে আছি তার পেছনে বারান্দার দরজা। আমার মনে হলো সেই দরজা দিয়ে একটা ছায়া আমাকে জাপটে ধরতে এগিয়ে আসছে। ভাবনাটা ভাবাও শেষ আমার চিৎকার দেয়াও সারা! কিন্তুসাথে সাথেই দেখি  কোই শালা ভুত? ভুত না! একটা ত্যালাপোকা খসখস শব্দ তুলে আমার চেয়ারের পাশ দিয়ে উড়ে আরেক দিকে চলে গেলো! আমি দিলাম আরেক চিৎকার। কেননা তেলাপোকা উড়লেও আমার কেমন জানি গা শিরশির করে। এদিকে আমার চিৎকারে বাবা-মা ঘুম ভেঙ্গে ঐ ঘরে চলে এসেছেন! না জানি কি হয়েছে! চরম বকা খেতে হয়েছিলো সেদিন। সামান্য একটা তেলাপোকা দেখে যার এত্ত ভয় তার সায়েন্সে পড়ার যৌক্তিকতা কোথায়! এক বছর পরেই এই তেলাপোকার পেট অপারেশন করতে হবে! ইত্যাদি ইত্যাদি বলে তারা দুজনে ঘুমোতে গেলেন।
কথা যখন উঠলোই আরেকটা ঘটনা বলি। আমার ছোট ভাইটা ভীষণ দুষ্টু। অনার্স করছে এখন তবু দুষ্টামী বাঁদরামি ছাড়লো না। এক রাতের ঘটনা। রাত তখন দুইটা। তখন সবাই ঘুমিয়ে গেছে। বাবা-মা, ভাই। সবাই। ওদের সব ঘরের লাইট নেভানো। সারা বাড়ি ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমি সেদিন সোফার ঘরে শুয়েছিলাম। যাহোক, ওয়াশরুমে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম। আমার সোফার ঘর থেকে ওয়াশরুমটা বেশ খানিকটা দূরে। আমি ফ্রেশ হয়ে অন্ধকার করিডোর পেরিয়ে বসার ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকে দেখি বিছানার পাশের দেয়ালে সোফার চিপায় একটা লোক দাঁড়ানো। আমি তো ‘ও মাগোওওও’ বলে দিলাম এক রাম চিৎকার! আর ওদিকে আমার বাঁদর ভাইটা হেসে কুটিকুটি। আমার এদিকে আত্মা খাঁচাছাড়া হয়ে গেছে আর বাঁদরে হাসে! সে রাতের কথাটা মনে হলে এখনো বুকটা ধ্বক ধ্বক শব্দ তোলে।
লেখক হতে হলে নাকি বেশি বেশি পড়তে হয়। যত বেশি পড়াশুনা করবো তত বেশি শব্দ সম্ভার বাড়বে আমার। কিছুদিন আগে ভাবলাম ভৌতিক গল্পের বইই পড়ি না হয়, তাহলে গল্পের বৈশিষ্ট্য জানা যাবে। একটা গল্পের কাহিনী একটু এদিক ওদিক করে ভেবে নিলেই নতুন একটা গল্প হয়ে উঠতে পারে। যদিও সেটা কপি পেস্ট এর মতন ব্যাপার হয়ে যায়। তবু তো একটা লিখে শিখতাম না হয়।কিন্তু আনকোড়া নতুন একটা টাটকা চমক ভরা কাহিনী লিখে সারা ফেলে দিতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সেরকম কিছু তো লিখতেই পারছি না। আজকালকার নতুন অনেকের লেখাই পড়তে খুব ভালো লাগে। ঠিক আমারই মতন বয়স আমারই মতন শিক্ষাগত যোগ্যতা আমারই মতন সামাজিক অবকাঠামোতে গড়ে উঠা বেঁচে থাকা একটা মানুষের মধ্যে লেখার কি সুন্দর প্রতিভা বিরাজ করে দেখে আমার ভেতরে ঈর্ষা জ্বলে উঠতে থাকে। সে পারে তবে আমি কেন পারি না? কেন পারবো না? লেখার গুনটাও কি তাহলে বাই বর্ন? জন্মগত প্রতিভা? মায়ের বা বাবার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া? আমাদের বংশে কেউ লেখক বা কবি ছিলো বলে মনে পরে না। এমনকি চৌদ্দ গুষ্টির মধ্যে সংবাদপত্রের সাথে জড়িত নেই একজনও। তাহলে আমার মধ্যে সেই প্রতিভা আসবে কোত্থেকে?
কিন্তু- আমাকে যে একটা কিছু লিখতেই হবে। ওহ সরি! একটা কিছু না! একটা কিছু তো সেই কবে থেকেই আমি লিখি। এক সময় ছড়া লিখতাম। কবিতা লিখতাম। তারপর একদিন জনপ্রিয় কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদ এর গল্প পড়ে মনে হলো গল্প লেখা খুব সহজ। তখন একটা দুটো গল্প লিখতে শুরু করলাম। গল্প নয় ঠিক। চারপাশের চেনা ঘটনাগুলোকে ভিন্ন নাম দিয়ে দিয়ে মুখোশে আবৃত করেই বলতাম গল্প লিখেছি। মানুষও দেখি বাহবা দেয়। এর পরে ধীরে ধীরে চেনা কাহিনীগুলোর ভেতরে অচেনা কাহিনী ঢুকিয়ে দিতে শুরু করলাম। এভাবে একটা পর্যায়ে এসে নেশা চেপে গেলো। চারপাশে যা দেখি তাই যেন গল্প। বাইরে কোথাও বেড়াতে গেলাম সেটাও একটা গল্প। আত্মীয়-স্বজন আড্ডায় বসে গল্প করছে সেগুলোও গল্প। গল্পে গল্পে হাত পাকতে শুরু করলো। কিন্তু সেরা হয়ে উঠলো কি? সেরা বা আলাদা কিছু লেখার তাড়নায় মাথাটা মাঝেমাঝে ঝিম ঝিম করে। গত কয়েকদিন ধরে সেই আলাদা এবং সবার চেয়ে সুন্দর লেখাটি কি বিষয় নিয়ে হবে ভেবে ভেবে আমি সারা। কিছুই হলো না। সামাজিক দায়বদ্ধতা আর ভালোবাসার গল্প বহু লিখেছি। লিখতে লিখতে একঘেয়েমী চলে এসেছে। এখন আমি চাই একটা ভৌতিক গল্প লিখতে। ভৌতিক গল্পের উপকরণ খুঁজতে আমি আমার ভাবনাকে প্রসারিত করি। দৈনিক জীবনের বহু শব্দের ভিড়ে নিঃসঙ্গতাকে অনুভব করার চেষ্টায় নামি।
অবশেষে ভৌতিক গল্পের বই কিনতে গেলাম। সন্ধ্যা পেরিয়ে গিয়েছিলো। গল্প লেখা শিখবার জন্য গল্প পাঠ তো তাই আমি অপেক্ষাকৃত সস্তায় বই খুঁজতে থাকি। নীলক্ষেত বইয়ের দোকান ছাড়িয়ে রাস্তার ধারে ফুটপাথে সজ্জিত বইগুলোর মধ্যে খুঁজতে থাকি আমার জিনিস। একটা দোকানে পেয়েও যাই। দোকানীর বইয়ের মধ্যে বেশিরভাগই ভৌতিক বইয়ে ঠাঁসা! আমি একটি বই টেনে নিয়ে প্রচ্ছদটা দেখতে থাকি। কুচকুচে কালো রঙের ভেতর থেকে বের হয়ে আছে একটা রক্তমাখা ছোরা! মেরুদন্ড বেয়ে কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি হতে থাকে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি ছোটবেলায় দেখা ইংরেজী সিনেমা দি ওমেন এর মতো আশেপাশে ঘন কুয়াশা জমতে শুরু করেছে। রাস্তার সোডিয়াম লাইট যেন নয় সব পরিবেশ পালটে যাচ্ছে! ভৌতিক গল্প লেখার জন্য আমার চারপাশ আমাকে তার রুপ বদলে দিচ্ছে। এইবার আমি একটা সার্থক ভৌতিক গল্প লিখে উঠে ফেলবোই। ইস যদি একটা মাইন্ড টাইপিং যন্ত্র থাকতো। তাহলে সমস্ত ভাবনা আর অনুভূতিগুলো সেখানে লিপিবদ্ধ হয়ে যেত। বইয়ের দোকানে গল্পের বইটা হাতে নিয়ে দর কষাকষি করেও কেনা হয়ে ওঠে না। দোকানী ভৌতিক চেহারা নিয়ে বলে-এই দামে ছাড়া এই বই কোনখানে পাইবেন না! নিলে নেন না নিলে ভীড় বাড়ায়েন না! ব্যাটার কণ্ঠের মধ্যে কি যে ছিলো পেটের মধ্যে গুড় গুড় করে উঠে। মনে হয় এখান থেকে এখুনি কেটে পড়তে হবে। নইলে বইয়ের মধ্যে দেখা রক্তমাখা ছুরিতে নিজেকে এফোঁড় ওফোড় হতে হবে।
আজ বার বার দি ওমেন সিনেমার দৃশ্যগুলো মনে পরছে। কিন্ডার কার্টেনের কোন শ্রেণিতে পড়ি তখন প্রথম কিংবা দ্বিতীয়। সবাই মিলে চাচার বাসায় ভিসিআর-এ বসে সিনেমাটা দেখছিলাম। বড় বড় দাঁড়কাক অনেক উঁচু কোন জায়গায় বসে থাকে। তারপর লক্ষ্যস্থির করে শাঁ করে এসে জীবন্ত মানুষের চোখ উপরে খুন করে ফেলে! ওফস! কি ভয়ানক দৃশ্য! আমি অর্ধেকটা দেখে পাশের ঘরে এসে খুব কান্নাকাটি করেছিলাম। এমনকি মা’কেও টেনে এনেছিলাম! না নিজে আর দেখতে গিয়েছিলাম না মাকে দেখতে দিয়েছিলাম। সেই ছোট্ট বয়সে ছবিটা মারাত্মক এটাক করেছিলো আমাকে। এর পর থেকে বাথরুমে একা যেতেও গা ছমছম করতো!  আমার হঠাৎ খুব বমি পেতে লাগলো। ওয়াক ওয়াক করলাম! না, গলা পরিস্কার হচ্ছে না কিছুতেই! নীলক্ষেত পেরিয়ে এসে কাঁটাবন আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট পর্যন্ত চলে আসলাম। এখন পর্যন্ত কোন রিকশা পাইনি। হঠাৎ হ্যাঁচকা টান আর আমি নিজেকে ঠান্ডা পিচের রাস্তায় আবিষ্কার করলাম। কার ধাক্কায় পরলাম আমি না উসটা খেলাম দেখতে না দেখতেই বগল থেকে একটু নিচের দিকে খচ খচ করে দুটো কোপ। তার সাথে সাথে আরও চার পাঁচটা পোচ দিয়ে হাতটাকে আলাদা করে ফেলা হচ্ছে। শুকনা মানুষের হাড় তো শক্ত হয় তাই এখনো মাংস কেটে গেলেও হাড় জোড়া লেগেই রয়েছে। রক্তের কোন গন্ধ নেই। এমনকি ব্যাথাও অনুভূত হচ্ছে না। রাস্তা ছুঁয়ে হাতের কাঁটা হাতের কাছে দু’জোড়া প্যান্ট পরা পা চোখে পরছে শুধু। এরা কারা? আমাকে কেন জবাই করতে চায়? গলায় চাপাতি বসিয়ে দিক। তা না করে এরা আমার ডান হাতটা কেন কেটে নিচ্ছে! ওফ! আমি যে এই হাতেই আমার চারপাশের চিত্র তুলে ধরি আমার লেখার পাতায়।  

পোওওওওও...পোওওওও...ঠাস করে ডান হাতে ডান গালের ওপরে একটা মশা মারলাম। উফ! গালে খুব জোরে চড় মেরেছি। ব্যথা লাগছে! আমি আমার বিছানায় ল্যাপটপটা কোলে নিয়ে ব্যাকাত্যাড়া হয়ে শুয়ে আছি। কী-প্যাডে চাপ দিয়ে দেখি কম্পিউটারের ঘড়িতে পাঁচটা চল্লিশ। বিকেল? মোবাইলে চাপ দিয়ে দেখি –না! এখন ভোর হতে চলেছে! ইন্টারনেট ডিসকানেক্ট হয়ে গেছে। ধ্যেত! ওয়াচ থার্টিটুডটকম-এ লিজি বর্ডেন’স রিভেঞ্জ মুভিটা অর্ধেক দেখা হয়ে গিয়েছিলো; এখন পুনরায় লোড দিতে হবে! ভৌতিক গল্পের রসদ কুড়নোর জন্যই সিনেমাটা দেখতে বসেছিলাম কিন্তু কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টের পাইনি। জাগিয়ে দিলো মশাটা একেবারে ফজরের আজানের আগে দিয়ে। যাই, ওজু করে নামাজটা পড়ে নিয়েই ঘুমোই আবার। কম্পিউটার বন্ধ করে আমি বিছানা থেকে উঠে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দিলাম।

-----
-----
জাকিয়া জেসমিন যূথী
২৯ জানুয়ারী ২০১৪ইং
[নক্ষত্র ব্লগে প্রকাশিত]

কবিতাঃ “নিয়ম ভাঙার নেশা”


বড় বেশি হিসেবের সুতোয় বাঁধা এ জীবন আমার
লজ্জাবনত নিচু মুখে চেয়ে থাকি
নিজের তুলনায় অন্যের সম্মান আগে ভাবি
ভুল করার আগে ভাবি দশবার;

ভাবতে ভাবতে বাড়ে হাঁটুর বয়স,
ভাবতে ভাবতে বাড়ে মনের সাহস,
ভাবতে ভাবতে মনের আগল খুলে,
ভাবতে ভাবতে পাক ধরে চুলে।

কখনো যে বাড়াইনি পা ভুল অলি গলি’তে
সম্মানে সম্মানিত জানি আত্মীয় বন্ধু’তে!

আজ হঠাত পেয়েছে নেশা নিয়ম ভাঙার,
স্নায়ুতন্ত্রে পোকার কামড় চলছে বারংবার,
উত্তেজনায় কাঁপছে তনু, আজ নতুন স্বাদ নেবার।
----------------------------------------------------------
১১।১২।১৩
ধানমণ্ডি
www.nokkhotro.com এ ১ বছর আগে সাহিত্য, কবিতা বিভাগে প্রকাশিত

ছোটগল্পঃ বরিশাইল্যা!


জাকিয়া জেসমিন যূথী ১ বছর আগে সাহিত্যবিবিধগল্পরসরচনা বিভাগে লিখেছেন।

মাইশার বিয়ের বয়স হয়েছে। বেশ ভালো ভালো প্রস্তাবও আসছে। কিন্তু বিয়ে হই হবো করে করেও শেষ পর্যন্ত কোনটাই হয় না। মাইশার দোষ আছে যে তাও না। শিক্ষা-দীক্ষা দেখতে শুনতে আর পাঁচ জনের চেয়ে কোন অংশে কম না। আসল সমস্যা বোধহয় অন্যখানে। পাঁচ ভাইয়ের একমাত্র ছোট বোন মাইশা। মা-বাবার শখের মেয়ে। দাদাবাড়ির দিকের একমাত্র নাতনী। সুতরাং সবার চোখের মনি। আদরের ধন। একে ভালো ঘরে ভালো পাত্রের হাতে তুলে দিতে না পারলে চলবে কি করে! তাই জাত, কাল, শিক্ষা, বংশ বাছতে বাছতে একমাত্র মেয়ে যে বুড়িয়ে যেতে চলেছে সেদিকে কারো খেয়াল নেই। ওদিকে পাড়া প্রতিবেশিরও ঘুম নেই। ঘটক খালি আশেপাশে ঘুরতেই থাকে। একমাত্র কইন্যার বিয়ে বলে কথা। মোটা অংকের দান মারা যাবে! তাই একটার পর একটা প্রস্তাব আসতেই থাকে।
সম্প্রতি একটা ভালো প্রস্তাব এসেছে। ছোট সংসার। শিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী পরিবার। বাবা মা বেঁচে নেই। তিন ভাইয়ের মধ্যে ছেলে সবার ছোট। বড় দু’ভাই সংসারী। এবং কারু ভরণপোষণের দায়ও নেই। এমন হাত পা ঝাড়া নির্ঝঞ্ঝাট পরিবার ভাগ্য গুণে পাওয়া যায়। ছেলেপক্ষ এবং ছেলে মাইশাকে দেখে পছন্দ করেছে। মাইশারও অমত নাই। কিন্তু তবুও বিয়েটা হবার নয়। কেন? কারণ মাইশার ফুফি বিয়েতে রাজী নয়। কেননা ছেলের বাড়ি বরিশাল। বরিশালের লোক খুব ঘাউড়া। এখানে একমাত্র ভাস্তির বিয়ে দেয়া যাবে না। কিছুতেই না! জামাই মাইশার হাড়-হাড্ডি জ্বালিয়ে খাবে!
মাইশার বাবা-মা’রও এই প্রস্তাব খুব পছন্দ হয়েছে। তাই বোনকে ডেকে কাছে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- তোর এত আপত্তি কিসের?
ফুফি রেগে বলে উঠলো- নতুন কইরা বলার কি আছে? তোমাগো জামাই যে বরিশালের! তা কি মনে নাই? সব ভুইলা গ্যাছো? সেই ঘটনাটা মনে নাই-তোমার ভাগ্নী রিফা যখন ছোট, অফিস থেকে ফিরাই জিজ্ঞেস করছে- মামণিকে ডিমটা সেদ্ধ কইরা খাওয়াইছিলা? আমি যেই বললাম- ওহ, না তো আজকে তো খাওয়াইতে ভুইলা গেছি কালকে খাওয়াবো নে! আর ওমনি ডিমটা ফ্রিজ থেকে বাইর কইরা জানালা দিয়া ফালায় দিলো! আমি ক্যান ভুইলা গ্যালাম সেইটাই আমার দোষ!
মাইশার বাবা হাত নেড়ে বোনকে বলেন- আরে বাদ দে না। সে না হয় রিফার বাবা একটু ঘাউড়া। তাই বইলা কি সবাই একই রকম হইবো? আর তাছাড়া তার অন্য গুণগুলা দেখিস না ক্যান? দেখা হইলেই কি সুন্দর সালাম দিয়া কথা বলে। সব সময় আমার খোঁজ খবর নেয়। টাকা পয়সার সমস্যায় পরলে কখনোই মুখ কালা করে না। মাঝেমাঝে তোকে পর্যন্ত জানতে দেয় না।
মাইশার ফুফি আবার কথা বলে উঠলো কিছুটা রাগ অভিমান ভরা উচ্চ কণ্ঠে- আর সারাদিন আমি ছেলে মেয়ে দুইটারে স্কুল থেকে আনা নেয়া করি। কোচিঙে দিয়া আসি নিয়া আসি। আমার কোন রেস্ট আছে? সংসারের দুনিয়ার কাজ-কর্ম করি। সেই ভোর বেলায় উঠি সকালের নাশতা বানাইতে। একই সাথে আবার অর অফিসে নেয়ার খাবারটাও তো আমাকেই রাইন্দা দিতে হয়। আমার তো আর বান্ধা বুয়া নাই। উনি আবার বাসায় ফিরা কই একটু বিশ্রাম দিবো তা না! সারাদিনে কি করলাম না করলাম তার দুনিয়ার ফিরিস্তি নেন। কোন কিছু গড়বড় অইলেই হয় ফালায় দিবো নয় নিজেই করতে লাগব। আবার এদিকে হইছে আরেক যন্ত্রণা!
মাইশার মা-বাবা দুজনেই উৎকণ্ঠা নিয়ে সাথে সাথে জিজ্ঞেস করলেন-কি হইছে? কি হইছে?
দু’জনের উৎকন্ঠা দেখে ফুফি এবার হেসে ফেললো। বললো-আর কইয়ো না! কি কমু, যেমন বাপ তেমন তার পোলা। রাকিব আর ওর বাবা প্রতিদিন রাতের খাওয়ার পরে মাছের কাটাকুটা, গোশতের হাড্ডি সিড়ি ঘরে কোণায় রাইখা দিতো। সেইটা বিড়ালে খাইতে আসতো। একদিন হাড় হাড্ডি দিছে-বিড়াল গন্ধ শুঁকে না খেয়ে চলে গেছে। সেদিন হাড্ডিগুলা একদম বেশি শুকনা আছিলো। রাকিব বলতেছিলো- ঝোল ছাড়া দিছো তো এইজন্যে খায় নাই। ওগুলারে মনে হয় রাইন্ধা দিলে খাইতো। ওমনি পোলার বাপে হৈ হৈ কইরা উঠলো- আরে তাইতো! দেখছো-তোমার পোলায় কি সুন্দর আইডিয়া দিছে? যেমন বলা তেমন কাজ! এখন আমার প্রতিদিনের কাজ হইছে মুরগীর চিকন হাড় হাড্ডি-মাছের কাঁটা সব খাওয়ার পরে জমা কইরা রাখো। তারপরে হেগুলিরে আবার মশলা দিয়া জ্বাল দেও। তারপরে বিড়ালরে খাওয়াও। সারা সিড়ি জুইড়া হাইগ্যা মুইত্যা বাড়ি-ঘর গান্দা বানায় রাখবো আর আমি ওইটার জন্য রানবো! আবার একটা প্লাস্টিকের চ্যাপটা বাটি রেডি করছে। ঐটাত কইরা দুধ দেয়। কয়- বিড়ালের পুষ্টির দরকার আছে না? যত্তসব! বরিশাইল্যা ভূত! আমি ভুগতাছি ভুগতাছি মাইশার য্যান ভুগতে না হয় সেইজন্যেই কইতেছিলাম!... শেষের দিকে বলতে বলতে রসিকতা ছেড়ে ফুপি পুনরায় ক্ষেপে উঠতে থাকেন।
মাইশার মা বলে উঠলো- তা তো ভালো কাজই করতেছে। সোয়াবের কাম করতেছে।
ফুফি বললো-হ! সোয়াব না কত! সারাদিন কাম করতে করতে আমার জান শেষ! মাঝেমধ্যে ইচ্ছা কইরাই করিনা আমি! না করলে এখন আবার বাপ-পুতে দুইজনেই করে। তাও বিড়ালরে খাওয়ানো চাইই। আর বিড়ালেও পাইছে মজা! ডেইলী খাওয়ার সময় হইলেই দরজার কাছে আইসা ম্যাঁও ম্যাঁও করতে থাকে! মাছের কাঁটাতো সব খায়ই হাড্ডিগুলার একটা গুড়াও এখন পইড়া থাকে না! এখন কয় দিন ধইরা বাপ পোলার লগে মাইয়াও জুড়ছে। ওনারা হাড্ডি থেকে খুব যত্নের সাথে মাংসগুলা আলাদা কইরা খাইয়া হাড্ডিটা বেড়ালের জন্য রাইখা দেয়। বলে- যার খাবার তাকেই দেয়া উচিত। অযথা নিজেরা খাওয়ার দরকার নেই। হাড়ের ভেতরের রসটা খাইলে বরং শারীরিক নানারকম সমস্যা হইতে পারে। কোলেস্টেরল বাড়ে! ইত্যাদি ইত্যাদি! বিড়ালেও খাইয়া বাঁচল। সাথে আমরাও বাঁচলাম। মোট কথা ওর মনে হইছে এটা করা লাগবে ব্যস করবে! বাপটা পাগোল! পোলা মাইয়ারেও পাগোল বানাইয়া ছাড়তেছে! এখন আবার শীত নামছে। তাই কালকে রাত্রে কয়-সিড়ি ঘরে একটা মোটা পাপোশ কিনে আনবে। যেখানে প্রতিদিন খাইতে দেয় সেখানেই একটা মোটা বোর্ডে খাইতে দিবে। আর পাশেই পাপোশটা রাখবে যাতে ঘুমাইতে পারে। শীতের মধ্যে যাতে বিড়ালের ঠান্ডা না লাগে!
মাইশার বাবা বোনের জামাইয়ের সম্পর্কে আগে এত শুনেন নাই। কথাগুলো শুনে ওনার খুব ভালো লাগলো। বোনের কথা শেষ হতেই বলে উঠলেন-তুই আর যাই কস আমার এই বরিশাইল্যা ভূতরেই লাগবো। মাইশার বিয়া আমি এই পোলার লগেই দিমু। আর ছাড়ন নাই। তুই বুঝলি না তুই কোন ফেরেশতারে পাইছোস! সময় থাকতে মূল্যায়ণ কর কামে দিবো।
মাইশার বাবা গিন্নিকে বিছানা রেডি করতে বললেন। ঘুমোবেন। তিনি মনস্থির করে ফেলেছেন। আল্লাহ সঠিক মানুষকেই তাদের মেয়ের জন্যে পাঠিয়েছেন। কথায় আছে না শেষ ভালো যার সব ভালো তার!

 
জাকিয়া জেসমিন যূথী
২৮/০১/২০১৪

গল্পে গল্পে পিঠা তৈরিঃ 'সাত পাকে বাঁধা!!'


নতুন একটা রেসিপি দেখলেই না বানানো পর্যন্ত আর আমার শান্তি নাই। দু-তিন দিন আগের কথা। আম্মাকে বললাম আমার এই এই লাগবে, একটা পিঠা বানাবো। আম্মা বললো-‘চালের গুড়ি তো নাই। আনাতে হবে।’
সেদিনই বিকেলে আব্বা বাইরে গিয়েছিলো। বাসায় ফিরে বলে-“দোকানী বললো-খালু এই গুড়ি দিয়া তো পিটা অইবো না!”
এরপরে ঠিক হলো গুড়ি ভাঙ্গিয়ে আনবে। তারপরে পিঠা বানানো হবে। আজকে গুড়ি ভাঙ্গিয়ে আনার পরে সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের পরে বানাতে শুরু করলাম।
অনলাইনে রেসিপি, বর্ণনা আর ছবি দেখে কিছুটা সংশয় ছিলো-আসলেই যে চেহারা দেখলাম সেরকমই হবে তো! যাই হোক-বিসমিল্লাহ বলে কাজ শুরু করলাম।  

উপকরণঃ
১) আধা কাপ চালের গুড়ি
২) ১টি ডিম
৩) ১ চা চামচ বেকিং পাউডার
৪) চিনি চা চামচের চার চামচ
৫) তেল দেড়-দুই কাপ
৬) এক চা চামচ গুড়া দুধ
৭) এক চিমটি লবণ।

বর্ণনাঃ
আমি প্রথমে আধা কাপ চালের গুড়ি নিলাম। কাপের মধ্যেই বেকিং পাউডার ও গুড়া দুধ চামচ দিয়ে নিয়ে শুকনা চামচ দিয়ে উপর নিচ করে মিশানোর চেষ্টা করলাম। তারপরে সেটা আটা চালুনির উপরে ঢেলে চালুনির নিচে একটা পেপার বিছিয়ে নিয়ে আটা যেভাবে চালে সেভাবে চাললাম। চালুনির নিচে পেপারের উপরে মিহি গুড়া পাওয়া গেলো। চালের গুড়ির সাথে গুড়া দুধ আর বেকিং পাউডার ভালোভাবে মেশানোর জন্যই চালুনি ব্যবহার করলাম।
এই মিহিগুড়া আপাতত পেপারের উপরে থাকুক। অথবা, এটা পেপার থেকে একটা শুকনা কাঁচের বাটিতেও রাখা যেতে পারে।
এবার আমি একটা শুকনা মাঝারী আকারের বাটিতে ডিমটা ভেঙ্গে নিয়ে কাটা চামচ দিয়ে ভালোভাবে কুসুম আর সাদা অংশটা ফেটে নিলাম। তারপরে ফেটানো ডিমের মধ্যে চিনি ও এক চিমটি লবণ ছেড়ে দিয়ে ডিমে্র সাথে ভালোভাবে মিশালাম। এরপরে চালের গুড়াগুলো সবটুকু ঐ ডিমের মিশ্রণে ছেড়ে দিয়ে ভালোভাবে মিশালাম। এই পিঠা বানাতে নাকি পানি দিতে হয় না। পানি দরকার নেই। মিশ্রণ যত ভালোভাবে ফেটানো আর তরলটাও যথেষ্ট পাতলা রাখার কথা বলা ছিলো, আমিও সেরকম রাখতে চেষ্টা করলাম।
এইবার গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে কড়াইটা চুলার উপরে বসালাম। তারপরে প্রয়োজনীয় তেল ঢেলে দিলাম কড়াইতে। জ্বাল বাড়িয়ে দিলাম। তেল সহ কড়াইয়ের কাছাকাছি হাতের তালু মেলে দেখলাম, হাতে আঁচ লাগে কিনা। এর মানে হলো তেল গরম হয়েছে কিনা দেখছি। তেল গরম হয়ে গেলে সুপের চামচে করে ডিমের মিশ্রণ থেকে এক চামচ তুলে নিয়ে কড়াইয়ে তেলের ভেতরে ছেড়ে দিলাম। খুব তাড়াতাড়ি বাদামী রং ধারণ করার আগেই উলটে দিয়েই মিনিটের মধ্যেই ওটাকে তেল ছেঁকে কড়াই থেকে তুলেই আবার ডিমের মিশ্রণে চুবালাম। ঘুরিয়ে উলটে পালটে ভাজা পিঠাটিকে ডিমের মিশ্রণে লাগিয়ে নিয়ে আবার কড়াইতে ভাজতে ছাড়লাম। উলটে সামান্য ভাজা হতেই আবার ওটাকে উঠিয়ে নিয়ে ডিমের মিশ্রণে ছাড়লাম। আগের মতো আবার একই কাজ করলাম। বার বার ডিমের মিশ্রণে ভেজে তোলা তেলের পিঠাটিকে ডুবালাম এবং বার বার ভাজলাম। এভাবে সাত আট বার করার পরে ডিমের মিশ্রণ যখন শেষ, আমার পিঠা বানানোও তখন খতম। এখন কেটে দেখার পালা। আসলেই কিছু হইলো কিনা।  
গরম পিঠাটি শেষ অবস্থায় দেখতে হয়েছে একটা বড় সাইজের ভাপা পিঠার সমান। ওটাকে গরম অবস্থায়ই তেল থেকে তুলে নিয়ে বড় চ্যাপটা একটা প্লেটের উপরে টিস্যু বসিয়ে তার উপরে নিলাম যাতে টিস্যু পিঠার গায়ের বাড়তি তেল শুষে নেয়।
এইবার, ফল বা কেক কাটার ছুড়ি দিয়ে পিঠাটি গরম থাকতে থাকতে তেরছা করে টুকরো টুকরো করে কাটলাম। তেরছা করে কাটার কারণে ভেতরের ডিজাইনটা সুন্দর দেখাবে।
হয়ে গেলো আমার ‘সাত পাকে বাঁধা পিঠা’! বারে বারে ডিমের মিশ্রণের মধ্যে চুবিয়ে বানানো হয় বলেই  এরকম নাম। এই পিঠাটিকে ডিমের বাহারী কেকও বলা হয়ে থাকে।
খেতে সুস্বাদুই হয়েছিলো। কিন্তু, প্রথমবারের চেষ্টা বলে আমি দুটো ডিম নিয়ে করেছি। প্রথমে একবার এক ডিম দিয়ে বানিয়ে খেয়ে স্বাদ দেখে নিয়ে পুনরায় আরেকটা ডিম নিয়ে বানিয়েছি। মাত্র দুটো ডিম দিয়ে বানানো পিঠা ঘর ভর্তি সবাইকে নিয়ে খাওয়া সম্ভব হবেনা। তাই প্রয়োজনে পরিমাণ বাড়িয়ে নিতে হবে। বাবা এজতেমাতে থাকার কারণে ছোট খালার তিন ছেলের জন্য দিয়ে আসলাম। ওরা খেয়ে বললো মজাই হয়েছে।
কাজের ফাঁকে ফাঁকে কিছু ছবি তুলেছি। সেগুলো শেয়ার দিলাম-
 



[নক্ষত্র ব্লগে প্রকাশিত]

ছোট্ গল্পঃ “এইই ...চোর আসছেএএএএ... চোর!!!!!!”



-     যূথীইইই, চোর আসছিলো আজকে?!
আচমকা ডাকে ঘুম ভেঙ্গে চোখ খুলে দেখি- আম্মা! খাটের সামনে ভয়ার্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছেন!
-     রান্নাঘরে?
-     না! আমার ঘরে!
বেশ রাত করে শুইছিলাম সেদিন! মুভি দেখতে দেখতে রাত তিনটা পার করে শুইতে যাবো এই সময় দেখি পানি তৃষ্ণা পায়া গ্যাছে। ঠান্ডা পানি খাইলে গলায় ব্যথা কোরবে! তাই গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে সামান্য পানি গরম দিবো, দেখি- রান্নাঘরের জানালা বন্ধ। জানালার থাই গ্লাস খানিকটা ফাঁক করে পানি গরম করে খেয়ে জানালা আটকাতে গিয়ে দেখি ঠেসে লাগানো যাচ্ছে না! এক আঙ্গুল চিকন ফাঁক রেখেই শুয়ে পরলাম। এমনিতেই বেশ রাত হয়ে গেছে! এখন শব্দে যদি আম্মু উঠে আসে তাইলে খবর আছে! খানিক পরেই ভোর হয়ে যাবে! এমনিতেই কয়েক দিন ধরে শীতের আলসেমীতে ফজরের নামাজ আদায় করার বিরতি পরছে! আম্মুর ধারণা আমি প্রতি রাতেই গভীর রাত পর্যন্ত জাগা থাকি বলেই এমনটা হচ্ছে!
আমি রাতের সেই কথা মনে করে হরবর করে বলতে লাগলাম-রান্নাঘরের জানালা আমিই একটু ফাঁক করে রাখছিলাম।
আম্মা বললো- আরে না! আমার ঘরে আসো!
এইবার উঠতেই হলো। লেপের ভেতর থিকা ঠেলায় না পরলে উঠতে ইচ্ছে করে না!
বড়ই অনাগ্রহ কিন্তু চোর আসার উৎকণ্ঠা নিয়ে আম্মার সাথে সাথে চললাম।
আম্মার ঘরে বিছানার সাথে লাগোয়া বড় থাই এর জানালার গ্লাসটা হাট করে খোলা, ভাঁজ ভাঁজ ডিজাইনের চার পিস পর্দার দুইটা এক পাশে গুছিয়ে গ্রিলের সাথে গুটানো আর জানালার কাছ ঘেঁষে বিছানার উপরে দুই ইঞ্চি চওড়া সোয়া হাত লম্বা একটা কাঠের ভারী টুকরা রাখা।
আমিতো ঐ ঘরে ঢুকেই এই দৃশ্য দেখে এক্কেরে থ!
আম্মা বললো- আমার নতুন নোকিয়া ফোনটা নাই!
-     ক্কি বলো?
-     হ্যাঁ! দ্যাখো না, চোরে কত চালাক, পাশেই স্যামসাং সেটটা ছিলো, এইটা ন্যায় নাই। চোরেও বুঝছে যে এইটা পুরান সেট!
-     অন্ধকারে বুঝছে কেমনে? ঐটা যে টেপ দিয়ে তালি মারা, লাইট ছাড়া বুঝলো কেম্নে?
-     কি জানি!
-     যাহ, নিলো তো নিলো এই নতুন সেটটাই!
বুকের মধ্যে হাহাকার উঠলো আমার! মাত্র কালকে রাতেই মনে হচ্ছিলো ভাইয়া দেশে থাকতে থাকতে আরেকটু বেশি দামেই সেটটা কেনা যেতো! অযথা কম দামে কেনা হইছে! আর মাত্র ভাবতে না ভাবতেই সেটটা হারায় গেলো?
আম্মাকে রাতের ভাবনার কথাও বললাম। আম্মা এই নতুন নাম্বারটা খুব কাছের কয়েকজন ছাড়া বেশি মানুষকে জানায় নাই। আম্মার দুইটা নাম্বার। আগে ছিলো একটা দুই হাজার টাকা দামের স্যামসাং সেট। সিটিসেল নাম্বার ব্যবহার করতেছে ওইটায় দুই হাজার ছয় সাল থেকে। অনেক বার হাত থেকে পরে ও’র সি বাটন আর ফাংশন বাটন খুলে পরে যায় বলে ট্রান্সপারেন্ট সাদা টেপ দিয়ে পেচিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু কথা শুনা যায় স্পষ্ট। তাছাড়া ওটা পুরানা অনেকের সাথেই যোগাযোগ করার জন্য লাগে। কিন্তু অনেক আজেবাজে ফোনও আসে। তাই আম্মা মাস চারেক হলো বাংলালিঙ্ক নাম্বারটা নিয়েছে।
রান্নাঘরে চা বানাতে বসে মা আমাকে বলতে থাকলো- আমারেও আজকে এত্ত ঘুমে পাইছিলো! ফজরের আজানের সময় এলার্ম বাজছে তাও উঠি নাই। এলার্ম বন্ধ করে ফোনটা জানালার কাছাকাছি বালিশের উপরে রাখছিলাম। আর চোরেও সুযোগটা নিয়া নিলো। আমিতো খালি কই, সব দরজা জানালা বন্ধ বাতাস আসে কোইত্থিকা? মাথায় খালি ঠান্ডা লাগতেছে আর আমি অবাক হইতেছি! পরে উইঠা দেখি জানালা এইরকম করে খোলা! কি আশ্চর্য! ছয় বছর ধইরা এই বাসায় আছি কোনদিন তো কিচ্ছু হইলো না! চোরে কেম্নে জানলো যে আজকে তোমার আব্বা বাসায় নাই? কাঠের টুকরাটা দিয়া যে মাথায় বাড়ি দিয়া দেয় নাই তাই ভাগ্য! আল্লাগোওও এখনো গা কাপতেছে আমার!- বলে মা শিউরে ওঠেন।  
সকাল সাড়ে আটটা নয়টা আমার কাছে মোটামুটি এখন ভোর বেলা! আমি এত সকালে ঘুম থেকে উঠি না। আম্মা চা বানাচ্ছে, বানাক। আমি আবার লেপের ভেতরে গিয়ে ঢুকলাম। খানিক পরে আম্মা এসে আবার জিজ্ঞেস করলো-সিমটা তোলা যাবে না? নাকি আবার আরেকটা কিনতে হবে?
খুচরা পান সিগারেটের দোকান থেকে বাংলালিংকের এই সিমটা কিনেছিলাম। হঠাত মনে হলো- আচ্ছা কল দিয়ে দেখি তো? ভোর বেলায় যদি নিয়ে থাকে, সিমটা কি এখনি ফেলে দিয়েছে? ফোন করে কি একটু ঝাড়ি দেব?
আমি গ্রামীণ আর এয়ারটেল নাম্বার ব্যবহার করলেও গ্রামীণ নাম্বারটা সবসময় চালু রাখতে হয়। বন্ধ রাখা যায় না। দুনিয়ার এই মাথা থেকে ওই মাথা পর্যন্ত অনেক লোকজনের সাথে কনট্যাক্ট আছি গ্রামীণে। এয়ারটেল’টা বছর খানেক হলো নিয়েছি সবাই জানেও না তাই ওটা থেকেই আম্মার হারানো ফোনে কল দিলাম। দেখি- রিং বাজছে! আরেহ, সিম বন্ধ করে নাই?!!! সেকেন্ডের মধ্যেই শুনি রিং তো ঘরের মধ্যেই বাজছে! কি ব্যাপার? দৌঁড়ে গেলাম আম্মার ঘরে। শব্দের উৎস খুঁজতে খুঁজতে খাটের তলায় উঁকি দিলাম! জানালার ধার ঘেঁষে খাটের তলায় উঁকি দিয়েও ঠিকমত দেখি না। হাত ঢুকিয়ে দিলাম আরো নিচে। কোণা দিয়ে দেখি, এইবার মোবাইলের লাইট জ্বলতেছে! হাতড়ে তুলে নিয়ে এলাম ফোনটা।
চেনা রিংটোন শুনে আম্মাও রান্না ঘর থেকে নিজের ঘরে ছুটে এসেছেন। আম্মাকে দেখালাম-এই দ্যাখো তোমার ফোন। চোরে নিতে পারে নাই। কাঠ দিয়া টান দিয়া নিতে চাইছিলো! মোবাইল খাটের তলায় পইরা গ্যাছে!
আম্মা কয়-দেখছোওও তোমারে ডাইক্কা তুইলা তো ভালোই হইছে! আবিরও আরেকদিন ফোনে বলতেছিলো- সাবধানে থাইকো। দেশে যেই হারে হরতাল অবরোধে মানুষের আয়ের ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তাতে চোরের উপদ্রব বেড়ে যাবে। তাইই হইলো। চোরেরাই কি কর্বো?   
চোরে তো জিনিস নিতে পারেই নাই। উলটা আমাদেরকে সতর্ক করে থুয়ে গেছে। ঐ জানালার পশ্চিম দিকের লকটা লাগতো না! লক তো লাগানো হবেই। পাশের বিল্ডিঙটা একেবারে গায়ে গা ঘেঁষে বানিয়েছে! মাঝখানে খুবই চিপা জায়গা! চিপা দিয়া বিল্ডিং এর বাইরে নেট লাগানো হবে যাতে ভবিষ্যতে আর কোন অঘটন না ঘটে!
এর পরে আমার ঘুমের পুরাই ফালুদা। ভাবলাম, ফোন তো উদ্ধার হইছে! এখন বাজে মাত্র সাড়ে নয়টা বাজে! এগারোটা পর্যন্ত খানিকটা গড়াবো তা আর হলো নাহ! আম্মা আমার মামা-মামি, খালা-খালু, নানী-নানূ সবাইকে ফোন করে খবর দিচ্ছেন আর সবাই একটু পর পর আসতেছে আর দরজা খুলা লাগতেছে আর ঘটনার বর্ণনা দ্যাওয়া লাগতেছে!
ছোট মামা তো এসে বললো- আপনে যে মাঝেমাঝে একা থাকেন এই খবর চোরে ক্যাম্নে পাইছে? আপ্নের ঘরে যে বুয়া আছে অয় বস্তিত যাইয়া কয়! নাইলে এই চিপার জানালার লক লাগেনা এই খবর চোরে পাইছে ক্যাম্নে?
আম্মাও মামার সাথে গলা মিলায়া হ হ করে সায় দিলো। আবার মামা চলে যেতেই আমার দিকে তাকিয়ে বলে- না জাইনা কাউরে সন্দেহ করা গুনা!
শেষ খবর হলো এই—বিকেলে ছোট মামা অফিস থেকে ফিরে জোরে টান মেরে জানালার লকটা ঠিকই লাগিয়ে দিয়েছে। অথচ, এই লক গত ছয় বছর ধরে এমনেই ছিলো। লাগে না! তাই জানালা ভিড়ানো থাকলেও লক লাগানো হতো না কোন সময়েই। অথচ, বিছানার উপরে মাথার কাছে কত সময় দামী হাত ঘড়ি আরোও এটা সেটা রেখে দেই আমরাই। ভাগ্যিস সেসবের কোনটা খোয়া যায় নাই। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে! এই বেলা আমাদের শুধু বুদ্ধিই বাড়লো তা নয়, শিক্ষাও হলো।

[এক্কেরে টাটকা ঘটনা শেয়ার করলাম। বাসায় আঞ্চলিক ও শুদ্ধ মিলিয়ে যে সুরে কথাবার্তা বলি, কাহিনীতে ডায়ালগগুলো সেভাবেই উঠে এসেছে!]

[নক্ষত্রব্লগে ১ বছর আগে দিনপঞ্জি বিভাগে প্রকাশিত]

রম্য গল্পঃ ডিমের শ্রাদ্ধ


জুন মাসের চরম গরম!
এই বাসাটা খুব ছোট। বাইরের দরজা থেকে ভেতরে ঢুকেই বামে চলে গেছে ছোট্ট একটা বসার ঘর। আর সামনে ডায়নিং রুম। তার সাথে লাগোয়া রান্না ঘর।
বিকেল বেলা বাসায় ডাইনিং টেবিলে বসে পাঁচটা বাচ্চাকে ছবি আঁকা শিখাচ্ছি। এর মধ্যে আবার কারেন্ট চলে গেছে। আইপিএসের ব্যাটারীটা কিছুদিন ধরে নষ্ট। ক্রমাগত লোডশেডিঙের কারণে চার্জ লাইটেও যথেষ্ট চার্জ হয়ে ওঠে না সারাদিনে। মোমবাতির আলোয় ছবি আঁকা শেখানো খুব কষ্ট তবু বাধ্য হয়েই পড়াতে হচ্ছে!
বাইরের দরজায় শব্দ হলো। লকটা খোলাই ছিলো। বাবা ঢুকলেন। এক হাতে বড় সাদা কাগজের প্যাকেটে ডিম মনে হয়। আরেক হাতে এক লিটার আড়ং দুধ। হুড়মুড়িয়ে আমার পাশ কাটিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলেন। আমি তো অবাক! রান্না ঘরে কি করবেন? আম্মা বাসায় নাই। বাবা কি চা খেতে চাইছেন? আমি চেয়ার ছেড়ে বাবার জন্য চা করতে উঠলাম। রান্নাঘরের দরজায় পৌঁছে দেখি একটা ইঞ্চি ছয়েক চওড়া স্টিলের বাটিতে প্যাকেটের মুখ কেটে দুধ সব ঢেলে দিয়েছেন। তার মধ্যে ডিম ফেটে দিয়েছেন। এখনো দিচ্ছেন।
সাদা প্যাকেটে তাহলে ডিমই ছিলো! একটা একটা করে ডিম বের করে ফাঁটিয়ে দুধের বাটির মধ্যে ছাড়ছেন আর চামচ দিয়ে দ্রুত নাড়ছেন। যেন মিনিটে কয়টা ডিম ছেড়ে দ্রুত নাড়া যায় সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছেন! এর মধ্যেই বোধহয় আট দশটা ডিম ভেঙেছেন। দুধের ভেতরে ডিমে ডিমারন্ন একেবারে! এর পর চিনির বয়াম থেকে প্রায় এক কাপ চিনিও ঢেলে মেশালেন ডিম-দুধের মিশ্রণে। বাবা কি পুডিং বানাতে চাইছেন?
জিজ্ঞেস করলাম সে কথা!
চুপ করে আছে! কিছু বলেনা! রান্নাঘরের পাতিল যেদিকে থাকে সেদিকে গিয়ে ডাল রান্না করার পাতিলে হাত দিলেন।
আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে হাত থেকে নিয়ে বললাম, “আরে, এটায় তো ডাল রাঁধে! মিষ্টি জিনিস বানানোর পাতিল আলাদা!”
এবার বাবা বললেন, “কোন পাতিলে মিষ্টি জিনিস বানায় দেও তো!”
মিষ্টি খাবার বানানোর সিলভারের বড় কড়াইটা নামিয়ে আবারো জিজ্ঞেস করলাম, “কি বানাতে চান?”
জবাব এলো, “হালুয়া”।
এতক্ষণে আমার খুব রাগ হলো! “ডিমের হালুয়া! আগে বলবেন না আমাকে? দুইটা ডিম দিয়া এত্তগুলা হালুয়া হয়! ধ্যেত! কিচ্ছু বুঝেন না! এত্তগুলা ডিম শুধু শুধু নষ্ট করলেন!”
পুরুষ মানুষকে নিয়ে হয়েছে এই এক জ্বালা! কোন কিছু কিনে আনতে বললে তখন খুব হিসেব করে। আর নিজে যখন জিনিস নষ্ট করে তখন কিচ্ছু মনে হয় না!
কণ্ঠের ঝাঁঝ আমার চোখেমুখেও ছড়িয়ে পরে। নিজের হাতে হালুয়া বানানোর এতক্ষণের উদ্যমে যেন ভাটা পরলো বাবার। তবু সরে গেলেন না। চুলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। গ্যাসের চুলার উপরে কড়াইটা নিয়ে ওর মধ্যে ডিম দুধের মিশ্রণটা ঢেলে জ্বাল বাড়িয়ে দিলেন। মুহুর্তেই ডিম দলা দলা পাকিয়ে যেতে ধরেছে। খুন্তি দিয়ে ধীরে নেড়েচেড়েও দলা আলাদা করতে পারছেন না। যতই বলি আমারে দেন, ঠিক মত নেড়ে দেই! দ্যায় না আমার হাতে! নিজেই করবে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ডিম পোড়া লেগে যেতে ধরেছে। এবার জোর করে বাবার হাত থেকে খুন্তি নিয়ে এক পাশে সরিয়ে দিয়ে মৃদু বকা লাগালাম, “এখন আমার স্টুডেন্টরা আছে! আমাকে বললেই তো হতো! আমি ওদেরকে ছুটি দেয়ার পরে ভালোভাবে করে দিতে পারতাম! তার উপরে কারেন্ট নাই! এত্ত গরম! এই অন্ধকারেই এইসব নিয়ে ব্যস্ত হওয়ার কি দরকার ছিলো?” আমার কন্ঠের ঝাঁজ আরো বেড়ে যায়। ছবি আঁকার স্কুল এক ঘন্টার। সপ্তাহে মাত্র একদিন। এর মধ্যেই মিনিট বিশেক সময় পেরিয়ে গেছে। আরেকটু পরেই ছুটি দিয়ে দিতে হবে। সময় বাড়িয়ে দিলেও এরা থাকতে পারবে না। অন্য কোচিঙে ছুটবে। আজকাল পড়াশুনার যা অবস্থা! ঘড়ির কাঁটায় জীবনের রুটিন বাঁধা।
রান্নাঘরের গরমে বাবা নিজেও এখন ঘামছেন! সেই সাথে দেখলেন কাজটা নিজে ভালোভাবে করতেও পারছেন না! আবার মেয়েও রেগে গেছে! খুন্তি আমার হাতে চলে আসতেই তিনি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন! চলে গেলেন নিজের ঘরে। আর এদিকে আমি না পারছি হালুয়া বানানো বাদ দিতে! না পারছি ছাত্রদের দিকে নজর দিতে! আমি রান্নাঘর থেকে সরে গেলেই বাবা হয়তো আবার ছুটে আসবেন গিন্নিপনা করতে।
আজ আমার ছাত্রগুলোও বেশ মজা পেয়েছে। মিস-এর বাবা রান্নাও করে? ওয়াও!
গরমে সেদ্ধ হয়ে ডিমের স্রাদ্ধ শেষ করে তবেই আমার ছুটি মিললো। ততক্ষণে ছাত্ররাও বাড়ি চলে যাচ্ছে। বাড়ি গিয়ে হয়তো ওরা বলবে আজ তাদের যূথী মিস ছবি আঁকার বদলে রান্না শিখিয়েছে!!

...আমার গল্পটি ফুরলো, নটে গাছটি মুরলো...

গল্পঃ সারপ্রাইজ


আজ আটাশ ডিসেম্বর ২০১৩ সাল। আর মাত্র দু’দিন পেরুলেই এই বছরের শেষ দিন। থার্টি ফাস্ট নাইট।
তনয় আর সনিয়া ভালোবাসার জুটি। দু’জন দু’জনকে খুব ভালোবাসে। দুই পরিবারেও বিষয়টা প্রায় সবাইই জানে। তারপরেও বিয়েটা হবো হবো করেও হয়ে উঠছে না। অবশেষে সনিয়ার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। ও ওর আইডিয়াটা তনয়ের সাথে ফোনে শেয়ার করলো-
-     এই শোন, আমরা থার্টি ফার্স্ট নাইটেই বিয়েটা করে ফেলি!
-     ঠিক আছে। কিন্তু, মাঝখানে তো মাত্র দুইটা দিন। আয়োজন করতে হবে না? আবার মাসের শেষ!
-     আরে ধুর, দুজনে মিলে করলে সমস্যা হবে না।
-     আচ্ছা ঠিক আছে।
কথা পাকাপাকি করার পরেই ওরা সিদ্ধান্ত নিলো একত্রিশে ডিসেম্বর সকালেই বাসা থেকে বেরুবে। বাসার মানুষের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না ঢুকিয়ে কাজটা করতে হবে। আর বাসা থেকে মনে হয় না সন্দেহ করবে। কেননা এই দিনটিতে অনেকেই উৎসবের আমেজে কাটাতে চায়। এমনিতে ওদের প্রেমের খবর তো সবাই জানেই। 
একত্রিশ তারিখ সকালে বাড়ি থেকে বেরুতে তাই কাউকেই কোন সমস্যায় পরতে হলো না। মিরপুর দশ নাম্বার থেকে বাসে তনয় চলে এলো টিএসসি চত্বরে। আর গুলশান থেকে এলো সনিয়া। চারুকলা আর টিএসসিতে বর্ষবরণের অনেক অনুষ্ঠান আর কনসার্ট হবে। দুজনে একসাথে সময়টা এনজয় করবে। তারপরে লাঞ্চের পরে কাজী অফিসে বিয়ে।
দুজনের দেখা হওয়ার পরে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ালো কিছুটা সময়। বিয়ের উত্তেজনায় দুজনেই অস্থির। দুপুরে এক সাথে লাঞ্চ করে দুজনে কাজি অফিসে গেলো। সাক্ষী লাগবে। ওহ! এখন সাক্ষী কই পাবে? দু’জনেই চিন্তায় পরে গেলো। ওরা তো সবাইকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলো। এখন বন্ধুদের যদি সাক্ষীর জন্যে ডাকতে হয় তাহলে কেমনে কি!
সনিয়াকে কাজী অফিসে বসিয়ে রেখে তনয় গেলো বাইরে যদি কাউকে রাজী করানো যায় বিয়ের সাক্ষীর জন্য। একটু পরেই ফিরে এলো। রাস্তা থেকে কয়েক জন লোক ডেকে নিয়ে এসেছে। আবার দুই জন তরূণিও এসেছে।
যা হোক, ওদের বিয়ে করা দরকার। বিয়ে পড়ানো হয়ে গেলো। দুইজনে হাসি হাসি মুখে বের হলো কাজী অফিস থেকে। তিন তলা বিল্ডিঙ থেকে নামতে নামতে নতুন এই দম্পতি তর্কাতর্কি লেগে গেলো-
-     “এই শোন, সামনের মাসের বেতন থেকে কিন্তু তুমি আমার টাকাটা দিয়ে দিবা” সনিয়া বলে উঠলো।
-     “আরে তুমি তো আমার মিষ্টি বউ। এমন করো কেন? দিবো নে এক সময়।”
-     “আরে বাহ! এর মধ্যেই স্বামীগিরি ফলাতে শুরু করলা?”
-     “আহা! রাগ করো কেন?”
-     “রাগ করবো না? যাও আমি তোমার সাথে কোত্থাও যাবো না!” বলে সিড়িতেই দাঁড়িয়ে গেলো সনিয়া।
-     “আরে পাগলী, এসো তো!”
-     “নাহ! যাবো না! আমাকে আদর দাও। মিষ্টি করে সরি বলো। তারপর...”
-     “আরে আমার পাগলী বউরে!” বলে কোলে তুলে নিয়ে বাইরে বেরুতে গেলো। আর ওমনি সনিয়া লজ্জায় দিলো এক চিৎকার- “আআহহ!! কি করো ছাড়ো না!” বলতে বলতেই দেখে, সামনে দুই বন্দুক ধারী। দেখে আর্মি বলেই মনে হচ্ছে।

সামনে নির্বাচন। ক্রমাগত হরতাল অবরোধ, ভাংচুর, জ্বালাও পোড়াও এর কারণে দেশের শান্তি শৃংখলার জন্য দেশে আর্মি নামানো হয়েছে। চোখের সামনে আর্মি দেখে সনিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো দুজনে।
বন্দুকধারী দুজনের মধ্যে বয়স্ক লোকটি বলে উঠলো-
-     কি হচ্ছে এখানে?”
তনয় উত্তর দিলো- জ্বী স্যার। কিছু না!
লোকটা এবার বলে উঠলো রাগী কন্ঠে- “কিছু না হলে এমনিতেই উনি চিৎকার দিলো?”
সনিয়া কি জবাব দেবে? ও লজ্জায় আরো জড়সড় হয়ে গেলো। গিয়ে তনয়ের পেছনে গিয়ে লুকালো।
এর মধ্যে আরেক মহিলা সৈন্যের আবির্ভাব- “কি হয়েছে এখানে, স্যার?”
আগের লোকটাই বলে উঠলো, “এই দুজনকে সন্দেহ হচ্ছে! লকাপে পুরে দেন তো!”
এইবার সনিয়া বলে উঠলো, “আরে কি মুশকিল! আমরা এইমাত্র বিয়ে করলাম। এখন বাসায় যাবো। অযথা আমাদেরকে লকাপে নিচ্ছেন কেন?”
“বিয়ে করেছেন, তো একা একা কেনো?” মহিলা আর্মি বলে উঠলো।
এবার সনিয়া ও তনয় একসাথে জবাব দিলো-“ইয়ে মানে আমাদের অভিভাবকরা আমাদের বিয়েটা দেই দেই করেও দিচ্ছে না! বছর চলে যাচ্ছে!”
এ কথায় তিন আর্মি অফিসারই ভীষণ মজা পেলো। সবাই এক সাথে হেসে উঠলো। তারপরে ওদের ছেড়ে দিলো- “আচ্ছা যান! রাস্তাঘাটে এরকম চিৎকার চেঁচামেচি না করে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যান!”
অফিসারদের লম্বা উপদেশ বাণী শুনে ওরা কাজী অফিস ছাড়িয়ে দ্রুত পা বাড়ালো। তারপরে কিছুদূর গিয়েই দুজনে ফোঁস করে উঠলো, “থার্টিন যে শালা আসলেই আনলাকি! রোমান্টিকতার মধ্যে কোত্থেকে পুলিশ এসে হাজির!”

চারুকলা ইনস্টিটিউটে নববর্ষকে উদযাপনের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। টিএসসি’তেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচে কানাচেও নানা রকম গানের কনসার্ট শুরু হয়েছে।
ওরা দু’জনে হেঁটে হেঁটে হাত ধরাধরি করে শাহবাগ পাবলিক লাইব্রেরীর  কাছে অনেকটা এগিয়ে এসে একটা ফুচকার দোকানে বসলো। অর্ডার দেয়া হয়ে গেছে। এখন অপেক্ষা!

সেই সকালে বাসা থেকে বেরিয়েছে। মাগরিবের আজানও হয়ে গেলো। কারো বাসায় ফেরার নাম নেই। এমন সময় ফোন এলো সনিয়ার বাসা থেকে- “কিরে! আজ কি সারা রাত বাইরেই থাকবি?”
ভাবছে মা’কে বলবে কিনা! তনয় নিতে চাইলো ফোনটা। সনিয়া শুধু মা’কে বললো-“তনয়ের সাথে কথা বলো!”

শাশুড়ি মায়ের সাথে ফোনে কথা বলবে। তনয়ের কন্ঠটা একটু কেঁপে উঠলো-“আসসালামু আলাইকুম, আন্টি। আজকে সনিয়াকে আমার বাসায় নিয়ে যাওয়ার অনুমতি চাইছি।”
সনিয়ার মা হতভম্ব হয়ে বলে উঠলেন, “সে কি!”
“জ্বী মা! আজ দুপুরে আমরা দু’জন বিয়ে করেছি। আমাদেরকে দোয়া করবেন।” বলে তনয় চুপ করে রইলো। মেয়ের মা টাশকি খেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে উঠলেন, “ওহ! সনিয়াকে দাও!”
সনিয়া ফোন নিতেই মা বলতে থাকলেন, “সকালেই সন্দেহ হচ্ছিলো! তোর শাশুড়ি কি জেনেছে? নাকি আগে থেকেই জানে?”
স্পিকারে দেয়া ছিলো ফোনটা। তনয় জবাব দিলো, “আপনি টেনশন করবেন না। সব ঠিক আছে। ভালো থাকবেন।”

এরপরে চটপটি খেয়ে নিয়ে আরো কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে দু’জনে মিলে বাসে উঠে পরলো। মিরপুর দশ।
রাস্তায় অনেক জ্যাম। বাড়ি পৌঁছুতে রাত দশটা বেজে গেলো। তনয়দের ফ্লাটবাড়িতে ইন্টারকমে শাশুড়ি মা’কে চাইলো সনিয়া-“আমি কি একটু আপনার বাসায় আসতে পারি?”
সম্মতি পেতেই দু’জনে দোতলায় উঠে গেলো। দরজা খুলে শাশুড়ি মা দাঁড়াতেই সদ্য বিবাহিতা দম্পতি সামনে দাঁড়ানো মুরুব্বীকে পায়ে ঠুকে সালাম করে নিলো।

ঘোমটা জড়ানো লাল রঙের শাড়িতে সনিয়াকে দেখে আর দুইজনে মিলে সালাম করাতে যা বুঝার বুঝে নিলেন ছেলের মা। নিজের ছেলের দিকে চেয়ে বলে উঠলেন, “ওরে বদমাশ! বিয়ে করে ফেলেছিস আমাকে একটু আগে থেকে জানাবি না?” তারপরে ভেতর বাড়ির দিকে হাঁক ছাড়লেন, “এই তোমরা সব এদিকে আসো!”
সনিয়া যেখানে ভেবেছিলো এত রাতে রাগের চোটে না বাড়ি থেকেই বের করে দেন। সেখানে এরকম কথা শুনে ও আবেগে ভেসে গিয়ে শাশুড়িকে জড়িয়ে বুকে মাথা পাতলো।
শাশুড়ি তারপরে বউকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। বর্ষবরণ উৎসবের সাথে সবাই এখন বাড়িতে নতুন বউ আসার উৎসবে মেতে উঠলো।
শাশুড়ি মা ছেলেকে বললেন, “তনয়, নিজের রুমটা লক করে রেখেছিস কেন? আজকে তো রুমটা সারাদিনে ঝাড়ুও দেয়া হয়নি। কি যে করিস না!”
কিন্তু, দরজাটা খুলে এক পাশে মেলে ধরতেই মা বউকে সাথে নিয়ে ভেতরে তাকিয়ে চমকে উঠলেন, একেবারে বাসর ঘরের মতো করে পুরোটা সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা! পুরো থ হয়ে গেলেন তিনি- “এসব কখন হলো?”
তনয় শুধু হাসে। কিচ্ছু বলে না!
কিছুক্ষণ পরেই ঘড়িতে ঢং করে বারোটা এক বেজে উঠলো। ডিসেম্বরের একত্রিশ তারিখ এবং দুই হাজার তেরো সালটা পেরিয়ে নতুন বছর চলে এলো।
আর তখনই নতুন দম্পতির দরজা জুড়ে এসে দাঁড়িয়ে বড় ভাই-ভাবী-ননদ-দেবর সবাই মিলে ‘হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ। হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ। হ্যাপি বার্থ ডে ডিয়ার সনিয়া ভাবী’ বলে গান গেয়ে উঠলো। আর তখনি মনে পরলো সনিয়ার। বিয়ের উত্তেজনায় নিজের জন্মদিনের তারিখটাই ভুলে বসে আছে। আর তার চেয়েও অবাক হয়ে গেলো যখন দেখলো আজকে কাজী অফিসে সাক্ষী হিসেবে যারা ছিলো তারাও বার্থডে পার্টির সাথে দাঁড়িয়ে আছে। সনিয়া অবাক হয়ে গেলো- “একী? এরা এখানে?”
তনয় এতক্ষণে মুখ খুললো- “আরে, এরা আমাদের এই বাসাতেই ভাড়া থাকে।” আর মা, তুমি তো জানতেই যে তোমার ছেলের বউ কে হবে। শুধু আজকেই করবো তা জানতে না! তোমাকে একটু চমকে দিলাম। হাহা হা!”

সনিয়া ভেবেছিলো বিয়ের আইডিয়াটা বুঝি শুধু ওরা দুজনই জানতো। কিন্তু, তনয় বড় ভাই, ভাবী আর ছোট বোন সবাইকে সাথে নিয়েই প্ল্যান করেছিলো। সনিয়ার জন্য কেকের ব্যবস্থা করে রেখেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলো।
তনয় ভাব দেখিয়েছিলো দুই পরিবারের কেউই জানবে না। এরকম একটা সারপ্রাইজের জন্য সনিয়াও মোটেই প্রস্তুত ছিলো না। এই অনবদ্য প্রাপ্তির আনন্দে ওর দু’চোখ ভরে জল এলো। মাকে যে জানাতে হবে এই বাড়ির বউ হয়ে আসার এত আনন্দময় কাহিনীটা। পুরোটা। রাত পেরুনোর আগেই। নইলে বাসায় মা-বাবা কি শান্তিতে আজ একটু দু’চোখের পাতা এক করতে পারবে!

এইসময় শাশুড়ি-মা সনিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “নিজের মাকে জানিয়েছো? এখনই জানিয়ে দাও। দেরী কোরো না!”
সনিয়া আনন্দের আবেগে কান্না ভেজা কন্ঠে মোবাইল ফোনটা হাতে তুলে নিলো। ডায়াল করলো মায়ের নাম্বারে। মায়ের ফোনে ওয়েলকাম টিউনে গান বাজতে থাকে, ‘আরে মনটা কানে কানে কয়, ভালোবাসা কেমন দেখতে চাই...’

(সমাপ্ত)
[জাকিয়া জেসমিন যূথী ১ বছর আগে নক্ষত্র ব্লগে সাহিত্যগল্প বিভাগে প্রকাশিত]

অণুগল্পঃ “এক পলকের সেই দেখা...”


জ্ঞান হবার পরে অনেকবার ট্রেন ভ্রমণ করেছি। কিন্তু সেই স্কুলের প্রাইমারী স্তরে থাকবার সময়। কলেজে উঠার পরে এই প্রথম।
বাবার সাথে সন্ধ্যা ছয়টায় ট্রেন ছাড়বে বলে তড়িঘড়ি ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে ছুটলাম রেল স্টেশনে। যথাসময়ে ট্রেনের কামরায় উঠে সিট খুঁজতে লাগলাম আমাদের। অবশেষে পেয়েও গেলাম। কিন্তু গোলযোগ বাঁধালো অপর দু’জন যাত্রী। তারা টিকিট কেটেছেন ঠিকই কিন্তু নাম্বার লিখে নেননি। অবশেষে সিট না পেয়ে যার তার সিটে বসবার যোগাড়। ওনারা আমাদের সিটেই আরামসে বসে আছেন। কোনরকমে তাদেরকে সাইড করে বাবা আর আমি বসলাম। চোখের কোণ দিয়ে দেখলাম অপরপাশের সিটে দু’জন ভদ্রলোকের সাথে আমারই বয়সী এক তরুণ বসেছে। সেও আমাকে তার চোখের কোন দিয়ে আমাকে চোরা চোখে দেখছে।
আমাদের আশেপাশে তিন চারটে সিট। তবলিগ পার্টি বসেছেন। আমার পাশের টিকিট ছাড়া মহিলা যাত্রী কিছুক্ষণ পরে চলে গেলে আমি জানালার ধারে এসে আরাম করে বসলাম। এতক্ষণে বাবাও ঠিকমত বসলেন।
এইবার ভালো করে সেই তরুণকে ভালো করে দেখতে পেলাম। খুব সুন্দর চেহারা। যেন খোদা নিজ হাতে ঐ মুখের গড়ন তৈরী করেছেন। সবচেয়ে ভালো লাগলো তার ফেস কাটিং। চোখ দুটো খুব সুন্দর। অপরূপ মায়াবী। গালে খোচা খোচা দাঁড়ি। নাকটা খাড়া। থুতনি, ঠোঁট, মুখ সব মিলিয়ে একটা অত্যন্ত ইনোসেন্ট চেহারা তার। মনে তো হচ্ছে ট্যারা চোখেও তাকে সুন্দর দেখাতো। নামটা খুবই জানতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু পৃথিবীর বিধি বাম! শুধু নাম জানতে চাইবো দেখা যাবে প্রেম নিবেদন করে বসবে।
কাউনিয়া স্টেশনে ট্রেন থামলো। ছেলেটা বাইরে বেরিয়ে গিয়ে সিগারেট টানছিলো। দেখেই খুব রাগ লাগলো-‘বদ কোথাকার!’ স্মোকিং আমার একেবারেই অসহ্য! ছেলেটার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করতে ভীষণ ইচ্ছে করছে।
ট্রেন চলতে শুরু করলো আবার। সেও উঠে বসলো আগের জায়গায়। আমার গন্তব্য চলে এসেছে। রংপুর স্টেশন। ট্রেন থেকে নামার সময় হারিয়ে ফেললাম তাকে। বাবা রিটার্ন টিকিট কাটবেন তাই ওনার সাথে টিকেট কাউন্টারে গেলাম। হঠাত দেখি সেই ছেলেটি। আমার দিকে ঘুরে তাকিয়ে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলো।
এর পরে আর দেখা হলো না। হারালাম চিরতরে।

 
জাকিয়া জেসমিন যূথী
৪ ডিসেম্বর ১৯৯৭ ইং
[পূর্বে নক্ষত্র ব্লগে প্রকাশিত] 

প্যারোডি কবিতা ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

জব বিষয়ক লেখা... 

বাংলাদেশের চাকরির বাজার ধীরে ধীরে নিম্নমুখী। লাখ লাখ দক্ষ জনতা বেকার হয়ে বসে আছে।  প্রচুর কর্মখালি হলেও কারা যে চাকরি পাচ্ছে আল্লাহই মালুম! জনসংখ্যার একটি বড় অংশ মনে করে, স্বজনপ্রীতিই এর মূল কারণ!” এই কথাটির সত্যতা দেখে এলাম, কয়েকটা ইন্টারভিউ দিয়ে। লিখিত পরীক্ষা যত নাম্বারে নেয়া হয়, সিংহভাগ নাম্বার বাগিয়ে ভাইভাও সেইরকম ভালো দেওয়ার পরেও যখন নিয়োগপত্র আসে না, তখন পরবর্তী কোথাও আবেদন করার আগ্রহই দমে যায়। মনে হয়, আবেদন করার টাকা আর আনুসংগিক খরচ পুরাটাই গচ্চা!!
ইদানিং নিয়োগ কর্তাদের নতুন একটা ব্যবসা দেখছি। হতে পারে সেটা তাদের নিয়ম। প্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই লোক বাছাই করা থাকে। সরকারের কাছে নিয়োগের স্বচ্ছতার জন্য “পেপারে নির্দিষ্ট অংকের ব্যাংক ড্রাফট সহ একটি বিজ্ঞপ্তি”  দেয়। সামান্য কিছু নিয়োগের শর্ত থাকে। অসংখ্য বেকুব বেকার সেই ফাঁদে পা দেয়। আমিও তাদের মধ্যে একজন।
বেশ কিছুদিন আগের কথা। তখন ক্রমাগত ইন্টারভিউ দিতে দিতে আর চাকরী না পেতে পেতে অসহ্য হয়ে উঠেছি। কিন্তু শেষের পরীক্ষাটা খুব ভালো হয়েছিলো।  পরীক্ষাটি দিয়ে মনে গান বেজে উঠেছিলো,
“চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি সবাই শুনছো!”
 ফেসবুক আর ব্লগ আড্ডায় একটা খুশির স্ট্যাটাসও দিয়েছিলাম। তা দেখে এক ব্লগার বন্ধু জানতে চেয়েছিলো, “খবর কি?”  ভেবেছিলাম, নিয়োগপত্র হাতে পেয়েই ওই বন্ধু সহ বাকী সবাইকে জানানো যাবে।
কিন্তু, যেখানে প্রথমে মনে হলো, চাকরীটা আমি পেয়ে গেছি; পরদিনই ভাইভার রেজাল্ট জানিয়ে দেয়া হবে জেনে আসলেও তিন দিন পেরিয়ে গেলেও কিছুই খবর এলো না যখন তখন মনের যে অবস্থা হয় তা কি আর এক কথায় জানানো যায়” আর, তাই এই লেখাটির অবতারণা!!!

       ‘চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছো
       
এখন আর কেউ আটকাতে পারবেনা
       
সম্বন্ধটা এই বার তুমি ভেস্তে দিতে পারো
       
মা-কে বলে দাও বিয়ে তুমি করছো না
       
চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা সত্যি
       
আর মাত্র কয়েকটা মাস ব্যাস
       
স্টার্টিংয়েই ওরা ১১০০ দেবে তিন মাস পরে কনফার্ম
       
চুপ করে কেন বেলা কিছু বলছো না
       
এটা কি ২৪৪১১৩৯
       
বেলা বোস তুমি পারছো কি শুনতে
       
১০-১২ বার রং নাম্বার পেরিয়ে তোমাকে পেয়েছি
       
দেবো না কিছুতেই আর হারাতে
       
হ্যালো ২৪৪১১৩৯
       
দিন না ডেকে বেলাকে একটিবার
       
মিটারে যাচ্ছে বেড়ে পাবলিক টেলিফোনে
       
জরু্রি খুব জরুরি দরকার
       
স্বপ্ন এবার হয়ে যাবে বেলা সত্যি
       
এতোদিন ধরে এতো অপেক্ষা
       
রাস্তার কতো সস্তা হোটেলে
       
ব্যস্ত ক্যাবিনে বন্দী দুজনে
       
রুদ্ধশ্বাস কতো প্রতীক্ষা
       
আর কিছু দিন তারপর বেলা মুক্তি
       
কসবার ঐ নীল দেয়ালের ঘর
       
সাদা-কালো এই জঞ্জালে ভরা মিথ্যে কথার শহরে
       
তোমার আমার নাল-নীল সংসার
       
চুপ করে কেন একি বেলা তুমি কাঁদছো
       
চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি সত্যি
       
কান্নাকাটির হল্লাহাটির সময় গেছে পেরিয়ে
       
হ্যালো তুমি শুনতে পাচ্ছো কি
       
হ্যালো ধুর ছাই হ্যালো
        —————————​
       
অঞ্জন দত্ত

...আমার রচিত প্যারোডি>>

চাকরিটা আমি পেয়ে যেতাম, তুমি শুনছো?
মনে হচ্ছিলো কেউ আটকাতে পারবেনা
জব এপ্লাইয়ের দৌঁড় বুঝি এই বার থামলো,
মাকে বলে দিলাম আর পড়াশুনা লাগবেনা!

চাকরিটা আমি ... ... ... ... পড়াশুনা লাগবেনা!!

চাকরিটা পেয়েই যাচ্ছি...লাম শোন, সত্যি!
মাত্র কয়েকটা দিন ছিলো ব্যস;
স্ট্রার্টিঙ্-এ ওরা ছ’হাজার দিবে, তিন মাস পরে কনফার্ম!
চুপ করে কেন তুমি, কিছু বলছো না?
এটা কি ০১৭৩ এর সেই জিপি নাম্বার?
এই যে তুমি, পারছো কি শুনতে?
১০-১২ টা রঙ নাম্বার পেরিয়ে তোমাকে পেয়েছি,
দেবো না কিছুতেই আর হারাতে!

হ্যালো ০১৭৩*১১৩৯ ?
দিন না ডেকে প্রিয়’কে একটি বার!
চার্জ চলে যাচ্ছে, পুরান মোবাইল ফোনে,
জরুরী খুব জরুরী দরকার!

স্বপ্ন এবার হয়ে যেতো পুরা সত্যি,
এতদিন ধরে কত অপেক্ষা,
কত পেপার্স ফটোকপি, ছবি ওয়াশ
সত্যায়িত, কুরিয়ার ও পোস্ট করে,
রুদ্ধশ্বাস কত প্রতীক্ষা!!

স্বপ্ন এবার হয়ে ... ... ... কত প্রতীক্ষা!!

আর কিছুদিন তারপর হতো মুক্তি,
পরিবর্তন হতো বেকার অবস্থার;
টিউশনী ছেড়ে সুখ পেতাম স্থায়ী চাকরীর সুবিধার!

এটা কি ০১৭*২৪৪১১৩৯?

বলো বলো, তুমি পারছো কি শুনতে?
১০-১২টা রঙ নাম্বার পেরিয়ে তোমাকে পেয়েছি,
দেবোনা কিছুতেই আর হারাতে!

হ্যালো জিরো ওয়ান সেভেন... ... জরুরী দরকার।

চুপ করে কেন একি দেখি, তুমি কাঁদছো?
চাকরিটা আমি পেয়ে যেতাম সত্যি,
কান্নাকাটির হল্লাহাটির সময় যেতো পেরিয়ে,
হ্যালো! তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?

চুপ করে কেনো... ... পাচ্ছ কি?

এটা কি জিরো ওয়ান ... ... ... হারাতে।

হ্যালো ... ... ... খুব দরকার!!

হ্যালো ... ২৪৪১১৩৯?
হ্যালো ... ২৪৪১১৩৯?
হ্যালো ... ২৪৪১১৩৯?
হ্যালো ... ২৪৪১১৩৯?


-----