তিন্তিলীর মেজাজটা খুব খারাপ!
দিনের বেলা সালমা আন্টির ফোন পেয়েই বুঝেছিলো
নিশ্চয়ই বিয়ের কোন খবর। যা ভেবেছে তাই। মা
বললো এসে, “তোমার
একটা প্রস্তাব। সন্ধ্যাবেলা ভাবীর বাসায় যেতে হবে ছেলে দেখতে।“
আঠাশ পেরুনো তিন্তিলীও একটু বোরিং হয়ে যাচ্ছিলো। বিয়ের জন্য! খুশি মনেই বলে উঠলো, “ঠিক আছে যাবো নে ছেলে দেখতে!”
বসে বসে কম্পিউটারে কাজ করছিলো। প্রাইমারীর ভাইভার রেজাল্ট
বলে দিবে এই পঁচিশ বা ছাব্বিশ তারিখে; সমকালে লিখেছে। তাই গত
কয়েকদিন ধরেই নিয়মিত বসা সারাদিন। অনলাইনে।
সালমা আন্টির ফোন পাওয়ার পরে ভাবলো ছেলে দেখতে
যেতে আগে একটু ঘুমানো দরকার। তখন বেলা তিনটা বাজে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যায় ইফতারির
পরপরই ছেলে দেখতে যাওয়ার কথা। ওর আবার রোজা রেখে চেহারার দিকে তাকানোই যায়না!
এরপর ‘যাই একটু ঘুমিয়ে নেই’ বলে গেলো ঘুমোতে। তবে শুধু গড়াগড়িই করা হলো।
অন্যদিন তবু মরার মত ঘুম দেয়। আজ কোন ঘুমই হলোনা। মনে হয় টেনশনেই! বায়োডাটা পায়নি। ছেলে কেমন, কি করে কিছুই জানেনা। আর মায়ের
কথার তো কোনও বিশ্বাস নাই। যেটা দ্যাখে সেটাই খুব ভালো। পরে দেখা যায় সাড়ে বাইশ
অবস্থা!!
যা হোক, ইফতারি খেয়ে মাগরীবের নামাজ পড়ে মাত্র তসবী নিয়ে
বসেছে, কিছুটা পড়া হয়েছে আর
শুনে ল্যান্ড ফোন বাজছে। বুঝলো, সালমা আন্টির ফোন।
দু’মিনিট পরেই আম্মা কাছে এসে হাক দিলো, “কই রেডি
হওনা? তোমারে না কইছি আজকে নামাজ পইড়াই রেডি হয়া যাইতে! ভাবী কইছে পাঁচ
মিনিটের মধ্যে যাইতে!”
আগে বলেনি একথা! এখন বলছে! তিন্তিলী সে কথা বলতেই
মা ক্ষেপে ভূত!
তিন্তিলীও জোরে বলে উঠলো “বল্লেইতো রোজার মধ্যে ইফতারীর
পরপর পাঁচ মিনিটে রেডি হওয়া যায়না! রেডি হচ্ছি। তাড়াতাড়ি হইলেইতো হইলো নাকি?”
মা আর কথা না বাড়ায় না। নিজে শাড়ি পড়তে থাকেন। ওও
সাত তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নেয়। তারপরে দুজনে মিলে যায় সালমা আন্টির বাসায়।
কাছাকাছি বাসা। মাত্র ছোট্ট একটা গলি পর।
তিন্তিলীদের বাসা থেকে ওই বাসার অনেকটাই দেখা যায়।
তিন্তিলী গিয়ে আন্টির বড় মেয়ে সুপ্তির ঘরে কয়েক
মিনিট বসে কথা বলতে বলতেই শুনলো ছেলেরা চলে এসেছে। ছেলেরা ওই একই বিল্ডিং এর তিন
তলাতেই থাকেন। ইটালী থেকে এসেছেন। বড় বোনের বাসায় উঠেছেন।
যা হোক ছেলেরা আসার পরে তিন্তিলী, ওর মা আর সালমা আন্টির সাথে গিয়ে ঢুকলো ড্রয়িং
রুমে। রুমে ঢুকেই এক ঝলকে পুরো রুমটা দেখা সারা। কোন দিকে কি আছে! কে কোথায় বসেছে!
এক পাশের দেয়াল ঘেঁষে রাখা তিন সিটের সোফায় বসেছে বকর আংকেল। সালমা আন্টির
হাজবেন্ড। আর তাঁর
পাশে একটা মেয়ে। কমবয়সী। ফর্সা। সুন্দর দেখতে। টানা টানা চোখ। রুমের দরজার কাছের তিন সিটের আরেক সোফায় বসেছে
খুব মোটা এক লোক! খুউব মোটা! আর তার পাশে বসা কমবয়সী এক তরুণ। খুব সম্ভবত অনার্স
পড়ে! তিন্তিলী সরাসরি না তাকিয়েই হালকা দৃষ্টি নিবদ্ধ করেই এতকিছু আঁচ করে নিচ্ছে।
ও বসেছে দু’জন ছেলে বসা যেদিকের সোফায় তাঁর ঠিক বিপরীত দিকে। মাঝে একটা মাঝারি
আকারের কাঁচ বসানো টেবিল। আন্টিদের ড্রয়িং রুমটা বিশাল লম্বা। চওড়াতেও।
মা আর আন্টি বসা দু’জন দু’দিকে। আংকেল আছেন। দুজন
লোকও। কিন্তু পাত্র কে! কোনটা পাত্র! তিন্তিলী বেশ কনফিউশনে পরে গেলো!
কথাবার্তা শুরু হয়ে গেছে! পাত্রী দেখার পর্ব!
কমবয়সী মেয়েঃ “জ্বী, আন্টি; মামা তো ইটালী থেকে
এসেছেন এই এক সপ্তাহ!”
তিন্তিলী ভাবছিলো। ভাবতে ভাবতে খেয়াল রাখতে
পারেনি আরো কি কি কথা হচ্ছিলো। কাকে উদ্দেশ্য করে সুন্দর মেয়েটা কার কথা বললো। ওর
মামা কে! ঐ মোটা লোকটা? কয়েক মিনিটের মধ্যেই বোধগম্য হলো যে এই মোটা লোকটাই সম্ভবতঃ
পাত্র! ও তো প্রথমে ভেবে নিয়েছিলো এরা সবাই ছেলের পক্ষ থেকে মেয়ে দেখতে এসেছে!
মোটা শরীর দেখে প্রথমেই ওর মনটা দমে গ্যালো। “ওরে
বাপরে! আমাদের দুইজনকে লাগতেছে দুই মেরু! একজন ভীষণ মোটা আর আরেকজন তেমনি শুকনা!
অন্তত ওই মোটুর পাশে তো তাই! তাঁর তুলনায়!”
মুহুর্তেই মনে হলো, কি যেন একটা ইংলিশ মুভি দেখেছিলো টিভিতে! নামটা
মনে পরছেনা! লোকটা অনেক মোটা! নিগ্রো! মনে হয় যেন বেলুন ফুলিয়ে দেহটিকে ওইরকম
বানিয়েছে। পরে স্লিম বানানো হয় লোকটাকে। এই ইতালীর লোকটাকেও ওইরকম বেলুন ফুলানোর
মত মনে হতে লাগলো তিন্তিলীর কাছে!
কথাবার্তা শুনে আরো যা বুঝা গেলো, মানে ক্লিয়ার হলো আরকি! ছেলে ওইখানে থাকে তের বছর
ধরে। প্রথমে ওখানে গিয়ে হোটেলে নিজে কাজ করেছে। “হোটেলে! ওফ!” তিন্তিলীর ভ্রু
কুঞ্চিত হলো!
ছেলের নিজেরই হোটেল আছে এখন। ভালো কামায়!
অবস্থা যতই ভালো হোক তিন্তিলীর যে ব্যবসায়ী
একেবারেই পছন্দ না। ব্যবসায়ীরা বউদের অনেক জ্বালায়! কদিন পর পর ব্যবসার পরতি হাল
হলে বলবে, “যা! বাপের বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে আয়!” জঘন্য! তিন্তিলী চায় না এরকম কিছু
ওর জীবনে ঘটুক! ব্যবসায়ী হলে সেইরকম হবে! খুব নামকরা! তবে, ইটালীতে নামকরা না নামছাড়া কি
ব্যবসা করে তার খোঁজ নেবে কি করে! ব্যক্তিগতভাবে খুব বেশি উচ্চাকাংখা নাই ওর। ছেলের চেহারা সুরত নিয়েও খুব একটা মাথাব্যাথা নেই। ছেলে একটা সম্মানজনক চাকুরী করলেই ও খুশি। মনমানসিকতাই আসল।
মনমানসিকতা! এই মোটুর হয়তো মনটা ভালো হতেও পারে!
তবুও অস্বাভাবিক মোটা শরীর কিছুতেই পছন্দ হচ্ছেনা! তিন্তিলী বেশ বিব্রত হয়ে পরলো!
পছন্দের খুব বেশি বাছাবাছি না থাকলেও এখন বুঝতে
পারলো, অনেক কিছুই আছে যা পছন্দ করা যায়না। আর সেটা সময়মত টের পাওয়া যায়।
পরিস্থিতি দেখে। “কিছু করার নাই। বিয়ে দেরীতে হোক। তবু, এমন কিছু চাইনা যা ভালো
লাগে নাই।“
আনুসাংগিক কিছু জিজ্ঞাসাবাদের পর ওর ছুটি মিললো। সুপ্তির
রুমে চলে এলো। চোখেমুখে চওড়া হাসি নিয়ে সুপ্তি এগিয়ে এলো কাছে, “ কেমন লাগলো,
আপু?”
“ধুর! ভীষণ মোটা! ড্রাম একটা!”
সুপ্তি আরো দ্বিগুণ চওড়া হেসে বলে উঠলো, “ক্যান?
পছন্দ হয় নাই?”
“আমি একে বিয়ে করবো না! অসম্ভব!” স্ট্রেইট বলে
দিলো তিন্তিলী!
ছেলেরা দেখে চলে যাওয়ার পরেও আরো কিছুক্ষণ ওই
আন্টির বাসায় থাকতে হলো। আন্টিরা আসতেই দিবেন না। “আরেকটু বসে গল্প করোনা? তুমিতো
একেবারেই আসো না!” এর মধ্যে কারেন্ট চলে গেছে। তিন্তিলী প্রাইমারী স্কুলের ভাইভার রেজাল্টের কথা
তুলে মা’কে তাড়া দিয়া কিছুক্ষনের মধ্যে ছাড়া পেয়ে বাসায় ফিরে এলো।
তিন্তিলীর মাকে নিয়ে খুব মুশকিল! ওনাকে যে যা
বুঝায় উনি সেটাই করেন। নিজে থেকে একটু নিজের বুদ্ধি দিয়ে কোনকিছু বিচার করেন না।
কেউ যদি বলে ছেলে চাঁদের টুকরা! তিনি সেটাই বিশ্বাস করেন! ‘আমরা চিনি’ বলে মাকে যে
কেউ যা খুশি গছিয়ে দিতে পারবে! মা’কে নিয়ে এই হয়েছে এক মুশকিল।
বাসায় ফিরে ওর মা চা বানাতে বসেছে। চা বানানো
শেষ। ও গিয়ে বললো, “আম্মা
লোকটাতো বিজনেস করে!” আম্মার জবাব “হ্যাঁ, আমিতো আগেই শুনছি!” তিন্তিলী পুরা আকাশ
থেকে পরলো, “আগেই শুনছো? মানে?” ওর আম্মা জানে যে, ও বিজিনেসম্যান পছন্দ করেনা। তিনি নিজেও করেন না।
তবু, কেন দেখতে গ্যালো?
“এইসব ব্যাপার একেবারে বিরক্ত লাগে! কেউ
কিছু চাপায়া দিতেছে তবু কিচ্ছু বলবা না! মনে হয় যে মাইয়া নিয়া পানিত পরছো!”
তিন্তিলী রাগে গজগজ করতে করতে দুপ দাপ পা ফেলে ধুরুম ধারুম শব্দ তুলে নিজের রুমের
দিকে চলে যায়!
এর মধ্যে ইন্টারনেট খুলে বসলো আবার রেজাল্ট দেখার
জন্য। ইয়াহু মেসেঞ্জার অন করে দেখে, একটা সিনিয়র ভাইয়া আছেন অনলাইনে। গ্রামিণ ফোনে চাকরি করেন। তিন্তিলী তাকে বন্ধু মনে করে। সিনিয়র বন্ধু। তার সাথে কথা বলে যদি মনটা হালকা হয়! তিন্তিলী কথা
শুরু করলো। তারপরে কথায় কথায় ওনাকে পুরো বিষয়টা জানালো। উনি কয়েকটা কথা বললেন। ছেলে যে বিয়ে করবে, বউ নিয়ে যেতে
পারবে তো! ইটালীতে অনেকেই বউ নিয়ে যাওয়ার পারমিশন পায়না। অনেকের ক্ষমতাইহয় না যে
বউকে নিয়ে যেতে পারবে নিজের কাছে! তাহলে বছরের পর বছর তাকে যদি বাবার বাড়িতেই পরে
থাকতে হয় তাহলে এরকম বিয়ে করার মানে কি! সেগুলা আবার মাকে গিয়ে বলে এলো।
মা প্রথমে মানতেই রাজী হলেন না!
“তুমি বেশি কথা বইলো না তো! ওরা তো বললো ছেলের
অবস্থা ভালো!”
- “ওফ, মাআআআ! তুমি নাআআআ! ওরা বিয়ের আগে স্বীকার
করবে যে ওদের বউ নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা নাই?
এ কথা বললে, ব্যাটা বউ পাবে? পরে যখন আমাকে নিয়ে যেতে পারবে না, তখন এই দু’জনে দুই
জায়গায় পরে থাকা! এইরকম বছরের পর বছর আলাদা হয়া থাইকা বিয়ে কইরা লাভ কি হবে, সেটা
একটু ভাইবো!”
এত কথা একসাথে বলার পরে ওর আম্মা কিছুটা শান্ত হয়েছেন। ওকে বললেন, “আচ্ছা হইছে, আমারও খুব একটা পছন্দ হয় নাই। বড় বাবুকে কিছু
জানাইস না!” মায়ের এই কথা শুনে তিন্তিলী একটু নিশ্চিত হলো “মা যখন ডিসলাইক করছে!
আর কি! এইখানে তাইলে আর কথা বাড়াবেন না!”
তবুও নিশ্চিন্ত হতে পারলো না! মনটা খচখচ করতেই
থাকলো ওর! মা’কে কোন বিশ্বাস নেই! ছেলেরা যদি ওকে পছন্দ করেছে বলে খবর দেয় মা ঠিকই
আবার ঘুরে বসবেন। মেয়ে মানুষের জীবন! কবে যে শ্যাষ অবে এইসব যন্ত্রনাকর পরীক্ষা
দেওয়াদেওয়ি! আল্লাই জানেন! কান্না জড়ানো বিড়বিড় কণ্ঠে গলা ধরে আসে তিন্তিলীর!
জানালার গ্রীলে হাত রেখে কোলাহলপূর্ণ সন্ধ্যা
রাতের আলো-অন্ধকারমিশ্র পাশের বাড়ির চিপা গলির দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ! কোলের
ওপরে রাখা বাম হাতের তলে চওড়া কালো ডায়রী! মুখে খোঁচা খাচ্ছে ডান হাতে ধরা কলমের
নিব।
আরো কিছুক্ষণ পরে...
অন্ধকারের দিকে কিছুক্ষণ চোখ মুখ কুঁচকে বসে থেকে
নিজের বিরক্তিকর অনুভূতিটুকু গেঁথে রাখতে লাগলো ডায়রীর দাগ টানা ঘরগুলোতে।
-----সমাপ্ত----
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন