।এক।
রৌদ্রালোকিত হাস্যোজ্জ্বল দিনের শেষাংশে শিল্পী
যেন তুলির পরশে পরশে অন্ধকার বানিয়ে দিচ্ছে। হালকা শীতল হাওয়া
বয়ে চলেছে। ধীরে ধীরে বাড়ছে হাওয়ার বেগ। জানালার পর্দাগুলো ইতস্তত নড়াচড়া করছিলো। কখনো ফুলে বেলুনাকৃতি হয়ে যাচ্ছিলো। এখন পারলে
শিক খুলে পালাতে চাইছে।
প্রকৃতি গাল ফুলিয়ে গোমড়া মুখ ধারণ করে রেখেছে।
গাছের পাতায় হুড়োহুড়ি। হাত ধরাধরি করে চলে যেতে চাইছে কোথাও। এরপরেই শুরু হয়ে গেলো
প্রকৃতির অঝোর কান্না।
আজকাল মেঘলা আবহাওয়ায় যেবুন্নাহারের মন তেতে উঠতে
থাকে। ক্রমশঃ চঞ্চল হয়ে উঠছেন তিনি। কিছু ভালো লাগছে
না। বুকটা ধরফর করছে। “তিরিন, এই তিরিন!” ডাকতে ডাকতে তিনি হাঁপাতে থাকেন। হাত মৃদু মৃদু
কাঁপছে। গলা শুকিয়ে কাঠ! “তিরিন, এই তিরিন” বলে আবার ডাকেন। কিন্তু, তার ক্ষীণ
কন্ঠের ডাক তিরিনের কান স্পর্শ করে না। তিরিন এইখানে নাই।
ঘরে লাইট জ্বালানো নেই। বাইরে শুরু হয়ে
গেছে তাণ্ডব। ঝম ঝম শব্দে কারা যেন ছুটে আসছে। বাইরের কোলাহল যেন বুকের ভেতরে
হাতুরি পেটাচ্ছে। আশেপাশে কেউ নেই। পাশের ঘরে একজনের
থাকার কথা। তিনি তো আছেন
দিন রাত আল্লাহর কালাম নিয়ে মগ্ন। এ পাশে কেউ মরে পরে থাকলেও তার ধ্যান ভাংবে না!
।দুই।
“জায়া, বৃষ্টি আসছে। তোমার ঘরের জানালাটা লাগাও।
তোষক ভিজে যাবে।” বলে মেয়েকে ডাকলেন লতুফা বেগম।
“হ্যাঁ, লাগিয়েছি জানালা” পাশের ঘর থেকে জবাব এলো
জায়ার। ডিজিট্যাল ক্যামেরায় জানালার ভেতর হতেই বাইরের বৃষ্টির রূপ ধারণ করার
চেষ্টা করছিলো সে। কয়েকটা মনের মত ছবি তুলে নিয়ে ওর মনে পরলো নানীর কথা। নানী ঘরে
একা নেই তো? “মা, নানির কাছে কি কেউ আছে?” “না, নাই। একটু আগে ফরিদ অফিস থেকে
ফিরেছে। আমাকে দেখতে বলে ও উপরে গেছে” বলে তিনি পা বাড়ালেন মায়ের ঘরের দিকে।
“তুমি থাকো। আমি যাচ্ছি!” বলে জায়া ক্যামেরা রেখে
দ্রুত চলে গেলো নানীর বাসায়; পাশের ফ্লোরে।
।তিন।
সিড়ি ঘরে সন্ধ্যার আলো জ্বেলে দিয়েছে কেউ।
বারান্দার গেটের শব্দ। পায়ের শব্দও কানে আসছে। কে আসছে!
“তিরিন! তি-রি-ন-ন-ন! এই তি-রি-ন-ন” বলে তাঁর
কন্ঠ ভিজে আসতে থাকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তার মাথার কাছে দেখা দেয় একটি মুখ।
মেয়ে মুখ। “কে ওটা?” মাথার কাছে থেকে মুখটা সরে গিয়ে আলো জ্বালিয়ে দিলো ঘরের।
কোথাও তিনি তিরিনকে দেখতে পেলেন না। মাথার কাছে ফিরে এলো মুখটা। তাঁর নাতনী। জায়া! “এই রকম ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছেন কেন?” বলে
পাশে বসলো।
“তিরিন, তিরিন” বলে তিনি গোঙাতে থাকেন। জায়া আরো
কাছে এসে বসে জড়িয়ে ধরে ওর নানীকে। একটু ঝুঁকে, শুয়ে থাকা নানীর গালে নিজের গাল
লাগায়। পাতলা শরীরের অবয়বে ঢেকে দিতে চায় নানীর ভয়ে কাঁপতে থাকা চওড়া শরীরটাকে।
“কি হইছে নাআআনী?” আদুরে অবোধ শিশুর মত পঁচাত্তর বছর বয়সী নানী অভিমানী জিদ্দি
কন্ঠে জিজ্ঞেস করেন, “তিড়িন কোই?”
নানীকে লাগছে একেবারে বাচ্চাদের মত। বয়সের ভাঁজে
মুখ কুঁচকে যাওয়া বৃদ্ধার মুখশ্রী আর অভিমানী কন্ঠস্বরে দ্বিধান্বিত হতে হয়। নানীর
দিকে তাকিয়ে জায়ার খুব কষ্ট হতে থাকে। মানুষটার ভেতরে কি চলছে কে জানে! খান্দানী
জমিদার গিন্নির মত সারাদিন হাঁক ডাক করতেন। সুস্থ অবস্থায়। তাকে এই অবোধ অবস্থায় কল্পনাও করা যায় না। হঠাতই
সপ্তাহখানেক ধরে এইরকম শিশু হয়ে গেছেন। আশ্বস্ত করার জন্য জবাব দিলো, “তিরিন খালা তো
সারাদিনই আপনার কাছে থাকে। এইমাত্রই উপরে গেলো। আসবে। খালুকে চা নাশতা খাওয়ায়
দিয়াই আবার আসবে। এখন আমি থাকি। আপনার কিছু লাগবে? আমাকে বলেন।”
ক্রমাগত “তিরিন! এই তিরিন! আমারে তো নিয়া
যাইতেছে! আমি যামু না! এই তিরিন!” বলছেন, আর জানালার দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির ঝমঝম আওয়াজে
চোখে মুখে আরো বেশি ভয়ের ভাব ফুঁটে উঠছে তাঁর। জায়া নানীকে আরো নিবিড় করে জড়িয়ে ভয়
দূর করার চেষ্টা করছে।
নানীর গোঙানি কান্নায় রূপ নিতে থাকে। জায়া পরম
মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতে থাকে। নানী বিছানা ছেড়ে নেমে পরতে
চাইছে। জায়ার একার পক্ষে সামলানো সম্ভব হয়ে উঠছে না। মাটিতে পরে গেলে এত ভারী
শরীরে ব্যাথা পাবেন। ডায়াবেটিসের পেশেন্ট পরে গিয়ে কেটে গেলে বিপদ আছে। তাছাড়া ও
একা তুলতেও পারবে না।
আজান শেষ হয়েছে। মিনিট দশেক পেরিয়ে গেলো। নামাজটা
পড়া দরকার। মাগরিবের ওয়াক্তে বেশি দেরী করতে নেই।
নানীকে একা বসিয়ে রেখেই জায়া নিজের ঘরে ফিরে এলো।
ওর একটু আগের জায়গায় ফিরে গেলেন ওর মা। তাঁর মায়ের পাশে সবসময় একজনকে থাকতে হয়।
।চার।
লতুফা বেগম গিয়ে দেখলেন মা মেঝেতে দাঁড়িয়ে। স্যান্ডেল পরছেন। স্যান্ডেল এর আঙ্গুলের জায়গায়
পা ঢোকান নাই। কোনরকমে স্যান্ডেল এর উপরে পা চেপেই ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে
এগুচ্ছেন। এভাবে হাঁটলে উস্টা খেয়ে পরে যাবেন। লতুফা বেগম জিজ্ঞেস করলেন, “কই যান?
স্যান্ডেলটা ঠিকমত পরে নেন। নাইলে পরে যাবেন।” ভাঙ্গা টেপ রেকর্ডারের মত একটানা জবাব
পেলেন, “হেই পাশে যামু! আমি হেইই পাশে যামু! আমি হেই পাশে যামু!”
“আচ্ছা, চলেন” বলে নিজের মাকে এগিয়ে এসে ধরে ধরে
নিয়ে চললেন নিজের বাসার দিকে।
যেবুন্নাহার মেয়ের দিকে মুখ বাড়িয়ে বললেন, “কালকে
সাত তারিখ। অনির জন্মদিন। অনিরে ভালো মন্দ খাওয়াইতে অইবো।” লতুফা বেগম অবাক হন।
মায়ের এই জন্মদিনের কথাটা কিভাবে মনে আছে!
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হুঁ, খাওয়াইবেন ক্যামনে?
অনি তো ইংল্যান্ডে!”
“হ, ভালো মন্দ খাওয়াইতে অইব।” আবার একঘেয়ে জবাব।
বড় মেয়ের ঘরের ছোট নাতি অনি যে বাংলাদেশে নেই তা
ওনার মনে নেই বোধহয়। মেয়ে মনে করিয়ে দিলেও সেটা তিনি শুনলেন না সম্ভবতঃ!
ঘর ছেড়ে বারান্দার গ্রীলের গেট পেরিয়ে মেয়ের ঘরের
দরজার দিকে না যেয়ে তিনি বাইরের দিকে যাওয়ার জন্য নিচের সিড়ির দিকে পা বাড়াচ্ছেন।
বড় মেয়ের বয়সও মধ্য ষাট পেরিয়েছে। মায়ের এইসব কখনো
ভালো থাকা, কখনো পাগলামী
তিনি সব সময় সহ্য করতে পারেন না। তাছাড়া এই দুই বুড়োবুড়ির সার্বক্ষণিক দেখাশুনাও
তিনিই করেন। তিরিন শুধু মায়ের সমস্ত ব্যাপারে দেখাশুনা করেন।
তিনি কিছুটা ঝাঁঝের সাথে বলে উঠলেন, “বাইরে
বৃষ্টি হচ্ছে। মুষলধারে। আপনি কই যাইতেছেন?”
“আমি আব্বার বাসায় যামু!”
“আব্বার বাসায় যাইতে হইবো না এখন। পরে যাইয়েন।
এইরকম বাসার ম্যাক্সি পিন্দা বাইরে কোথাও যাওয়া যায় না! আসেন এখন, ঘরে ঢোকেন।” বলে
নিজের দরজার দিকে ঘুরাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু একা পেরে ওঠেন না। দূর্বল মায়ের
শরীরে কি অসম্ভব শক্তি!
“আমি আব্বার বাসায় যামু! আব্বার বাসায় যাইয়া
বৃষ্টি দেখ-মু! টিনের চালের উপ্রে বৃষ্টি! অনেক শোনদোর!”
“আচ্ছা, আরেকদিন যাইয়েন। এখন না!”
সিড়ি ঘরে সামান্য উঁচু গলায় কথা বললেই বেশ জোরে
শোনা যায়। সারা বাড়ি সুরঙ্গের মতন গমগম করে। ভালো করে খেয়াল না করলে মনে হয় নিচে
যেন কি না কি অঘটন হয়েছে বলে মনে হয়! জায়া নিজেদের ঘরের দরজা খুলে বাইরে উঁকি
দিলো। নানীর সাথে মায়ের টানাটানি দেখতে পেল।
ইতোমধ্যে হইচই শুনে তিন, চার আর পাঁচ তলা থেকে
নেমে এলো তিরিন, মনি আর ফাইজা। যেবুন্নাহারের তিন মেয়ে। উপরের তিন ফ্লোরে থাকে। তিনি
নিজে থাকেন দোতলায়।
সবাই এক সাথে এগিয়ে এলো, “কি হইছে আম্মা? এই ঝড়
বৃষ্টির রাতে আপনে কই যাইতেছেন?”
“আমি আব্বার বাসায় যামু! তোমরা সব এরকম কর্তেছো
ক্যান?” মারমুখী ভংগীতে বলে উঠলেন যেবুন্নাহার।
“চলেন, টিভিতে আপ্নের প্রিয় লেখকরে দেখাচ্ছে। হুমায়ূন
আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদ এর শরীর ভালো না। আমেরিকায় চিকিৎসা হইতেছে। চলেন এখন ঐটা
দেখি” বলে মাকে বড় বোনের ঘরের দিকে ঠেলে নিয়ে চললো সবাই।
ঘরে নিয়ে সোফায় বসিয়ে দেওয়ার পরে আবার উঠার জন্য
অস্থির হয়ে পরলেন যেবুন্নাহার। ছোট মেয়ে ফাইজা জিজ্ঞেস করলো, “কি হইছে? বাথরুমে যাবা?”
না!
তাইলে?
আমি মাশরাফ আলীর কাছে যামু!
মাশরাফ আলীর কাছে গিয়া কি হবে?
আমি মাশরাফ আলীর কাছে যামু! ঐ তিরিন!
মাশরাফ আলী কই থাকে?
ল্যাবেইডে। আমি মাশরাফ আলীর কাছে যামু।
এখনি যাইবা নাকি? গাড়ি আনুক আগে, তারপরে যাইও।
না, আমি মাশরাফ আলীর কাছে যামু। বলে উঠে
দাঁড়ালেন।
ফাইজা বিছানায় বসে বসে কথা বলতে বলতে দেখলো, মা
বাইরের ঘরের দিকে এগুচ্ছে! সামনের ঘরে অন্যরা আছে তাই তিনি বিচলিত হলেন না।
সারাদিন তিন ছেলেকে স্কুল আর কলেজে আনা নেওয়া করে তিনি বেশ ক্লান্ত এখন। শুয়েই
রইলেন।
।পাঁচ।
ঘরের মধ্যে ডাইনিং টেবিল ঘিরে বসে আছে
যেবুন্নাহারের চার মেয়ে। লতুফা, তিরিন, মনি আর ফাইজা। আরেক মেয়ে পাপড়ি ফোনে যোগ দিয়েছে এদের সাথে।
মনিঃ খালি বলতেছে, আমি আব্বার কাছে যাবো!
পাপড়িঃ মৃত মানুষের কাছে যাওয়ার ইচ্ছা! ভালো
লক্ষণ না!
মনিঃ হুঁ! চিন্তার ব্যাপার!
পাপড়িঃ সবাই নামাজ কালাম ঠিক মত পড়স না যে তাই এই
অবস্থা!
মনিঃ হ, তোরে কইছে! তগো মতন হুজুর না হইলে মনে হয়
দুনিয়ার আর সব মানুষ নামাজ কালাম ঠিকমত পড়ে না!
পাপড়িঃ সামনেই রোযা আসতেছে। রহমতের মাস আসতেছে।
আর এইদিকে আম্মার এমন অবস্থা কি এমনি এমনি!
পাপড়ির আজাইরা কথাগুলো শুনে মনির মুখে বিরক্তির
ছাপ পরতে থাকে। সমস্যা হলো নিউরোর। আর বোনটা ধর্মের গীত শোনাচ্ছে! এইসব হুজুরদের
এই এক সমস্যা! মুখের ভাব দেখেই তিরিন বুঝে নেয়, আবার শুরু হয়েছে ধর্মীয় জ্ঞান দান।
ফোনটার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে, “কি কয়?”
মনি জবাব দিলো, “থাম! কথা শুনতেছি।“
ফোন রেখে দেবার পরে সবাই মিলে ঠিক করলো, ল্যাব
এইডে নিয়ে যেতে হবে। মাশরাফ আলীর কাছে। নিউরোর চিকিৎসা দরকার হলে রোযার আগেই শুরু
করা ভালো। ভালো করে তুলতে না পারলে আরো খারাপ অবস্থা হলে পরে সমস্যায় পরতে হবে।
।ছয়।
ল্যাবএইড এর নিউরোলোজীর বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মাশরাফ
আলীর কাছে চেক আপ করিয়ে আনার বেশ কয়েকদিন পরের এক সন্ধ্যা।
জায়া টেলিভিশনে খবর দেখছিলো। জনপ্রিয় কথাশিল্পী
হুমায়ূন আহমেদ এর শারীরিক অবস্থার অবনতি...
নানী বিছানায় শুয়ে আছেন। নানীর দিকে চেয়ে দেখলো,
নানীর চোখ খোলা। খবর শুনেছেন কিনা বোঝা যাচ্ছে না। চুপ করে শুয়ে আছেন। কোন কথা
বলছেন না। প্রিয় লেখকের শারীরিক অবস্থার অবনতির বিষয়টা মাথায় গিয়েছে কিনা ভেবে
কিছুটা চিন্তিত হলো ও। বুড়ো বয়সে মানুষ
অসুস্থতার কথা শুনতে পারে না। আর ওর নানীর তো ব্রেইনের সমস্যা! কখনো সুস্থ। আবার কখনো বিগড়ে যান। হঠাত করে বুঝাও যায় না কেমন
আছেন।
ও নানীর মাথায় চুলে বিলি কাটতে লাগলো।
যেবুন্নাহার বিছানায় শুয়ে বারান্দার দরজা দিয়ে
কালো অন্ধকারের দিকে চেয়ে রইলেন।
মনে পরে যায় পেছনের কথা। এইরকম এক অন্ধকার রাত
ছিলো সেইদিনও। বাইরে প্রচন্ড মুষলধারে বৃষ্টি। দরজায় কয়েকবার ধাক্কার শব্দটা কানে
পৌঁছাতে বেশ দেরী হয়েছিলো। এমনিতে একা। সাথে রয়েছে নতুন প্রাণ! মাত্র পনেরো বছর
সাত মাস বয়সে নিজের শরীরে বাসা নিয়েছে এই নতুন অস্তিত্ব! প্রায় দ্বিগুন বয়সী স্বামী
পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে কাজ করেন। সারাদেশের মানুষের নিরাপত্তার ডিউটি শেষ করে
অত রাতে কিশোরী বউয়ের নিরাপত্তার কথা মনে পরে। লোকটার মধ্যে রোম্যান্টিকতার লেশমাত্রও ছিলো না। শুধু অধিকার করে রাখতে চাইতো সবকিছু। ঝুম বৃষ্টির
কলতান, ভেজা মাটির ঘ্রাণ উপেক্ষা করে আরেকজনের ইচ্ছের হাতে সমর্পণ হতে হতো। দিনের
পর দিন। রাতের পর রাত। কিন্তু একটু কবিতা, গল্প বা একটু গানে অংশ নিতো না কখনো।
এইরকম ঝড় বৃষ্টির রাতে যখন স্বামীকে সাথে নিয়ে ভিজতে মনে চাইতো তখন সে অনুরোধটা
করারও সুযোগ পেত না। তার আগেই ওর উপর আদেশ করা হতো- “যেবু, আল্লাহর গজব শুরু হইছে।
ওযু কইরা আসো। আল্লাহরে ডাকি দুইজনে।”
কিশোরী বয়সের চঞ্চল মনে সবসময় আল্লাহ ভয় ঢুকিয়ে
দেওয়ার এই কারাগার হতে প্রায়ই মুক্তি আশা করতো মনটা। মুক্তি তো মিললোই না।
উপরন্তু, সাত সাতটি সন্তানের মায়ায় বাঁধা পরলো জীবন। কিশোরিত্ব থেকে তরুণিত্ব
পেরিয়ে আজ বৃদ্ধাবস্থায় উপনীত।
আজ এত বছর পরে, সব সন্তানের ঘরের নাতি নাতনীদের
সার্বক্ষণিক সেবায় নিয়োজিত থেকে এই মায়া ছেড়ে না ফেরার দেশে যাবার ডাক আসতেই
প্রাণপন একটা কিছুর অবলম্বনে নিজেকে জড়াতে ইচ্ছে করে! কিন্তু সময় যে ঘনিয়ে আসছে। চান্দের
মতন দেখতে নাতির নাত-বউ দেখার বড় সাধ ছিলো। জায়ারও বেশ বয়েস হয়ে যাচ্ছে! কবে যে
আল্লাহ মুখ তুলে চাইবেন। ইচ্ছেগুলো কি আদৌ পূরণ হবে! সামনের সোনালী দিনগুলো দেখার!
কষ্টে গুঙিয়ে ওঠে হৃদয়ের ভেতরটায়!
নানীর কান্নাজড়িত কন্ঠের সামান্য অস্ফুট আওয়াজেই
জায়া সামনে ঝুঁকে আসে, “কি হইছে নানী? ক্ষিদা লাগছে?”
“আমি হেই পাশে যামু!” বলে উঠে বসতে চেষ্টা করলেন।
তাঁর কন্ঠস্বর পেয়ে বাকি মেয়েরা সবাই ছুটে এলো।
তিরিন এগিয়ে এসে উঠতে সাহায্য করলো, “চলেন ঐ পাশেই
যাবো। ভাত খাওয়ার সময় হইছে।”
সারাদিন এই এক ব্যাপার শুরু হয়েছে। কোন পাশেই
বেশিক্ষণ থাকতে চান না। নিজের ঘরে থাকলে শুরু করেন এই মেয়ের বাসায় আসবেন। আবার
মেয়ের বাসায় ঢুকেই শুরু করেন নিজের বাসায় যাবেন। সারাদিন একটু পর পর দরজা খোল আর
বন্ধ কর।
বৃষ্টি থেমেছে। বাইরের ঝমঝম শব্দটাও নেই আর।
তিরিন আর ফাইজা ধরে ধরে নিয়ে গেলো পাশের বাসায়। গেট দিয়ে ঢুকে যাবার আগে একটু জেদ
করলো নিচে যাবেন বলে। গেটের কাছে আসলেই ওনার ভেতরে কি যেন হয়ে যায়। সারাজীবন ঘরে বন্দী
থাকলেন বলেই হয়তো এই শেষ বেলায় সবকিছু ছেড়ে ছুঁড়ে খুব স্বাধীন হতে ইচ্ছে করে।
নিচে নেমে যাওয়ার জন্য জোর জবরদস্তি করে ক্লান্ত
হয়ে গেলেন। তারপরে, মেয়েদের বিশেষ পাত্তা না পেয়ে বারান্দার ভেতরে ঢুকে গেলেন।
।সাত।
আজ উনিশে জুলাই দুই হাজার বারো। সারা রাত একটুও
ঘুম আসে নাই। যেবুন্নাহারের। কেবলই মনে হয়েছে সকাল হওয়া দরকার। সকাল হলেই খবরের
কাগজ পড়বেন।
বুড়ো হয়েছেন। মাঝে মাঝে মাথাটা কাজ করে না।
কিন্তু, আশেপাশে সবার কথাবার্তাই কানে আসে। মাথা আউলা থাকলে সব কথায় অংশ নিতে পারেন
না ঠিকই। কিন্তু বোঝেন সবই। ঘুমোবার ঠিক আগে শুনেছিলেন নাতনী বলছিলো,
খবরে দেখিয়েছে, হুমায়ূন আহমেদ মারা গেছে! লোকটা
শ্যাষ পর্যন্ত মইরাই গেলো। আর কোনদিন এই লেখকের হাত ধরে আর কোন ‘ফাউন্টেন পেন’ বের
হয়ে আসবে না!
ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে পরলেন। হেঁটে এসে বেশ
সকালেই মেয়ের বাসার বেল টেপেন। বয়সের ভারে বেলটা বেশ জোরে বেজে যায়! “কে রে এত
সকালে” বলে এক রাশ বিরক্তি মুখে নিয়ে দরজা খুলে দিলো নাতনী জায়া! “এত সকালে কি
ব্যাপার, নানী?” নাতনীর প্রশ্নকে উপেক্ষা করে ওর ঘরে ঢুকে গিয়ে বইয়ের শেলফ থেকে গত
বছরের একুশে বইমেলা থেকে উপহার পাওয়া ‘ফাউন্টেন পেন’ বইটা হাতে তুলে নেন। জায়া এসে
ধুলো মুছে দিয়ে ওনাকে চেয়ারে আরাম করে বসিয়ে দেয়। আজ সকালে নানীকে
বেশ ঝরঝরে সুস্থ দেখাচ্ছে। দেখেই মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেলো।
কাঁপা বয়স্ক হাতে বইটির কয়েকটি পাতা উল্টে
উনসত্তুর নাম্বার পৃষ্ঠা খুলে কয়েক পলক চেয়ে থাকেন। তারপরে পড়তে থাকেন... ‘বৃষ্টি
নেশা ভরা সন্ধ্যাবেলা’ গল্পটা। বড় ভালো লাগে তাঁর এই অংশটা। অনেক বার পড়েও তৃষ্ণা
মেটে না!
পড়তে পড়তে রোদ্রালোকিত জানালায় দৃষ্টি নিক্ষেপ
করেন। ডুবে যান নিজের ভাবনায়।
বয়স হলে এক সময় সবাইকে এভাবে চলে যেতে হয়। নিজেও
সেই পথে অগ্রসরমান। আর মাত্র কিছুদিন! এক বৃষ্টিমুখোর ঘোর বর্ষায় শোয়ার ঘরের
জানালা খোলা থাকবে। তিনি আল্লাহপাকের কাছে এই অপরূপ সৃষ্ট বৃষ্টির ফোঁটার দিকে
চেয়ে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে যেতে চান। মহান আল্লাহপাক রাব্বুল
আলামীন এর কাছে এই এতটুকুই শেষ ইচ্ছে তাঁর।
---- সমাপ্ত---
[একুশে সংকলন ২০১৪ 'নক্ষত্র' তে কাগজে প্রকাশিত এবং ই-বুক সৃজনে প্রকাশিত]
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন