শনিবার, ৭ মার্চ, ২০১৫

ছোট গল্পঃ অভিমান



এই, বগুড়া যেতে কয় টাকা ভাড়া লাগবে রে? আর, কোন স্টপ থেকে কিভাবে উঠবো? আমাকে এসএমএস করে জানা। আর্জেন্ট! আমি আজ বাসা ছেড়ে দিচ্ছি লিখে মোবাইলে এসএমএস পাঠালো লোপা

কয়েক সেকেন্ড পর মোবাইলে ম্যাসেজ এলে লোপা পড়লো নাসিমা লিখেছে কিভাবে যেতে হবে তার সাথে শেষে এও লিখেছে, হঠাৎ বাসা ছাড়ার কারণ কি! বাসায় কি কিছু হয়েছে?

আবার ম্যাসেজ পাঠালো ম্যাসেজই পাঠাতে হচ্ছে মোবাইলে বেশি টাকা নাই এখন রিচার্জ করার সময় নাই হাতে বেশি টাকাও নাই আজ থেকেই হিসেব করে চলতে হবে খুব

বিপদের সময় কাজে লাগবে ভেবে ইনকামের কিছু টাকা সে সবসময়ই সরিয়ে রাখে নিজের কাছেই নিজের এই লুকোচুরি ব্যাংকেও রাখে এই টাকাটা বাসায় রাখে সব সময় তো ব্যাংকে যাওয়ার সময় থাকেনা তাই এই ব্যবস্থা

নাসিমাকে জানানোর আগে আনিসকে জানিয়েছিলো ছেলেটা ওকে পছন্দ করে কিন্তু, দুই পরিবারের স্ট্যাটাসে কিছু ঘাঁপলা থাকায় দুজনের বিয়েটা হওয়ার নয় কথা অনেক বার শুনেছে দুজনেরই মুখস্ত তবু, মাঝে মাঝে দুজনেই দুজনের খুব কাছে আসার স্বপ্ন টপ্ন দেখে কিছুদিন দুজনেই দুজনকে খুব দরদ করে তারপর আবার হাওয়া দুজনের কেউই ফিরেও তাকায়না যেন চিনেইনা

সকাল থেকে অনেক ভেবেও যাওয়ার কোন জায়গা পেলোনা আত্মীয়-স্বজনের বাসায় গেলে তো আবার ফিরেই আসতে হবে এমন কোথাও যেতে চায় না

আনিসকে বাসার কেউ চেনে না ওর কথা কেউ জানেও না নিজেও যে ওকে বিয়ে করার জন্য খুব পাগল তা' নয় শুধু জানা আছে ছেলেটা ভালো এই কঠিন সময়ে ওর কাঁধেই মাথা রাখা যায়

নিজের বিয়ের জন্য কারো হাতে পায়ে ধরার মত কিছু করতে হবে এমন ওর কল্পনারও বাইরে অথচ আজ সেটাই করতে যাচ্ছে !

আনিসকে প্রথমে বিয়ের জন্যই খুব চাপাচাপি করলো কিন্তু, লোপা নিজেও জানে এই কাজটা অত্যন্ত বোকামীর হয়ে যাবে আর, মাথা গরম হয়ে থাকা লোপাকে কোনভাবেই প্রশ্রয় দিলোনা সে

তারপরে লোপা জানালো, তাহলে আমাকে তোমার বাসায় সাবলেট হিসেবেই নাও নাহয়
আনিস বললো হেসে, মনে করো কোন একদিন মা বাসায় নেই বাজারে গেছেন বাবা থাকবেন তার নিজের ঘরে ঘুমিয়ে আর, আমিও চলে এলাম অফিস থেকে আগে আগেই আমাদের ড্রয়িং রুমে তুমি থাকলে তখন কি ঘটতে পারে, জানো তো?

লোপা জানে সে কথা আনিসদের বাসাটা খুব ছোট শুধু সাবলেট কেন, একজন গেস্ট রাখারও জায়গা নেই বাসায় কিন্তু, এই অসময়ে এইসব কথা মনে রেখে তো সিদ্ধান্ত নেয়া যাবেনা! ওর যে সত্যি একটা থাকার জায়গা দরকার! তাই সে জোর গলায় বললো, ধুর, সেসব কিচ্ছু হবেনা!

রাগের মাথায় বাড়ি ছাড়ার প্ল্যান লোপার আনিসেরতো নয় তাই তাকে কোনভাবেই রাজী করানো গেলোনা অগত্যা নাসিমাকেই ধরতে হলো

সকাল বেলা কোথা থেকে কি যে হয়ে গেলো এখন ঘটনার সূত্রপাত কিছুই মনে পড়ছেনা লোপার শুধু একটা কথাই কানে বাজছে, তুই এক্ষনি বাসা ছেড়ে চলে যাবি তোর মুখ আমি দেখতে চাইনা কথাটা লোপার মায়ের

লোপা সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছে মায়ের আলমারী থেকে নিজের যে কয়টি শাড়ি ছিলো সব নিয়ে এসেছে একবারে এখান থেকে চলে যেতে হলে ওর সব কিছুইতো সাথে নিতে হবে কিন্তু, ওর ছোট্ট ট্রাভেল ব্যাগে সবকিছু জায়গা হচ্ছেনা

বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে যাচ্ছে লোপা বিছানায় একপাশে ওর সমস্ত জিনিস ছড়ানো কাপড়-চোপড় গয়নাগাটি শাড়ি সালোয়ার কামিজ-ঘরে বাইরের

কিছু টুকিটাকি জিনিস আর কয়েকটা শাড়ি ঢুকাতেই লাগেজ ব্যাগ ভরে গেছে শাড়ির সাথে ব্লাউজ-পেটিকোটও নিতে হয়েছে বাকিগুলো কই ভরবে!

আজ একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে রোজ রোজ এইসব খেচর-মেচর ভালো লাগেনা

- হ্যাঁ বলো
- কেমন আছ এখন?
- কেমন আবার থাকবো!
- রাগ পরেনি এখনো?
- তুমি বুঝতে পারছো না! এখানে আর থাকা যাচ্ছেনা
- তুমি কি আমার কাছে আসতে চাও?
- তোমার কাছে এসে...! তোমার কাছে এসে কি হবে? তুমি তো আমাকে বিয়েও করতে চাইছো না আমাকে একটা রুম ভাড়াও দিবেনা
- লোপা, প্লিজ বুঝতে চেষ্টা কর আমার পড়াশুনা এখনো শেষ হয়নি তার উপর নিজেই নিজের খরচ চালাতে হিমশিম খাই সবার মতের বিরুদ্ধে বউ নিয়ে আসলে বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও থাকার ক্ষমতা নেই আমার শেষটায় গলা ধরে এলো আনিসের
- বুঝতে পারছি

আনিসের সাথে কথা বলার সময় লোপা খেয়াল করলো মা কাছাকাছি ঘুরছেন আরো ইচ্ছে করে সাবলেট নেয়ার কথা আলোচনা করতে থাকলো যাতে বাসার মানুষ বুঝে নেয় ওর পরিকল্পনা

কিছুক্ষন বাদে নাসিমা আবার ম্যাসেজ পাঠালো এই রকম রাগারাগি সব ফ্যামিলিতেই হয় যেন কোথাও না যায় অন্তত একেবারে কোথাও চলে যাওয়ার ডিসিশন না নিয়ে নেয় যদি বেড়াতে যেতে ইচ্ছে হয় তাহলে কিছুদিনের জন্য বেড়াতে যেতে পারে তাতে মন চেঞ্জ হবে

দুপুরে শুয়ে শুয়ে খুব চিন্তা করেছে একেবারে চলে যাওয়ার জন্য বিছানাপাটি, আলমারী আর কম্পিউটার টেবিল সহ ডেস্কটপ পিসি এতসব কিভাবে নেবে এর চেয়ে বরং বাসাতেই থাকা ভালো খাবেনা মা খেতে না ডাকলে খেতেই বসবেনা

শুয়ে শুয়ে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা তারপরে রাত দশটা বেজে গেলো ওদের বাসার ডিনার টাইম মা আর বাবা খেতে বসেছে বাহ্, আমি যে এদিকে না খেয়ে বসে আছি কেউ তা খেয়ালই করছেনা! বেশ! আমি আজ থেকেছি কাল সকালেই যেদিকে দু'চোখ যায় চলে যাবো আর নয় ভেবে লোপা গায়ে জ্বর নিয়ে ফুলতে থাকলো

মা একবার উঁকি দিয়ে গেলো খুব কাছে এসে বললো, ক্ষিদে লাগলে যে সহ্য করতে পারেনা মাথা ঘুরায় জ্বর এসে যায় সারাদিন ধরে না খাওয়ার কি হলো?

ওহ্! এতক্ষনে হুঁশ হইছে! লোপা তবুও শুয়ে থাকে শোয়া থেকে ওঠেনা একটা মাত্র মেয়ের সাথে কথা বলার সময় হিসেব করে বলা যায়না! তো মানুষ না! রোবোট যা খুশি তাই বলে যায়!

বাবা খাবার টেবিল থেকে উঠে আসে না খাইয়া রইছো ক্যান? বাসায় একটা দুইটা মানুষ! কথা না বলার কি হইলো খায়া ন্যাও বলে দাঁড়িয়েই থাকে

লোপা শোয়া থেকে উঠে বাথরুমে ঢুকে যায় বাইরে থেকে লোপার জলে মুখ ধোয়ার শব্দ ভেসে আসছে

(সমাপ্ত)

কোন মন্তব্য নেই: