রবিবার, ৮ মার্চ, ২০১৫

বই সমালোচনামূলক প্রবন্ধঃ “শুধু প্রিয় নয়, এর চেয়েও বেশি”



নিজে চিত্রশিল্পী বলেই কিনা জানিনা, রঙিন রঙ আমাকে সবসময় আকৃষ্ট করে এই আকৃষ্টতা প্রভাব ফেলে প্রিয় পোশাক শাড়ি বা সালওয়ার কামিজ পছন্দের ক্ষেত্রে সারা বছর আমার কোন না কোন পোশাকে বিরাজ করে বসন্ত অথবা সুনীল আকাশের বিশালতা অথবা, রক্তলাল জবা বা পলাশ ফুলের রক্তিম আভা
রঙ এর প্রেম সীমা ছাড়িয়ে যায় বই সংগ্রহের সময়েও বই এর প্রচ্ছদ! বছর কয়েক হলো সারা বছর অন্যান্য বই নীলক্ষেত থেকে কিনলেও একুশে বইমেলা হতে শুধু ব্লগারদের লেখা বইই কেনা হচ্ছে সারা বছর বিশেষ বিশেষ ব্লগারের বইগুলো নাগালে পাওয়া যায়না আবার, কিছু কিছু ব্লগীয় বই একুশে বইমেলার পরে আর পাওয়াও যায় না এই বইগুলো সংগ্রহের একটা তাড়া থাকে মনে প্রাণে
কবিতাকে মোটামুটি কাঠখোট্টা বলে মনে হওয়ায় সেদিকে না ঝুঁকে বরং বেশি বেশি গল্পের বই সংগ্রহের প্রতি আমার ঝোঁক থাকে বরাবরই আর সেই তালিকায় ওই বইগুলোই বেশি প্রাধান্য পায় যারা তাদের রঙ দিয়ে আমার হৃদয় জয় করে নেয় এবারেও তাঁর ব্যতিক্রম হলোনা আমার লেখালেখি শখের নতুন দিগন্ত গল্পকবিতাডটকম এরগল্পকবিতা সংকলন”, মামুন আজিজ এর গল্প সংকলনউদঘুট্টিএবং তরুণ একদল লেখক লেখিকার লেখক সংগঠনসংকাশএর গল্প সংকলননৈঃশব্দের শব্দযাত্রাহয়ে উঠলো ২০১২ সালের একুশে বইমেলা থেকে সংগ্রহ করার মতন তিনটি বই প্রথম বইটি তাঁর প্রচ্ছদ দিয়ে মুগ্ধ করতে না পারলেও কি ধরনের লেখা ওই বইটিতে স্থান পেয়েছে তা জানতেই মূলত বইটি কেনার ইচ্ছে পোষণ সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট হলাম সংকাশের বইটি নিয়ে কয়েক রকম নীল এর দারুন সম্মিলন এই বইটি আমাকে সংগ্রহে রাখতেই হবে বইমেলা চলাকালীন সময়ে অফিস পড়াশুনা নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ততা সেই সাথে শরীরের অসুস্থতার কারণে নিজে যেতে না পারলেও অন্যের হাত ধরে বইটি ঠিকই সংগ্রহ করে ছাড়লাম।

নতুন মা যেমন পরম মমতায় নিজের সন্তানকে কোলে তুলে নেয়, তেমনি স্নেহে আমি হাতে তুলে নেই সংকাশ গল্প সংকলন বইটি যতবার পড়তে ইচ্ছে করে ততবার ততবার এই স্নেহানুভূতি কাজ করে আমার ভেতরে খুব ধীরে নিঃশব্দে আমি এর কভার খুলে ভেতরে উঁকি দেই বাঁ পাশে তাকাই মুগ্ধ হয়ে ফ্ল্যাপের কথাগুলো পড়তে থাকি
বয়সের তফাৎ আছে, তফাৎ আছে পেশায়-কাজে পরিবেশ আর পারিপার্শ্বিকতাও নানারূপ কেউ দেশে, কেউ প্রবাসে, অনলাইন যোগাযোগ... কিন্তু সবাই একসাথে মিলেছে সকলেই মননশীল কেউ কবিতা লেখেন, কেউ গল্প কেউ আবার দুটোই সাহিত্য চর্চার শুদ্ধ বাসনা সকলকে একসূত্রে বেঁধেছে সেই বাঁধনের মিলিত সুর - ‘সংকাশসংকাশ- একদল লেখক-কবির সংগঠন সংকাশ এর শ্লোগান - সংকোচহীন শব্দযাত্রা
নিঃশব্দে সংকাশের সাহিত্যিক বন্ধুদল লিখে চলে সমাজ, প্রকৃতি, বাস্তবতা আর কল্পনার কথা… “
আমি সন্তর্পণে আরো গোই পাতা উল্টাতে থাকি
শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মার প্রতি উৎসর্গ-এর কথাগুলো পড়ে চোখ ভিজে যায়! সংকাশ এর লেখকদের প্রতি শ্রদ্ধায়  নুয়ে আসে মন। আরো গভীর প্রেমে ডুবে যেতে থাকি
পরের পাতায়সূচিপত্রএর পরিবর্তেগল্পক্রমলেখাটিও দৃষ্টি আকর্ষণ করে
ভূমিকার কথাগুলো পড়তে থাকি রো মুগ্ধতা নিয়ে মনের মধ্যেনিজেও একদিন কি এই নবীন গল্পকারদের মত লিখতে পারবো?’ এই স্বপ্নের বীজ বপন হতে থাকে এই বইটিতে আমার নিজের কোন লেখা নেই লেখার জগতে পথ চলতে শুরু করেছি মাত্র। তবুও, মনে হতে লাগলো ক্রমশ সাহিত্য চর্চায় আমি কি কোন একদিন পারবোনা এদের সাথে এক কাতারে দাঁড়াতে! এই একদল বন্ধুপ্রতিম সাহিত্যানুরাগীর দলে ভিড়তে মনে চায় অন্ততঃ এদের সংস্পর্শে যদি লেখক হয়ে উঠতে পারি! মনের অজান্তেই মুচকি হেসে উঠি! তো এক ধরনের প্রতিভা! রঙ দিয়ে মানুষকে মুগ্ধ করা সহজ কিন্তু কলমের ডগায় চারিত্রিক বিশ্লেষণ পুরোপুরি ফুঁটিয়ে তুলতে আমাকে আরো বহুদূর হাঁটতে হবে।  

 “নৈঃশব্দের শব্দযাত্রাবইটি পড়া শুরু করেছি
প্রথম গল্পটি পড়লাম জন্মান্তরে শব্দরা/প্রজ্ঞা মৌসুমী’ আমি গল্পটির প্রতিটি লাইন মন্ত্রমুগ্ধের মতন পড়ে গিয়েছি গল্পের কিছু লাইন পড়ে খুব ভালো লেগেছে যেমন...
সাতদিন হলো আমার একটা বোন এসেছে কোত্থেকে যে এলো ঠিক বুঝতে পারি না তবে সবাই বলছে আমার বোন
ওই প্যারাটিও  মন ছুঁয়ে গেলো, “ ‘আমি নাম দিমুজোরে বলতে গিয়ে আরেকটা লজ্জার বাটখারা টের পেলাম- ... ... সাত আলোর ছোঁয়ায় কোমল এক মেয়ে শব্দের জন্ম হয়জবা’...”! ‘লজ্জার বাটখারাশব্দটি খুব ভালো লাগলো এমনকি, নিজের ভেতরেও সংক্রমিত হলো ছোট্ট বালকের লজ্জা
শেষ প্যারাটিও ...”জন্মান্তিক
শব্দের মিছিলটা কিন্তু থেমে থাকে না হয়তো কেউ শোএ না তবু তারা জানিয়ে যায়, ‘মাটিতে জেগে থাকে শব্দের কংকাল। ক্ষণোজন্মা শব্দরা ...”
গল্পের মধ্যে প্রত্যেকটা শব্দের বুনন শক্ত  বাঁধনে বাঁধা খুব ভালো লেগেছে বাকি গল্পগুলো এখনো পড়িনি তবে, মনে হচ্ছে এই গল্পটি দিয়ে শুরু হওয়া ...ভালোই হয়েছে অন্যরকম একটি গল্প
ধন্যবাদ , প্রজ্ঞা মৌসুমীকে এবং এই বইটির সম্পাদনা কমিটিকে যারা এই গল্পটিকে শুরুতে দিয়েছে।  


ভিন্ন ভিন্ন অনেক গল্প সম্বলিত বইয়ের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত এক নাগাড়ে এক সিরিয়ালে পড়ে শেষ করতে পারিনা আমি প্রিয় কোন চকলেট যেমন ভেঙ্গে ভেঙ্গে একটু একটু করে অনেক সময় ধরে খেতে ভালো লাগে, তেমনি গল্পের বইটিরও শুরু-শেষ-মাঝে হতে একেকটা গল্প বেছে বেছে অনেক লম্বা সময় ধরে পড়াটাই আমার অভ্যাস। যেন বইটি পড়া দ্রুত শেষ হয়ে গেলে খুব কষ্ট লাগবে। এরকম নতুন আরেকটি বই কাছেপিঠে না থাকার যন্ত্রণা হতে বাঁচার জন্যই বোধহয় এরকম চেষ্টা!  
যাহোক, প্রথম গল্পটি পড়ার বেশ কয়েকদিন পরে, বইটি হাতে নিয়ে ‘গল্পক্রম’এ চোখ বুলাতে বুলাতে চার নম্বর গল্পটা খুলে বসি
ফুল ফুটিয়ে গেল  শত শত/ ফাতেমা প্রমি
ফাতেমা প্রমি!  ‘প্রমি!  নামের ভেতরেই এক ভিন্নতা সেই ভিন্নতা তাঁর লেখাতেও
শুরুর কবিতাংশটি –
‘আমার যৌবনে তুমি স্পর্ধা এনে দিলে
তোমার দুচোখে তবু ভীরুতার হিম!
রাত্রিময় আকাশের মিলনান্ত নিলে
ছোট্ট এই পৃথিবীকে করেছ অসীম।‘  

-   কার লেখা? কবিতাংশটি কি সংগ্রহের নাকি নিজের রচিত? অসাধারণ! কথাগুলো।
প্রথম প্যারার শেষে এসে গল্পের চরিত্র অভিক এর আবির্ভাব! ‘অভিক’ নামটি বেশ ভালো লাগলো। আমি তো গল্প লিখতে গেলে চরিত্রের নাম খুঁজতে গিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে যাই। ফাতেমা প্রমি কি সুন্দর একটি নাম খুঁজে নিয়েছেন।
প্যারা ‘তিন’ এর শুরুটা পড়ে ধন্ধে পরে গেলাম! জঙ্গলে কি করছে অভিক? চার লাইনের পরে পঞ্চম লাইনেই বিভ্রান্তি কেটে গেলো। গল্পের ধারাবাহিকতায় খুঁজে পেলাম অভিককে।
শেষাংশ ‘ছয়’ এর প্রত্যেকটা কথাই খুব মন ছুঁয়ে গেলোসাধারণ কথা হলেও, প্রতিটি লাইনের সাথে পরের লাইনের বন্ধন খুব শক্ত। পাঠকের হৃদয়ে নাড়া দেয়। গল্পটি খুবই সুন্দর লিখেছেন ফাতেমা প্রমি। 

এর পরে কয়েকদিন আবারো কঠিন ব্যস্ততা! আজ আবার যেতে হবে এম্বেসীতেআগেও একদিন গিয়ে অপেক্ষারত আমি বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে পা ব্যথা করেছি শুধু। তাই আজ দ্বিতীয় দিন সংকাশের বইটি ও একটি আস্ত পত্রিকা পুরে নিলাম ব্যাগে। আজও যদি বাইরে দাঁড়িয়ে আমাকে রোদে সেদ্ধ হতে হয়, তাঁর চেয়ে বরং ফুটপাতে পত্রিকা বিছিয়ে বসে সংকাশে মুখ ডুবিয়ে রাখা ভালো হবে। আশেপাশের অপরিচিতের ভিড়ে একগাদা পুরুষের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা বড়ই অসহ্যকর!
বাংলাদেশের জ্যাম সময় নষ্ট করে খুব। কে জানতো আজ কম সময় লাগবে! আজ প্রয়োজনের চেয়ে প্রায় ঘন্টাখানিক আগে পৌঁছে গেছি! যার প্রয়োজনে আসা সে ভেতরে ঢুকে গেলে আমি সহযাত্রী, যথারীতি স্থান মিললো সেই ফুটপাতে। মিনিট দশেক রাস্তার পাশের ফুটপাতে বসবো কি বসবোনা দোনমনো করতে করতে হাতের ডান দিকে বেশ খানিকটা দূরে একজনকে পেপার ছড়িয়ে বসে পেপার পড়তে দেখে আর দেরী না করে নিজেও বসে পড়লাম। আর ব্যাগ থেকে বের করে নিলাম, বইটা। কোন গল্পটা আগে পড়বো? এই নির্বাচন চললো কিছুক্ষণ। প্রতিযোগিতায় জিতে গেল মামুন আজিজ এর  বাক্যবিলাস গল্পটি। প্রথমে গল্পটিকে খটোমটো সাহিত্য বলে মনে হলেও পড়া শুরু করতেই ‘নির্লিপ্ত’ নামটি বেশ আকর্ষণ করলো। সেই সাথে তাকে নিয়ে সেঁজুতি’র বাক্যবিলাস দুষ্টুমি পড়তে মন্দ লাগছিলো না। কিন্তু শেষে এসে সত্যি খারাপ লাগলো নির্লিপ্ত এর জন্য। বেচারা! আরেকজন এর মানসিক প্রবলেম দূর করতে গিয়ে নিজেই মানসিক সমস্যায় পরে গেলো। মামুন ম আজিজ এর রচিত ভিন্ন স্বাদের আরো একটি গল্প পড়ে তাঁর প্রতি ভক্তি বেড়ে গেলো আরো এক ধাপ

এরপরে এলাম ‘একমুঠো স্বপ্ন/ মৃন্ময় মিজান’ গল্পে। বইয়ের ১৪ নম্বর গল্প। পড়ছি মুগ্ধ হয়ে। ভালোই লাগছে। ভালোই লাগছে। ডালিম এর প্রেমের কথা কি জানবে নিতু? কখন জানবে? ভাবতে ভাবতে পড়ে চলেছি। এর মধ্যে নিতুর পছন্দের জন, গল্পে দ্বিতীয় পুরুষের আবির্ভাব! সেই সাথে আরো একটি নারী চরিত্রের। পড়ে চলেছি। মন্দ লাগছেনা।
৮৬ পৃষ্ঠার নিচের থেকে চার নম্বর লাইনে “... ভেফু সিনথিয়াকে নিয়ে গাছের ডালে চড়ে বসে ডালিম।“ এখানে ‘ভেফু’ কি? শব্দটি কি ‘ভেজা’ হবে? নাকি প্রিন্টিং মিস্টেক? লেখককে জিজ্ঞেস করে জানতে হবে।
যাহোক, আবারো পড়ে চলি। এর পরে কি হলো তা জানতে হবে। কিন্তু একি? চুমোচুমি! বন্যার মধ্যে! গল্পকার হুট করে এ কোন রোমান্টিকতায় নিয়ে এলেন পাঠককে! গল্পটা শেষতক ভালোই লাগলো।

পর পর দু’টি গল্প পড়া শেষ করে বই থেকে মুখ তুলে আশেপাশে নজর বুলাই। আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা, হেঁটে রাস্তা পারাপার হওয়া লোকজনের দিকে তাকিয়ে থাকি কিছুক্ষণ। তারপরে আবার বইটির ‘গল্পক্রম’এ চোখ বুলাই। কোন গল্পটি শুরু করা যায় এইবার!
হ্যাকিং গোল্ডওয়েজ/ নাজমুল হাসান নিরো” লেখাটি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নির্দেশিত ৯২ পৃষ্ঠা খুঁজে নিয়ে পড়তে শুরু করি।  খানিকটা পড়েই গোয়েন্দা গল্পের সুর টের পাই। গোয়েন্দা গল্প! ওয়াও! গোগ্রাসে পড়ে যেতে থাকি। মজা পেলাম, ছাগলের দুধের চায়ের কথা পড়ে!
অন্যের ইমেইল আইডি হ্যাক করার কথা শুনেছি। কিন্তু, গল্পকার নিরো তাঁর গল্পের চরিত্র দাদা’র কাজের যে কম্পিউটারিক বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর ভুলত্রুটি বের করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি শুধু সমাধান পেয়েই সন্তুষ্ট।
সময় কম দেওয়া ব্যবসায়ী হাজবেন্ডের চেয়ে মনের কথা শেয়ার করার একজন পরম বন্ধুর দরকার কোন কোন সময় অবশ্যই। এটা যে হাজবেন্ডগুলো কেন বুঝতে চায়না! নিজেই সমস্ত সময় দিতে পারলে তো সংসারে সন্দেহ করার মতন দ্বিতীয় পুরুষের আবির্ভাবই হয় না!  গল্পকার এর এই ধরনের মানসিকতার একটি গল্প সুন্দর ভাবে ফুঁটিয়ে তোলায় ভালো লাগলো। পরবর্তীতে লেখক সত্তার বাইরের বাস্তব মানুষটির সাথে কথা বলে ধন্ধে পরে গিয়েছি, এরকম একটি লেখা কি করে এই তরুণের মগজে পরিস্ফুটন হয়! সত্যিই অভাবনীয়! 

বন্ধ দরজা/ মাহাবুব মাহি”
সাধারণ ঘটনা! অনেক মেয়েই এইরকম ভালোবাসা পাওয়ার আশায় উন্মুখ থাকে। প্রেম এসেছে মনে করে অদ্ভুত রুচি ও মানসিকতার ‘আমান’ এর মতন মানুষের সাথে ঘর বাঁধে। সোনালী স্বপ্ন দেখে। তারপর, সেই স্বপ্নের মৃত্যু! মৃত্যু নতুন অতিথিরও।
চমৎকারভাবে ফুঁটিয়ে তুলেছেন গল্পকার গল্পটি! রক্তের মধ্যে বিদ্রোহ ছাপিয়ে উঠে ‘আমান’ এর মতন লোকদের প্রতি ঘৃণায়! “বন্ধ দরজা” নামটিও চমৎকার মানিয়েছে।
এর পরে যে দু’টো গল্প পড়লাম, তাতেও একই ধরনের বোবা কান্না উথলে উঠলো বুকের ভেতরে। এই ধরনের ব্যবস্থা হতে কবে মুক্তি  মিলবে এই সমাজের মেয়েদের? কথাগুলো যে দু’টি গল্প নিয়ে ---
৫নম্বর গল্পঃ “বিচার/ মনির মুকুল”
১১ নম্বর গল্পঃ “সমাধান/ তৌহিদ উল্লাহ শাকিল
মন খুব খারাপ হয়ে যায় এই ধরনের গল্প পড়লে। জানলে।


মাঝে আবার কয়েকদিনের বিরতি। প্রচন্ড পড়াশুনার চাপ। সপ্তাহে চারদিন ক্লাস করাটাও ইদানিং খুব কঠিন হয়ে পরেছে। ঝুপ করেই যেন মাঝের তিনটি দিন পার হয়ে যায়। এমনি শুক্রবারের এক দুপুরে ঘন্টাখানেকের ভাত ঘুম দিয়ে উঠে হালকা বাতাস বয়ে যাওয়া জানালার মিষ্টি রোদেলা আলোয় পর্দা ফাঁক করে বিছানায় আধশোয়া হয়ে প্রিয় বইটা হাতে নিলাম তুলে। প্রচ্ছদে কয়েক পলক মুগ্ধতার দৃষ্টি মেলে ধরে ধীরে ধীরে বইটি পড়ার আয়োজন।
পর পর চারটি গল্প পড়ে গেলাম; ৮, ৯, ১০ ও ২ নম্বর।
“বিভ্রম/ শাহীতাজ আক্তার”
স্বাভাবিক গতিতে শুরু হওয়া গল্পের দুই প্যারা পড়তে পড়তে ভাবছিলাম গল্পের নামকরণের উৎস কি! ফরহাদ এর বিভ্রম কি? রুমাকে যে নম্বরে ফোন করা হলো সেটা দেখে নিজেই বিভ্রমে পরে গেলাম! এটা কোন অপারেটরের নম্বর? এয়ারটেল? ০১৪...! জিরো ওয়ান ফোর দিয়ে কোন অপারেটরের নাম্বার হয়? নাকি ভুলে এক্টেল নাম্বার 018... এর ইংরেজী রূপ এর বাংলা লিখতে গিয়ে ভুল রয়ে গেছে? যাহোক সে পরে জেনে নেয়া যাবে!
আমি পড়ে যেতে থাকি। পড়তে পড়তেই নামকরণের ব্যাপারটা মাথায় ঘুরতে থাকে। বিভ্রম! কার বিভ্রম? ফরহাদের? রুমার? নাকি রুবার? দ্রুত পড়ে যেতে থাকি। শেষ থেকে চতুর্থ প্যারায় এসে চমক! কেন কি কারণে রুবাকে মারা হয়েছিলো তার পরিস্কার বর্ণনা দেওয়া নেই। হয়তো সে প্রয়োজনও নেই। তবে, ঝড়ের রাতে নিজের হাতে খুন করা মেয়েটির বিভ্রমে পড়েই ফরহাদ এর মৃত্যু!
এভাবে যদি সকল অপরাধের শাস্তি হয়ে যেত, তাহলে সবাই উদাহরণ হিসেবে এই ধরনের অপরাধ করাই ছেড়ে দিতো!
ভালো লাগলো গল্পের শেষ চমকটা!
“আরোহণ/ সাইফুল ইসলাম চৌধুরী (সূর্য)” এর গল্পটা পড়া শুরু করি।
ডঃ নিশুতি! নামটা কেমন অদ্ভূত! আর এক কারণেই হয়তো শুরুর দিকের ছোট্ট তিনটি প্যারা পড়লাম তিন তিন বার।
শেষ পর্যন্ত পড়তে পড়তে মনে হলো যেন ভালো করে বুঝতে পারলাম না গল্পটা। এটা কি সাইন্স ফিকশন? নাকি কল্পকাহিনী!
“সন্তর্পণে/ ইফতেখারুল ইসলাম”
তাঁর গল্পটির সাথে তাঁর প্রোফাইলের লেখা যেন মিলে যায় পুরোপুরি। তিনি বিশ্বাস করেন লেখালেখি করে রাতারাতি সমাজ পালটানো যায় না, তবে মানুষের মন পালটানো যায়, সেই পরিবর্তিত মন নিয়ে তাঁর পাঠকেরা একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করবেন।
ভালো লেগেছে শেষ প্যারার শেষ লাইনে এসে। ‘দ্বৈতসত্তার দ্যোতনা ছাপিয়ে তন্দ্রা নিজেকে বোঝাতে চায়, দুটি নিঃসঙ্গ মানব-মানবী কি একে অপরের ভালো বন্ধু হতে পারে না? হোক না সেটা সন্তর্পণে!’ ... গল্পের নামকরণ যেন সার্থকতা খুঁজে পেলো এর শেষ লাইনের শেষ শব্দে।
রক্ত/ আহমেদ সাবের

আমি শূন্যে ভাসতে লাগলাম। ... প্রথম প্যারা পড়েই মনে হলো, কেউ কি মরে গেছে? মরে যেতে যেতে সে তার অনুভূতি প্রকাশ করছে? গল্পটা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ধোঁয়াশা রয়ে গেছে গল্পটাতে! তবে, ধরনের ধোঁয়াশা গল্প লিখতে ইচ্ছে করে খুব পাঠককে ধন্দ্বে ফেলে দিতে মজা আছে!


১০
‘নৈঃশব্দের শব্দযাত্রা’ থেকে কয়েকদিনের বিরতিতে থেকে আবার হাতে নিলাম বইটি। ‘বোকারামের আত্মাচুরি’  গল্পটি বেশ লাগলো। গল্পের চরিত্রগুলোতে ভিন্নতা আছে। সুনেরী! আরুষ! আছে কাহিনী বিন্যাসেও।

“অন্তহীনের আহ্বানে... / তানভীর আহমেদ”
পড়া শুরু করে প্রায় শেষ প্যারার আগে পর্যন্ত মনে করেছি গল্পটা ভৌতিক! অথচ, এ যে নিজের পরলোকে গমনের প্রস্তুতি তা বুঝতে পারলাম, একেবারে শেষ মুহুর্তে এসে।
চমৎকার লেখা। অপূর্ব! তীক্ষ্ণ চিন্তা ভাবনার লেখক।
তাঁর গল্পটির একটি লাইনে সামান্য মিসটেক খুঁজে পেলাম। ৭১ পাতায় উপর থেকে ৭ম লাইনে “... একবার বসে পড়তে পারলে শুয়েও পড়াও সম্ভব হতো;...”

১১
আলোর প্রমিথিউস- প্রজেক্ট ডে লাইট/ আহমাদ মুকুল
গল্পের নামটি অন্যরকম! মনে হচ্ছিলো এটা যেন গল্প  নয় নিশ্চয়ই এটা কোন বিজ্ঞান সম্পর্কিত মাথামোটা প্যাঁচাল! এটা বাদ থাক! পড়বোনা এরকম বিতৃষ্ণা ছিলো প্রথম দিকে অনেক কষ্টেএকপড়ে শেষ করেদুই ঢুকেই যেন বোধগম্য হলো, আরেহ! নতুন ধরনের লেখা! বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে অবশ্যই তবে, একজন সরকারি কর্মকর্তার দাফতরিক কলম পেষার ফাঁকে এরকম শৌখিন শব্দ বের হয়ে আসা সত্যি অবাক করেছে আমাকে

এর পরে প্রায় মাস তিনেক পরে সংকাশ খুলে এলাম পড়ন্ত বিকেলবেলার সেই মেয়ে/ শামসুল আরেফীনগল্পে
স্বপ্নবিলাসী গল্পকার শামসুল আরেফীন এর গল্পেও তাঁর প্রভাব বিদ্যমান গল্পটি যেন ঠিক গল্প নয়, স্বপ্নীল কিছু!

লবণ/ জায়েদ বিন জাকির (শাওন)”
এই গল্পে নারী চরিত্রের কিছু বিশেষ দিক যেমন নতুন মা এর শারিরীক বৈশিষ্ট্য, এত সুন্দর ভাবে ফুঁটিয়ে তোলা হয়েছে পড়ে সত্যিই অবাক হয়ে গিয়েছি গল্পের শেষাংসের কথাগুলোও দক্ষ লেখনী প্রতিভা না থাকলে লেখা হয়ে উঠবার কথা নয়; “কেউ দুধ খাইয়া ঘুমায় আর কেউ লবণ খাইয়া ঘুমায়”! দারুন কথা! দারুন চিন্তাশক্তি লেখকের

১২
আমি বইটি হাতে নিয়ে পেনসিল নিয়ে দাগাতে বসে যাই কোন গল্পটি বাকি রয়েছে এখনো আমি তাড়াহুড়া করতে থাকি আমাকে যে এইসব পাঠানুভূতি লেখকের দ্বারে পৌঁছাতে হবে দেরী হয়ে যাচ্ছে যেন! শুধু প্রজ্ঞা মৌসুমীর গল্পটির কথা একটুখানি ফেসবুক আড্ডায় প্রকাশ করেছিলাম তাতে সবার মধ্যে যে উচ্ছ্বাস দেখেছিলাম, আমার যে বাকি সবার কথাই বলতে হবে সমালোচনা নয় পাঠানুভূতি! এক আনাড়ি সমালোচক হলেও গভীর সাহিত্য প্রেমীর পাঠানুভূতি

নৈঃশব্দের শব্দযাত্রা একুশটি গল্পের মধ্যে আর মাত্র চারটি গল্প পড়া বাকি  
·         শুন্যতার বৃত্তে/ রওশন জাহান
·         শীতক্ষণ/ খন্দকার নাহিদ হাসান
·         একুন রহমত আলী
·         মঞ্জিলা/ মোঃ আক্তারুজ্জামান
আমার ট্রেন ছুঁটে যাচ্ছে আমাকে ট্রেনের বগিতে উঠে পরতে হবে আমি দ্রুত যতটা সম্ভব মনোযোগ দেয়া যায় তাড়াহুড়োয় চোখ বুলিয়ে নিয়ে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে উঠে পরি ল্যাপটপ নিয়ে লেখার ট্রেন ছুটে চলে যাবে আমার পাঠানুভূতির, নৈঃশব্দের শব্দযাত্রা প্রতি প্রেমানুভূতির প্রতিটি ভালোবাসার বিন্দু আমাকে দ্রুত গেঁথে নিতে হবে অক্ষরের বুননে, কথামালায়


সবশেষঃ
চিত্রশিল্পী হলেও প্রচ্ছদ শিল্পীর কাজ করা হয়ে ওঠেনি এখনো। কিন্তু, ধীরে ধীরে প্রচ্ছদশিল্পী আইরিন সুলতানা এর প্রচ্ছদের ভক্ত হয়ে উঠছি।
বইটির ‘শুরু থেকে শেষ’ সবকিছুই ভালো লেগেছে। শুরুতে অক্ষরের ছোট আকৃতি নিয়ে একটু বিরক্তি আসলেও ক্রমাগত প্রতিটি গল্পের মুগ্ধতা আমাকে সেই বিরক্তি ভুলিয়ে দিয়েছে। বইটিতে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে যেটা, সংকলন বইয়ের মধ্যে বানান বা লাইনের ত্রুটি থাকে। কিন্তু এই বইয়ের মধ্যে সেরকম বর্বর ভুল চোখে পরেনি।
এলেবেলেভাবে পড়ে বানানো কথা কাউকে তোষামোদ করে বলতে আমার কখনই ভালো লাগেনা। আমি যে কয়টি গল্প মন দিয়ে পড়তে পেরেছি সে কয়টি সম্বন্ধে আমার পাঠানুভুতি, বইটির প্রতি আমার প্রেমাবেগ তুলে ধরেছি শুধু। এই সামান্য কথাগুলোই যদি মূল লেখকদের সামনে চলে আসে, এই ‘অ-লেখক’কে দোষ দেবেন না।
এই পর্যন্ত যত ব্লগারদের সংকলন কিনে সংগ্রহে নিয়েছি আমার মনে হয়, এই বইটি প্রচ্ছদ, পৃষ্ঠার মান ও সবধরনের শুদ্ধিতায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এরকম বই আরো বেশি বেশি কাগুজে পাঠকের দাঁড়প্রান্তে আসুক, এই শুভকামনা রইলো। বইটির সম্পাদনা ও প্রকাশক গোষ্ঠীকে সবিশেষ ধন্যবাদ।

         (সমাপ্ত)

(লিটল ম্যাগ সংকাশ এর প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত)

কোন মন্তব্য নেই: