শনিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১২

ফেসবুক বন্ধুতা ও একটি ভুল


নতুন নতুন বন্ধু যোগ করতে, তাদের সম্পর্কে জানতে শর্মীর খুব ভালো লাগে। তাই নিজের রিলেটিভ ছাড়াও ফেসবুক এর অন্য বন্ধুদের তালিকা থেকে বা হোম পেজ এ দেওয়া 'বন্ধু হিসেবে যোগ করতে পারেন' এমন কাউকে দেখলেই নাম কিংবা প্রোফাইল পিক দেখে পছন্দ হলে যোগ করে নেয় বা বন্ধুতার অনুরোধ পাঠায়। এমনি করে জানা অজানা অনেক বন্ধু ওর।

বড় আপা বলে, “তুই এতসব অচেনা লোককে কেন যোগ করিস? সবাই সমান নয়। আজেবাজে লোক দিয়ে এইসব জায়গা ভরা থাকে। ঝামেলা যখন বাঁধবে বুঝবি তখন ঠেলা!”

কিন্তু, শর্মী কখনো এসব কথায় পাত্তা দেয়না। এদের কারো কাছ থেকে কোন অপ্রীতিকর কিছু কখনোই সে পায়নি তো।
দেশে বিদেশে ওর বন্ধুতা লিস্টে থাকা বিভিন্ন বয়সী নানান নারী-পুরুষ বন্ধুদের কারনে ওর উপকারই বেশি হয়েছে। এইসব নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে নিজের জ্ঞানের পরিধি বেড়েছে। একেক মানুষের একেক অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শেখা হয়।

তবে, সবাই'ই যে ভালো তা নয় অবশ্য। কিছু মানুষ আছে আজাইরা বকবক করে ওর মাথাটা খেয়ে নিতে চায়। এরকম হলে ও ফ্রেণ্ড লিস্ট থেকে ওদের বাতিল করে দেয়। তাও আবার জানিয়ে, “দেখুন ভাই, আপনাকে না আমি সহ্য করতে পারছিনা! মাফ করবেন। আপনাকে ডিলিট করে দিচ্ছি”- এই বলে। এরকম করে অবশ্য ওর বেশ হাসি পায় নিজের কান্ড দেখে!! মুছে দিবি দে, আবার জানানো কেন!!!

সেদিন রাতে এক অদ্ভূত কাণ্ড হয়েছে। ফেসবুক এর ম্যাসেজ ইনবক্সে দেখে এক তরুণ ওকে ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। ওরই বয়সী হবে। ওকে বন্ধু হিসেবে যোগ করার অনুরোধ জানিয়েছে। শর্মী একটু অবাকই হয়ে গেলো, “বন্ধু হিসেবে যোগ করতে ইনবক্সে ম্যাসেজ দিতে হয় নাকি? রিকোয়েস্ট পাঠালেই তো চলে।“ লোকটা সম্পর্কে কৌতূহল হলো। তবু, যোগ করার আগে লোকটার প্রোফাইল ঘেঁটে দেখে নিলো। যতটা দেখা গেলো তাতে সন্দেহজনক কিছুই নেই। যাহোক সে নিজেই বন্ধুতার রিকোয়েস্ট সেন্ড করে দিলো। দেখাই যাক না! খারাপ হলো পরে না হয় ডিলিট করে দেওয়া যাবে!

লোকটাকে ফ্রেন্ড লিস্টে নেয়া ও ভালো করে প্রোফাইল এর সবকিছু ঘেঁটেঘুঁটে দেখতে দেখতে বেশ রাত হয়ে গেলো। কিছু বাকি রয়ে গেছে। লোকটা কোত্থেকে ওর নাম পেয়েছে বার বার জিজ্ঞেস করেও ও এখনো উদ্ধার করতে পারেনি। কিন্তু, রাত বেশি হয়ে যাওয়ায় ঘুমোতে হবে। “থাক, সকালে উঠে দেখে নেবো বাকিটা বা কয়েকদিনের কথাতে নিশ্চয়ই লোকটা নিজেই জানাবে” ভেবে শর্মী ঘুমোতে চলে গেলো। কিন্তু, যা তার আর কোন সময়েই হয়নি। আজ কেন যেন শুয়েও শান্তি পেলোনা ও। মনের ভেতর খচখচ করতে লাগলো!



সকাল থেকে শর্মীর অনেক ব্যস্ততা। বোনের বাচ্চা দুটোকে স্কুলে দিয়ে আসতে হয়। আবার নিয়েও আসতে হয়। বোন-দুলাভাই দুজনেই চাকুরী করে। অফিস সামলে এসব করাটা একটু কষ্টকর হয়ে উঠে। আর, শর্মীও পড়াশুনা শেষ করে অবসর বসে আছে। তাই এসবে তার কোন বিরক্তি হয়না।

কিন্তু, রাতে ভালো ঘুম হয়নি। ভোরবেলাতেই ও শোয়া থেকে উঠে পরেছে। অন্যান্য দিন যা সে কখনো করেনা, আজ সকালে নাশতা না খেয়েই আগে নেট কানেকশন লাগালো।

ফেসবুক লগ ইন করে দেখে, ইনবক্সে একটা ম্যাসেজ। মাউস ড্রাগ করে ম্যাসেজ ওপেন না করেই যতটূকু পড়লো, “আপনার অনুমতি ছাড়াই আপনার ছবি ব্যবহার করার জন্য দুঃখিত।“- সুজয় আহমেদ।

কাল রাতের সেই লোকটা। ম্যাসেজটার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝলোনা। “যাক্, রাতে অস্থিরভাবে না ঘুমনোর মত কোন কারণ ঘটেনি। অযথাই সন্দেহ করেছিলো!“



লামিয়া ফোন করেছে। বেলা ১২টা বাজে।
- সিদ্ধেস্বরী কলেজের সার্কুলার হয়েছে। গণিতে টিচার নেবে। সার্কুলারটার বিস্তারিত তুই ইন্টারনেট থেকে দেখে নিস। ফোনে তো এত ডিটেইল বলা যায়না। আর, বললেও সবটা তুই বুঝবিনা।
-আচ্ছা ঠিক আছে, দেখবো। বলে মিষ্টি করে হাসলো শর্মী।

নেট কানেকশন লাগিয়ে ফেসবুক, ব্লগ সব জায়গাতেই লগইন করে আগে জরুরী কাজ কমপ্লিট করলো। সার্কুলার দেখলো।
তারপরে, ফেসবুক এর ওয়ালে চোখ পরলো। দেখে কে যেনো একটা ভিডিওতে ট্যাগ করেছে ওকে। এরকম হরহামেশাই কেউ না কেউ ফটোগ্রাফিক ছবি , কবিতা বা নোটস এ ওকে ট্যাগ করে। এসবের সবই সময়মত ওর দেখাও হয়না। কমেন্ট ও করা হয়না।

কিন্তু, আজই হঠাৎ ওর এই ভিডিওটা দেখার শখ হলো। কারণ ওটা গানের ভিডিও। গান তো শর্মীর ভীষণ পছন্দ! "কেন দূরে থাকো, কেন আড়াল রাখো/ কে তুমি কে তুমি আমায় ডাকো..." গানটা লোড করে কানে হেড ফোন লাগিয়ে ও শুনতে শুনতে ভাবলো- “নাহ্, গানটা মন্দ লাগছে। ভিডিও গান!! বাহ! ভালোই। “ শুনতে শুনতে ও ভিডিওটি দেখতে দেখতে... ভিডিওটার মাঝ বরাবর এসে ওর মাথা গরম! “ওওওহ, নো!!!” ভাগ্যিস খেয়াল করেছিলো! এতক্ষণে ইনবক্সের ওই ম্যাসেজটার অর্থ পুরোপুরি বোধগম্য হলো। লোকটা এই রোম্যান্টিক গানের মধ্যে একটি ছেলে আর একটি মেয়ের ছবি এটাচ করেছে। গানের সুরে সুরে মেয়ের ও ছেলেটার ছবি মাঝে মাঝে পর্দায় ভেসে উঠছে। ছেলের ছবিটা ওই লোকের। আর, মেয়েটা অন্য কেউ নয়। শর্মীর! এই ভিডিও দেখে মনে হয়, প্রেমিক প্রেমিকার ভূমিকায় যেন ওই তরুন-তরুনী! তার উপর ওই ভিডিও এর নিচে যাদের ট্যাগ করা হয়েছে তাদের কয়েকজনের কমেন্ট।

- মৃন্ময় হাসানঃ কি রে সুজয়, এতদিনে মনে হয় ভালোবাসার রাণী পেয়েছিস?
- লোপা হায়দারঃ গানের সাথে ভিডিওটা বেশ লাগছে!
- সুজয় আহমেদঃ হ্যারে মৃন্ময়, তুই ঠিক ধরেছিস! @ধন্যবাদ, লোপা।
- পিঙ্কিঃ ভালো লাগলো। কংগ্র্যাটস্ সুজয়!
- সুজয় আহমেদঃ থ্যাংক্স পিঙ্কি।


এই দৃশ্য যদি পরিবারের কারো চোখে পরে তাহলে কি হবে ভাবতেই ভয়ে কেঁপে উঠলো ও। এখন কি করবে ও? ওই লোকটাকে এখন সামনে পেলে ও কাঁচা খেয়ে ফেলতো!!! শয়তান!! এই ছেলেগুলোর হয়েছে এক স্বভাব, এদের বসতে দিলে মাথায় চড়ে বসে!!! “এরকম একটা কাজ কিভাবে করতে পারলো?” “ওওহ, আমি এখন কি করবো??”

পরবর্তী কয়েকটা ঘন্টা ও'র অন্য সব কাজ মাথায় উঠলো। ‘কিভাবে এই ভিডিও ডিলিট করা যায়’ সেরকম কোন অপশন পেলোনা। তাতে মাথা গরম হয়ে উঠলো আরো। কি করা যায়! কি করা যায়!

‘ফেসবুক অথরিটি’ বলে একটা বিষয় আছে এই ব্যাপারে ওর একটা ক্ষীণ ধারণা থাকলেও সেটা কিভাবে করতে হয় তা জানা নেই।

দুপুরের দিকে সুজয় আহমেদকে অনলাইনে পাওয়া গেল। ও রিকোয়েস্ট করলো ভদ্রভাবে। কারণ মা বলে, শত্রুর সাথে খারাপ ব্যবহার না করে মোলায়েম ভাবে কথা বলতে হয়। নইলে শত্রু ক্ষতি করে। যাহোক মিস্টার সুজয় ওটা ডিলিট করে দিবে বলে আশ্বস্ত করলো।

বিকেলে সে আবার চেক করে দেখে, কিসের কি। ঐটা তো বহাল তবিয়তেই আছে!

এবার আর ও চুপ করে থাকতে পারলোনা। লোকটাকে হাজার ভাবে বুঝালো, “ভাইয়া প্লিজ, ওটা মুছে দিন।“

রাতে আপু ও দুলাভাই অনলাইনে বসে। তাছাড়া দেশে বিদেশে ওর আরো কত আত্মীয় থাকে। ওদের কেউ যদি দেখে ফেলে ভিডিওটা, তারপরে বাসায় জানিয়ে দিলে কেয়ামত হয়ে যাবে। কারন- ঐটা ওর ওয়ালে একেবারে প্রথমেই অবস্থান করছে।



লোকটাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে যখন কিছুতেই ক্ষ্যান্ত করতে পারলোনা, ও তখন ফেসবুক ওয়ালে একটা নোটিশ দিয়ে দিলো,

“বন্ধুরা, আমি একটি বিপদে পরেছি। আমার অনুমতি ছাড়া একটি ভিডিওতে সুজয় আহমেদ নামের এক তরুন আমার ছবি এটাচ করেছে, কিভাবে এ থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়? সাহায্য করুন, প্লিজ!”

একই ধরনের ম্যাসেজ ঐ ভিডিওটির নিচে অন্য যারা কমেন্ট করেছে সেখানেও সে দিয়ে দিলো যাতে অন্য ট্যাগধারীরাও জেনে যায় বিষয়টা।

ফেসবুক একাউন্টে ‘হেল্প’ অপশনে গিয়েও একটা ডায়রী করলো। এর মধ্যে সুজয় আবার অফলাইনে। যখন অনলাইনে আবার তাকে দেখা গেলো, শর্মী বুঝে গেলো এই লোককে শায়েস্তা করতে অন্য পথ ধরতে হবে! তাতে কাজ হলে হতেও পারে! লোকটা যা করেছে তা একধরনের প্রপোজালই বলা যায়! অদ্ভূত ভিন্নতা সে আবেদনে!

সে ম্যাসেজ অপশনে গিয়ে ম্যাসেজ দিলো সুজয়কে,

“আপনি যে কাজটা করেছেন, একটু ভেবে দেখুন তো, আমার হাজবেন্ড দেখলে সে কি মনে করবে?”

অনেকক্ষণ কোন উত্তর নেই। এর আগে বেশ কিছুক্ষণ মেসেজ-পাল্টা মেসেজ দেওয়া-দেওয়ি চলছিলো।

এর মধ্যে সে আবার চেক করে দেখলো ভিডিওটা। দেখে, সারাদিনের তীব্র মাথার যন্ত্রণাটা দূর হয়ে গেলো। হাসিতে ঝলমল করে উঠলো ওর সুন্দর মুখটা। শেষ ট্রিকসটা কাজে লাগলো তাহলে! ওকে ম্যারিড ভেবে সুজয়ের প্রেম উধাও!

সারাদিন অনেক কড়া কথা শুনিয়ে ফেলেছে সুজয়কে। রাগে। তা না করেই ওর উপায় কি ছিলো! লোকটা অন্য কোনভাবে প্রস্তাব দিতে পারতো। তা না করে যেটা করেছে তা খুবই অবিবেচকের কাজ! একটা ভদ্র ঘরের মেয়ের সম্মান জড়িয়ে আছে এটা সে বুঝবেনা? ও তো আর কোন মডেল বাঁ সেলিব্রেটি নয়, ওর ছবি কেন একজন অচেনা ছেলের সাথে ভিডিওতে থাকবে!!

এখন বিপদ কেটে যেতেই লোকটাকে ধন্যবাদ জানাতে ইচ্ছে করলো। হাজার হোক, ও তো অভদ্র নয়। ওর ম্যাসেজ এর উত্তর এলো, “উফ্, আপনি একটা অসহ্য! ক্যানো জ্বালাচ্ছেন?”

কয়েক সেকেন্ড পর ফেসবুক এর অন্যান্য জায়গা ঘুরে এসে ওর বলতে ইচ্ছে হলো, “আমি কি আপনাকে জ্বালিয়েছি নাকি আপনি সারাদিন আমাকে জ্বালালেন?” কিন্তু, ওই লোকের নামে ক্লিক করে মেসেজ দিতে চেয়ে দেখা গেলো, লোকটা ওর ফ্রেন্ড লিস্টে নেই। লিস্ট থেকে নিজেই ওকে মুছে দিয়েছে।

শর্মীর মুখের কোণে মুচকি হাসি দেখা গেলো। “যাক, বাঁচা গেলো! জঞ্জাল নিজেই পথ পরিস্কার করে বিদায় নিয়েছে।“


পরিশেষঃ

এই ঘটনার পর শর্মীর একটা উচিত শিক্ষাও হয়েছে। “লোকটার অবশ্যই কোন খারাপ উদ্দেশ্য ছিলোই। নইলে নিজে বন্ধুতার অনুরোধ না পাঠিয়ে কেন ওকে দিয়েই সেটা করিয়েছে? আর, এক রাতের মধ্যেই এমন একটা অঘটন কেন ঘটিয়েছিলো?” অনেক ভেবেও এর কোন সদুত্তর পায়নি ও। তবে, এর পর থেকে ও আর অচেনা কাউকে ওর ফ্রেণ্ড লিস্টে যোগ করেনা। এমনকি ওর ফেসবুক এর সমস্ত কিছুতে ও রেস্ট্রিকশনও দিয়ে দিলো যেন ইচ্ছে করলেই কেউ আর ওকে দেখতে না পায় বা ওর সম্বন্ধে বেশি কিছু তথ্য না পায়। আর নিজের অনেক ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্যও ও সেখান থেকে সরিয়ে ফেলে বাস্তব জীবনের সাথে একটা সীমারেখা টেনে নিলো।

একটি ঘটনা ওর সরল সাধারণত্ব পালটে ওকে অনেক কঠিন করে দিয়েছে।

মঙ্গলবার, ১৯ জুন, ২০১২

“অনুভবে শব্দের মিছিল”





“অনুভবে শব্দের মিছিল”
--------জাকিয়া জেসমিন
              ১৯ জুন ২০১২

জানালার ধার ঘেঁষে শব্দের মিছিল ঘররর...ঘররর...ঘররর ঘররর
চলছে একটানা সেলাই মেশিন, পা মেশিনে সুর বেজে চলে একটানা বিরামহীন,
নতুন দালান উঠোবার প্রস্তুতিতে তার পাশে চলে পুরনোকে ভেঙে গুড়ো করার প্রস্তুতি, গাছের পাতার দোলা ঝিরি ঝিরি বাতাসে, জানালার ধার ঘেঁষে বসা বাজারে মেছুয়া গন্ধে তোলে কাকের হুটোপুটি, খরিদ্দারের চটির শব্দ পায়ে!

জানালার ভেতর দেয়ালের ঘরের প্রতিটি বিন্দু জুড়ে চলে শব্দের গান। পর্দাগুলো নর্তকী ন্যায় দুলছে, দুলছে; দুলে দুলে হাত নেড়ে ছোয়াছুয়ি খেলে যায়, দেয়ালের সাথে পর্দার মিতালী। ক্যালেন্ডারের পাতায় পাতায় চুমোচুমি। গানের ও নাচের মুর্ছনায় মুগ্ধ মাতাল দেয়াল কান পেতে শুনে ওদের শব্দের সুরতান।

বাহিরে দূরে ঠক ঠক শব্দ, কানে ভেসে আসছে ঐ! মাঝে মাঝে থেমে যায়, মিশে যায় প্রকৃতির আহ্বানে; সবাই চুপ চাপ, বসেছে যেন মজলিশ; কথার বাগানে পুনরায় ওঠে ঝড়, কিচি কিচি...হোওওও...রে রে রে...! শব্দের মিছিলের নাম নেই। নেই গন্ধ! আছে শুধু সুরতান, অদ্ভূত নেশা ধরা গান, বেজে চলে; থেমে যায়।

মাঝে মাঝে পথ চলতি মানুষের একটা দুটো কথা। শিশুর কলরব। সাইকেল, রিকশার টুনটুন ঘন্টির আওয়াজে। মাছের বাজারের দরকষাকষি। পেঁয়াজ ওয়ালার হাক, ঐ পেঁয়াজ, পেঁয়াজ নেবে পেঁয়াজ! সওব সুর এক সাথে মিশে তৈরী করে দৃশ্যের পরে দৃশ্যপট শব্দের ঐকতান।   

--- ০---

সোমবার, ১৮ জুন, ২০১২

“নীলে হারায়”





।।এক।।
নীল, তুমি এমন কেন? তুমি কি একটুও আমাকে বোঝ না? তোমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য, তোমার হাতে হাত রেখে পথ চলার জন্য, তোমার লোমশ বুকে মুখ ঘষবার জন্য আমার মনটা আকুলি বিকুলি করে! তোমার সেই প্রশ্নটা "বিয়ে করছো না কেন?" উত্তরটা কি জানো না তুমি নাকি হেঁয়ালি করো? বিয়ে তো করতেই চাই। চাই একটি সাজানো গোছানো সংসার। কিন্তু, বিয়ের প্রস্তাবগুলো এলে মনে হয়, না না, আমার এখন বিয়ে করার অবসর নেই। আমার আরেকটু সময় দরকার। আরেকটু!

তুমি তো জানো না সারাদিন কতটা মিস করি তোমায়। সকালে ঘুম হতে জেগে কম্বলের ভেতরে হাতরে খুঁজে বের করি আমার মোবাইলটা আর ঘুমে অন্ধ চোখেই তোমাকে জানাই 'সুপ্রভাত'! তুমি হয়তো তখন রাত জেগে লেখালেখি করে বেশ দেরীতে ঘুমিয়েছো। আমি যখন তোমায় নক করেছি, তার কিছুটা পরে বিছানা ছাড়ার সময় হয়তো তোমার। এস এম এস টা পাঠিয়েই ফোনটা সাইলেন্ট করে দেই আর কিছুটা শংকিত হই। এই হয়তো তোমার ফোন আসবে আর ঝাড়ি খেতে হবে, "কেন করো এইসব?" তোমার ঘুম জড়ানো বিরক্তির লেশ পড়া মুখ মনে করি আর মনে মনে 'সরি' জানাই তোমাকে, "এবারটা ক্ষমা করো প্লিজ"তোমার ছবিতে একটা চুমু এঁকে মোবাইলটাকে বালিশের নিচে ঢেকে রেখে চলে যাই ফ্রেশ হতে। দাঁত ব্রাশ করতে আর মুখ ধুতে ধুতে ভাবতে থাকি, ফিরে তোমার মিসকল বা এস এম এস পাবো। কিন্তু, ভাবাই সারা!! নাই কোন ফোন, নাই কোন বার্তা।

সকাল আটটা পনেরো, এর মধ্যে স্কুলে পৌঁছে সাইন করতে হবে। এখনও বাসার কেউ জাগেনি। আমাকে এখনই নাশতার ব্যবস্থা করতে হবে, নিজের খাওয়া শেষ করে টিফিন রেডি করে নিজের সাজুগুজু শেষ করতে হবে। তাড়াতাড়ি কয়েকটা রুটি বানিয়ে সেঁকে নিলাম আর তোমার জন্য পরোটা-ডিম ভাজি। আসলে সবই আমার জন্যই। কিন্তু, আমার ভাবনায় তুমি সারাক্ষণই। তাই, আবার একটি এস এম এস করলাম, "নাশতা রেডি, তাড়াতাড়ি চলে এসো, সব জুড়িয়ে যাচ্ছে!" তুমি হয়তো তখন উঠেছ, অফিস যাওয়ার জন্য নিজেও নাশতা খেতে বসেছ, বা গোসল সেরে পোশাক পরছো। যাই হোক, তুমি আমার সাথে থাকলেই কি আর না থাকলেই কি, তোমার ছায়া তো আমার সাথেই থাকে!

নাশতা সেরে আলমারি খুলে কয়েক পলক থমকে থাকা। তুমি শাড়ি চুজ করে দিলে, আমি সেটা পরতে শুরু করলাম। পাজি ! নচ্ছার! চেয়ে দেখ কি! তুমি দেখছ ভেবে গালে টোল পরা লজ্জিত চোখ মুখে হাসির ঝিলিক! আয়নায় নিজেকে দেখে শাল জড়িয়ে কাঁধে ব্যাগটা নিয়ে অদৃশ্য তোমাকে মনে মনে, " চলো, বেরিয়ে পরা যাক!"

রাতে ঘুমোতে যাবার সময় ভাবি, "এসো তো আর রাত জাগতে হবেনা। আমার পাশে এসো। শুধু কম্বলে কি শীত মানে? তুমি বসে থাকবে আর আমি একা একা ঘুমোবো! কম্বলের চেয়ে তোমার শরীরের উষ্ণতা বেশি কামনীয় ...

: কিরে শিল্পী, টেবিলে বসে ঘুমাচ্ছিস কেন?
মা কখন দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন টের পায়নি শিল্পী। ছবি আঁকা বাদ দিয়ে কখন টেবিলে এসে বসেছে ও! মনে পড়লো না। নীলকে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলো, নাকি জেগে জেগে কথা বলছিলো ও লোকটার সাথে! মা কি শুনে ফেলেছে কিছু!

: বিছানায় গিয়ে আরাম করে ঘুমা। আর বেশি রাত জাগিস না। -মা বলে উঠলেন আবার।
: এইতো মা শুবো। তুমি যাও।

মা চলে গেলে আবার ভাবনা্য় ডুবে গেলো ও। মানুষটিকে নিজের চোখে দেখেনি। শুধু ছবি দেখেছে। কি সুন্দর ফিগার! আর কি লম্বা! পাঁচ ফুট নয় ইন্ঞি। একেবারে ওর মনের মত। পুরুষের এই হাইটটি ওর সবচেয়ে পছন্দ। পুরুষ মানুষ হিসেবে ও একটু শুকনা হলেও বাকি সবকিছু মিলিয়ে এটা কোন খুঁতই নয়। সবাইকি পারফেক্ট হয়! অসাধারণ দুটি বড় বড় চোখ ওর। একেবারেই আলাদা। অন্য কারো সাথেই মিলেনা। ঐ চোখ সে বেশিরভাগ সময়েই সানগ্লাস দিয়ে ঢেকে রাখে। কারণটা জানেনা ও। কিন্তু, শিল্পীর নিজের ধারনা, ঐ চোখ ঢেকে রাখাই ভালো। তাকানো যায়না ঐ চোখে। খুন হয়ে যেতে হয়। যেমন হয়েছে ও নিজে। মনে মনে বলে ওঠে...
...ঐ চোখ ঢেকেই রাখো নীল


আমায় করেছ খুন


আর কারো করোনা সর্বনাশ।

"তোমার চোখেতে ধরা পরে গেছি আজ/ তোমার চোখেতে ধরা পরে গেছি আজ" ...গুনগুনিয়ে গানটা গাইতে গাইতে প্লেটে রং মেশাতে মেশাতে ইজেলে লাগানো ক্যানভাসের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ছবিটা খুব তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে। সামনেই নীলের জন্মদিন। এবস্ট্রাক্ট মুডের ছবি খুব পছন্দ ওর। ওর নিজেরওকিন্তু, প্রথম দিকে রিয়েলিস্টিকই বেশি আঁকতোএবস্ট্রাক্ট ছবি আঁকা শুরু নীলের কথাতেই। বলা যা্য়, ও-ই ওর অনুপ্রেরণা।

বুয়েট থেকে এম.এস.সি করা টেলিকম ইঞ্জিনিয়ার এই লোকটির সাথে শিল্পীর পরিচয়ের সূত্রতা আবছা হয়ে এলেও প্রথম ফোনে কথা বলার মুহূর্তটা এখনো কানে বাজে।

: সারাদিন বাসায় বসে কি করেন? চলে আসুন না আজ আমাদের আড্ডায়!

এত সুন্দর কন্ঠস্বর! পরিস্কার উচ্চারণ। মনে হয় সারাক্ষণ কথা বলে। কথা শুনে। লোকটা বয়সে বছর দু-তিন সিনিয়র হবে ওর চেয়ে। প্রাণবন্ত যুবক! গাম্ভীর্যের মুখোশ এঁটে থাকে। আর দেখলে মনে হয়, পাত্তা দিতে চায়না। একটু আড়াল রাখার ব্যর্থ চেষ্টা?

লোকটা একটু মুডি। শিল্পী বোবা টাইপের নয়। একেবারে নতুন কারো সাথেও দিব্বি জমিয়ে তুলতে পারে। নীলের সাথেও প্রথম বেশ কথা বলতো। কিন্তু, ওকে নিয়ে ভিন্ন করে ভাবতে শুরু করার পর থেকেই সরাসরি কথা বলতে গিয়ে সহজ হতে পারেনা আর। লোকটা একটু কম কথা বলে। তবু, ফোন করলে কথাতো বলেই। ইচ্ছে হলেই ফোন করা যা্য়। কথাও বলা যা্য়। কিন্তু, ফোনটা হাতে নিয়েই শিল্পীর কি যেন হয়ে যায়। ভাবতেই থাকে! শুধু ভাবতেই থাকে! ইতস্তত ভাবটা কাটেই না। ফোন করে কি বলবে? কোন কারনতো নেই। অথচ, সে সারাক্ষণ নীলের সাথে মনে মনে কত কথার জাল বুনে যায়।

নীলের লেখা কবিতাগুলো খুব ভালো লাগে ওর। তবে, বেশিরভাগ কবিতায় বিষন্ণতা। শিল্পীর ইচ্ছে হয় বলে, কবি তুমি আমার কাছে এসো, তোমার সব দু্ঃখ ঢেকে দেবো। আমার রং-তুলি দিয়ে তোমার সব দুখের রং ঢেকে দিয়ে রংধনুর রঙে রাঙিয়ে দেবো আর বানাবো তোমার আমার ভালোবাসার বৃন্দাবন।

শিল্পী জানে বৃথাই বোনা তার এই সব স্বপনের জাল। শিল্পীর খুব ভালো এক বন্ধু যে নীলকেও চেনে, বলেছিলো ওকে, "তুই অযথাই ওই ভাইয়ার পথ চেয়ে বসে আছিস রে! উনি বিয়ের জন্যে সুন্দরী মেয়ে খুঁজছেন! তোর কোন চান্স নেই।"

শিল্পীরও তাই মনে হয়। নইলে ও কেন একটু ফিরে তাকায় না? এত যে সকাল-সন্ধা এসএমএস; এমনকি মাঝে মাঝে খুব গভীর রাতেও, সেইসব কি এমনি এমনি! 'একটা বর খুঁজে দিন না' বলে বলে যে কান ঝালাপালা, এসবের অর্থ কি লোকটা একটুও বোঝে না? বর না ছাই! ওকেই যে চায় সেটা বুঝি লোকটা একটুও বোঝে না! হঠাৎ খুব মন খারাপ হয়ে যায় ওর। পুরুষগুলো চেহারার সৌন্দর্যের মধ্যে কি পায়! দেখতে ভালো হওয়াই কি সব! পড়াশুনাতেও ও খারাপ ছিলোনা কখনই

শিল্পীরা বিশাল ধনী না হলেও অবস্থা খারাপ নয়। মধ্যবিত্ত। ঢাকা শহরে নিজেদের বাড়িধানমন্ডি এলাকায়। যেটা ঢাকার প্রাণকেন্দ্র। সবাই ওর বিয়ের চেষ্টা করছে। আঠাশ পেরিয়ে যাওয়া মেয়ের জন্য বাবা-মায়ের ভাবনা হবে এটাইতো স্বাভাবিক। ভালো ভালো প্রস্তাবও আসে। ভালো পেশায় নিয়োজিত সুন্দর সুন্দর পাত্র। অপছন্দনী্য় নয়। মানা করার মতও নয়। কিন্তু, ও রাজী হতে পারেনা। শুধু নীলের জন্য! এদিকে ওর বাকি বোনগুলোও যে সিরিয়ালে রয়েছে।  

বেশ রাত হয়ে গেছে। ফজরের সময় হয়ে আসবে ঘন্টা দুয়েক পরেইতাড়াতাড়ি ঘুমনো দরকার। নীল, কি করছো এখন? দেশের বাড়ি গেলে কেন এই শীতের মধ্যে হঠাৎ! তাও কোন ছুটির দিনে নয়! তবে কি বিয়ে করতে যাচ্ছ? খুব খুশি খুশি মেজাজ দেখলাম। ঐ কাজ করোনা তুমি প্লিজ! প্লিজ তুমি আর কারো হাত ধরোনা। তোমার নির্ঘুম রাতের সংগী কর শুধু আমাকেইপ্রতিটি রাত এক একটি আনন্দঘন সোনালি স্মরনীয় রাত করে দেবো! কষ্ট করে গল্প বা কবিতাগুলো তোমায় টাইপ করতে হবে না। আমি তোমার পরিশ্রম কমিয়ে দেবো শতভাগ। তোমার হয়ে ওটা আমিই করে দেবো। জোৎস্না রাতে আমায় তোমার বাঁশির সুরে পাগল করবে। তোমাকে না পেলে আমার এই জীবনটাই যে বৃথা। তোমার ঐ ঠোঁটের আদর শুধু আমার! শুধু আমার!

আমি নাহয় তোমায় মুখ ফুটে বলতে পারিনা। কিন্তু তুমি তো একবার আমায় বলতে পারো। তোমার মুখে শোনার জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে আমাকে?  বুড়ি হয়ে গেলে! কবি নির্মলেন্দু গুন এর গল্পের নায়িকার মত তখন বলবো তোমায়-আমার ঈশ্বর জানেন, আমার চুল পেকেছে তোমার জন্য! আমার ঈশ্বর জানেন, আমার জ্বর এসেছে তোমার জন্য! আমার ঈশ্বর জানেন, আমার মৃত্যু হবে তোমার জন্য! তারপর ঐ ঈশ্বরের মতো কোন একদিন তুমিও জানবে, আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য! শুধুই তোমার জন্য।

নীল এখন কি করছো? হয়তো কোন সুন্দরীর স্বপ্ন আঁকছো! বা লিখছো নতুন কোন লেখা। অথবা, তুমিও হয়তো শোয়ার আয়োজন করছোনাকি "শুভ-রাত্রি" লেখা শিল্পী নামের এক অচেনা মেয়ের এসএমএস পড়ছো! হয়তো জেগে আছে নির্ঘুম। হয়তো...
নরম কোলবালিশের ভেতরে মুখ ডুবিয়ে দিয়ে ভাবতে থাকে শিল্পী শুধু ভাবতে থাকে আর নিরবে চলে কথোপকথন মনের ভেতরে যে আরেকটি মন আছে সেই মনে আশেপাশে সব নিরব ঘর অন্ধকার নীলের বুকের ভেতরে ঢুকে যেতে যেতে প্রগাঢ় চুম্বনের স্বপ্নে বিভোর শিল্পী একসময় ডুবে যায় গভীর ঘুমে

।।দুই।।
যাকে নিয়ে গল্পের মূল চরিত্র শিল্পী’র এত বাঁধভাঙ্গা আবেগ, এবার তার ভাবনাগুলো জানা যাক- 
নীল। নীল হায়াৎ! পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। সরকারি চাকুরির দাফতরিক পেশার ফাঁকে কলম চালান কি-বোর্ডে। পেশাগত ব্যস্ততার এক ফাঁকেই চোখ বুলিয়ে নেয় নিজের শখের লেখার ভুবনে। অল্পকিছু বইও প্রকাশিত হয়েছে একুশে বইমেলায়।     
ছাপার অক্ষরের সৌখিনতার পাশাপাশি নীল আগ্রহী ছবি তোলায়। মিরপুর দশে নিজের ডুপ্লেক্স বাড়ির একতলার সিড়ি হতে ছাদ পেরিয়ে খোলা নীল আকাশ সহ পেশাগত অফিসবাড়ি ও সেই বাড়ি যাওয়ার পুরো পথের বিন্দু বিন্দু জীবের স্পন্দন ফ্রেমে বন্দী করে নিতে যেন ততপর থাকেঅফিসে নেয়ার বড় ব্যাগে ল্যাপটপের পাশে এক কোণায় বেশ আয়েশী কায়দায় ভরে নিয়ে বের হয় প্রতিদিন ডিএসএলআর ক্যামেরাটি।
এমনি একদিন, অফিস ছুটির পরে ধানমন্ডিতে দরকার ছিলো। রাস্তার দৃশ্য দেখতে দেখতে আসছিলো। ছবি তোলার সাবজেক্ট এত আশেপাশে! কিন্তু, রাস্তাটা বৃষ্টিতে পানি জমা। ধানমন্ডি এলাকাতেও এরকম অবস্থা হয়! এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে দেখলো, এক বাসার বারান্দা থেকে বেশ গলা বাড়িয়ে মে ফুল ওকে ডাকছেক্যামেরা তাক করে কয়েকটা শট নেয়া হয়ে গেলেই নিচে ঐ বাসার গেটের কাছে চোখে পরলোএক একুশ বাইশ বছরের তন্বী ললনা দাঁড়িয়ে শরীরের বঙ্কিমে কোথাও যেন খুঁত নেই এতটুকু। বিধাতা যেন নিজ হাতে গড়েছেন প্রতিটি ফোঁটা! মুহুর্তেই কয়েকটা শট নিয়ে নিলো সে মেয়েটিরও। ভালো লাগলো মেয়েটিকে। অমাবস্যার অন্ধকারেও যে এত সৌন্দর্য্য থাকে এই জানলো! কালো মেয়েটা!
নীল যে জন্য ধানমন্ডি এসেছিলো রিকশা চলতে থাকলো সেদিকে। ক্যামেরায় আরো অনেক দৃশ্যপট বন্দী করে নিতে নিতে ও এগুতে লাগলো।
যেতে যেতে ধানমন্ডি সাতাশ নম্বর রোড ছাড়িয়ে আড়ং এর দিকে মোড় নিলো রিকশাটা। একটু ঢুকেই থেমে গেলো একটি কমলা টাইলস বাঁধানো বাসার সামনে। এখানে ইফতি থাকে। ওর জানের দোস্ত। ওদের বাসায় একটা দাওয়াত ছিলো। দারোয়ান গেট খুলে দিলে সোজা লম্বা লম্বা পা ফেলে তৃতীয় তলার ডান দিকে এসে বেল চাপলো। ভেতর থেকে খুব কলকল হাসির শব্দ ভেসে আসতে আসতে দরজায় এসে থামলো কণ্ঠটা। দরজা খুলে দিলো মিষ্টি একটি পান পাতা মুখের গড়নের মেয়ে। ইফতির ছোট বোন। ভেতরে ঢুকতেই আরো কিছু গেস্ট দেখতে পেল। তাদের মধ্যে চোখ আটকে গেলো একটি দৃশ্যপটে। একটু আগে যাকে ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী করে নিয়েছিলো সেই কাজল কালো মেয়েটা! কে সে? তাকিয়েই ছিলো বলে ইফতি পাশ থেকে বলে উঠলো, “শিল্পী। অংকন শিল্পী!”
নীল প্রথমটায় বুঝতে পারেনি। কি বললো ইফতি। “অংকন শিল্পী মেয়েটা? নাম কি ওনার?”
ইফতি এবার হেসে উঠলো শব্দ করে, “জানতাম তুমি এই কথাই বলবে বন্ধু। ওর নাম শিল্পী। আর ও চিত্রশিল্পী! এইবার কি বুঝাতে পারলাম?”
এর মধ্যে শিল্পীও কাছে এগিয়ে এসেছে। “বেশ সপ্রতিভ তো মেয়েটা! কালো কৃষ্টাল মূর্তি যেন!”

।।তিন।।
নিজের বাইক নিয়ে মাঝে মাঝে ছুটির দিনে শহরের বাইরে গ্রামের দিকে চলে যাওয়া এক অন্যরকম নেশা নীলের। আর, গ্রামের পরিবেশ নিজের চোখে দেখে অন্তরে অনুভব করে তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে ফুঁটিয়ে তোলার কৃতিত্বে চোখেমুখে আত্মগর্বে গর্বিত শিল্পীএইরকম দুই ভিন্ন স্বাদের ভিন্ন মনের দুটি মানুষের হৃদয়ের একদিন দু’দিন করে গুটি গুটি পায়ে কাছাকাছি আসার।
এভাবেই একদিন_____
দু’জনে মিলে বের হয়েছে শহর সীমায়। অনেকটা শহর থেকে বিচ্ছিন্ন। আকাশ মেঘ করবে বোধহয়। সামনে পেছনে শুধু চোখে পরছে পিচের রাস্তা। হঠাত বাইক থামিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে পরলো নীলশিল্পী বলে উঠলো, “কি ? যাবে না?” আশেপাশে তাকিয়ে বলে উঠলো, “ওয়াও! কি সুন্দর!” বলে সেও নেমে এলো।
বাইকে হেলান দিয়ে দুজনে প্রকৃতির অপরূপ রূপ উপভোগ করলো কয়েক মুহুর্ত।
নীল বলে উঠলো, “চোখ বোজো। একটা কবিতা শুনাই...”
শিল্পী কিছু না বলে চোখ বুজে মিষ্টি মিষ্টি হাসতে লাগলোআর ওর কানে ভেসে এলো, নীলের ভরাট গলা...
“দেখেছো কি সুন্দর


এক প্রান্তরে এসে দাঁড়িয়েছি,


সামনে পেছনে যেদিকে তাকাই


শুধু নীল দিগন্ত,


পা ছড়িয়ে বসেছে!


বরণ করবে বলে


আমার তোমায়;


এমন একটি জায়গাই খুঁজছিলাম,


বহুদিন ধরে; খুঁজছিলাম!


বহুদিন ধরে জমিয়ে রাখা


একটি আত্মার চেয়েও প্রিয়,


কথা বলবো তোমায়!” 

...থেমে গেলো কণ্ঠটা! কন্ঠে কি যেন ছিলো। শিল্পী চোখ খুলে দেখতে পেলো, নীল তাকিয়ে আছে ওরই দিকে। হাতে একটা ছোট্ট বাক্স! কিসের বাক্স? নীল ওটা ওর দিকে বাড়িয়ে ধরতেই, শিল্পী বলে উঠলো, “আংটি?” হ্যাঁ-সুচক মাথা নেড়ে বাক্স খুলে নীল ওর হাতে পরিয়ে দিলো নীল মুক্তো বসানো অপরূপ আংটিটা! আর এই মুহুর্তে এই প্রেমে বিগলিত দুই নর-নারীর ভালোবাসার সার্থক মিলন দৃশ্যটা বাঁধা পরলো বিধাতার নিজস্ব ডিএসএলআর ক্যামেরা বা স্বপ্নীল ক্যানভাসে।

(সমাপ্ত)

রবিবার, ৮ এপ্রিল, ২০১২

ছোটগল্পঃ “একদিন স্বপ্নের দিন”


কথাতো প্রায় প্রতিদিনই হয়। হচ্ছে সেই এক বছর, কিংবা তার বেশিও হতে পারে। কিন্তু দেখা হয়নি। একবার অনেক জোরাজুরির পর নিজের ফটো পাঠিয়েছিল ইমেইলে। তাও শুধু এক পলক দেখেই ডিলিট করে দেয়ার শর্তে!
মাঝে হারিয়ে গিয়েছিল প্রায় এক বছর? না না , এক বছর নাহ! আমার নেপাল শিক্ষা সফরের দিনও সকালে ফোন করেছিল। তবে আর যোগাযোগ না করার শর্ত জুড়েছিল!!
ও এক পশলা বৃষ্টির মত আমার কাছে আসে যায়। আসে! যায়! চলে যায়। আবার ফিরে ফিরে আসে! এ এক অন্য রকম!
আমাকে ওর ইদানিং খুব দেখার শখ হয়েছে। দেখবে , কথা বলবে। বলবে ওর সব বলা না বলা যত কাহিনী। আমাকে কেন যে ওর এত বেশি ভাল লাগে সেটা আমি বুঝিনা। ছেলেরা সাধারণতঃ যে কারনে কোন মেয়ের প্রতি দূর্বল হয় সেরকম কিছু তো ভাবা যায়না। আমাদেরতো দেখাই হয়নি। ফেসবুক-এ শুধু একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি দেখে কি কারো প্রতি প্রেমানূভূতি জাগতে পারে! আমি অবাক হয়ে যাই। বার বার!
ও খুব সুন্দর করে কথা বলে! আর আমি? আমার মেজাজেরতো কোন ঠিক ঠিকানা নেই। এই ভালো, এই মন্দ! আমি আমার মেজাজের সবটাই ঝেরে ফেলি ওর উপর। ওহ, এতক্ষনও বলাই হয়নি, কার কথা বলছি। ও আমার প্রিয়! খুব প্রিয় একজন! ও শুধু আমার খুব প্রিয় একজন মানুষই নয়, ও আমার সবকিছু। সে আমার প্রতিটি মুহুর্তে জড়িয়ে আছে!
ইদানিং ও অফিসের কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকছে আমার সাথে একটু দেখা করার জন্য ওর সময় হয়ে উঠছেনা!


আমার ছিল ভাইভা পরীক্ষা। কথা ছিল আমাকে আমার ভাইভা শেষে নিতে আসবে বাসায় পৌঁছে দিবে। অতটা আশা করিনি যে বাসা পর্যন্ত আসার সময় হবে। ওর অফিস ছুটি হয় সন্ধা সাড়ে সাতটার পর। তবে, আগে হতে বললামনা কিছু, যদি রাগ করে আসাই বাদ দিয়ে দেয়! তারপর, এলো সেই দিন! আমি আমার ভাইভার চেয়েও অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি আজ মাহীর সাথে দেখা হবে! বলা যায় ওর কারণেই আমি ভাইভা বিষয় নিয়ে ছিলাম শংকামুক্ত!
ভাইভা পরীক্ষাকেন্দ্রে জায়গামত পৌঁছে বাসায় ফোন দেবার আগে ওকে মেসেজে জানালাম। এর মাঝে আমি ব্যস্ত হয়ে গেলাম ভাইভা বোর্ডে সাইন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য। ফোন ছিল ভাইব্রেশনে। ও যে একবার ফোন করেছিল টেরই পাইনি। আমি আবার যখন ট্রাই করলাম, দেখি ফোনটা বন্ধ। আরে এসময় আবার বন্ধ কেন? ভাবতেই কেমন জানি মনে কু-ডাক দিল! হু, বুঝছি , আসবেনা! তাই গেলাম রেগে। দিলাম একটা রাগী এস এম এস, 'কি ব্যাপার, ফোন কেন বন্ধ থাকে?' পরে মেসেজ এলো, "আমি মিটিং এ" ! "ধুর ছাই , আজ আবার কেন মিটিং আর এই সময়ে!" আসলে, মিটিং তো হতেই পারে! এইসব অফিসিয়াল ব্যাপার। আগে হতে কোন কিছু বলা যায়না প্রাইভেট ফার্মে। আমি অযথাই ক্ষেপে যাচ্ছি! মনকে বুঝালাম। আবার এক ঘন্টা পরে আমি ওকে মেসেজ পাঠালাম, "শোন, আমার ভাইভা আর একটু পরেই শেষ হয়ে যাবে। তুমি চারটায় অফিস হতে বেরিয়ে পরো।" আবার মেসেজ এলো, " "আমি এখনও মিটিং-এ"। এইবার মেজাজ গেল খিচড়ে! যাহ্, বুঝছি, আর আজ দেখা হবেনা! আমার চেহারায়ও সেটা প্রকাশ পেয়ে গেল। অনেকক্ষণ ধরে , ইডেন কলেজ হতে আসা আরেক ক্যান্ডিডেট এর সাথে পাশাপাশি বসে কথা হচ্ছিল। আমার পরেই ওর সিরিয়াল। সে আমাকে বললো, "আপু, আপনার কি খুব টেনশন হচ্ছে?" আমি বললাম, "কেন? আমার চেহারায় প্রকাশ পেয়েছে বুঝি?" ও বললো, "হ্যাঁ"!
আসলে, সত্যি কথা জানেন, মাহীকে আমি যতই বলি, ও আমাকে যতটা ভালবাসে, আমি তার এক কানাকড়িও ভালবাসিনাওকে মিস করিনা। কিন্তু, আমার চেয়ে সেটা আর কে বেশি জানে যে, আমি ওকে পাগলের মত মিস করি। ও আমাকে এতটা দিয়েছে যে, সেটা আসলে কথা দিয়ে বলে বোঝান যাবেনা বা শেষ করা যাবেনা। ওর কথা পুরোপুরি বলতে গেলে একটা উপন্যাস লেখা হয়ে যাবে।
আমারতো মেজাজের কোনও ঠিক ঠিকানা নেই। দিনের মধ্যে হাজার বার আমার মনটার দিক বদল হয়। আমি ওকে সকাল সন্ধ্যা কত উপদেশ যে দেই! এই করোনা, ওই করোনা, এটা ঠিক নয়, ওটা ঠিক নয়, এভাবে চলো, ভাল হবে! যেন ও একটা শিশু! আমি ওকে শিশুর মত আগলে রাখি। বা রাখতে চাই। আসলে ওকে সামনাসামনি দেখিনিতো, তাই বোধ হয় এমন করে বলতে একটুও বাঁধেনা! মাঝে মাঝে বকাঝকাও করি! অবশ্য আর একটা কারণও আছে! আসলে হয়েছে কি জানেন, ওর বাবা-মা না আমাদের সম্পর্কটা মেনে নিচ্ছে না!কিন্তু, ও খুব পাগল আমার প্রতি! খুব! প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পথে ও আমাকে একবার ফোন দেবেই। অফিস ছুটির পর হতে একেবারে বাসায় পৌঁছানো পর্যন্ত ওর সারাদিনে কি হলো না হলো সব আমাকে বলা চাই। সেজন্যে ও বসুন্ধরার অফিস হতে বের হয়ে কল্যাণপুরে বাসা পর্যন্ত যেতে যেতে পুরো সময়টা আমার সাথে কথা বলবে।
সে যাই হোক, যে কথা বলতে চেয়েছিলাম। ওতো বললো, ওর মিটিং। আমি আমার ভাইভা শেষ করে দেখি ওর মোবাইল বন্ধ। আমার একটা মজা করার ইচ্ছে হলো। ওকে একটা মেসেজ পাঠালাম, "শোন, বুঝেছি, শুধু আজ কেন, তোমার সাথে আর কোনদিনই মনে হয় আমার দেখা হবেনা। আমি এখন বাসে। বাসায় চলে যাচ্ছি।" কিন্তু, বাস ধরলাম আসলে, বসুন্ধরার উদ্দেশ্যে। ওর অফিস এর কাছে। বাস ঠিক ওর অফিসের সামনে দিয়ে যাবেনা। তবে, একটু হেঁটে গেলেই ওর অফিসে যাওয়া যাবে।
বাসে চড়ে বসার পরও খালি মন দোনোমনো করতে লাগলাম, যাব নাকি যাবনা। এই করতে করতে বাস ওর অফিসের রাস্তা কিছুটা ছাড়িয়েও গেল। দুজন লোক নামছিল বাস হতে। আমি আমার পাশের লোকটাকে বললাম, "এটা বসুন্ধরা ছাড়িয়ে গেলনা?" লোকটি হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়তেই আমি ছুটে নেমে গেলাম বাস থেকে। তারপরেরটুকুতো ইতিহাস!!
আমি প্রথমে ওর অফিসে ঢোকার রাস্তাটা পাচ্ছিলাম না। বিশাল এরিয়া। বেজমেন্টে নেমে সিক্যুরিটিকে বলতেই বুঝিয়ে দিল কোন পথে ঢুকতে হবে। আমি অফিসের দরজা দিয়ে ওর অফিসের সামনে বসা সিক্যুরিটিকে নাম জানালে, "খন্দকার মাহী স্যারের কাছে এসেছে" জানিয়ে আমাকে একেবারে সরাসরি ওর রুমে নিয়ে গেল। ওইখানে বসা আরো তিন জন ভদ্রলোক। অফিসার। ওর কলিগ। আমি এতক্ষণ ধরে ছুটে চলা স্বপ্ন হতে বেড়িয়ে এলাম। কবে ওর ছবি দেখেছিলাম! ভুলেই গেছি! আর, শুনেছিলাম এই নামে আরো একজন আছে এই অফিসে। আর তাছাড়া, সেই মূহুর্তে মনে হলো, যদি দেখা গেল, আসলে এই অফিসে ওই নামে যে থাকে সে আসলে অন্য কেউ! কেমন ভয় ভয় করতে লাগলো। অথচ, কে নিয়ে আমার এরকম টেনশনের কোনও কারন নেই! ইন্টারনেট দুনিয়ার মানুষগুলো অধিকাংশই ভুয়া হলেও, আমার মানুষটাকে আমি কখনোই অবিশ্বাস করতে পারিনি এক পলকের জন্যও। ওর প্রতিটা কথা আমি বিশ্বাস করে গেছি একেবারে শুরু হতে শেষ পর্যন্ত। তবু, আজ এই মুহুর্তে কেমন অস্বস্তি লাগছে!
'উনি অফিস হতে চলে গেছে!' 'না চলে যায়নি''আরে না এই মাত্র বেরিয়ে গেল!' এরকম কয়েক রকম কথা শুনতে লাগলাম ওর কলীগদের মুখ হতে। তার মধ্যে একবার দেখি, ও এসে দাঁড়িয়েছে, ওই রুমের দরজায়! কার সাথে জানি কথা বলছে! একটু বাঁকা হয়ে দাঁড়ানো। আমি ভাবলাম, থাক্, দেখি, ও আগে আমাকে দেখে কিনা!
পরে যখন ও ওই রুমে ঢুকলো, ওর কলীগরা মনে হয় মজা পেয়ে গেছে! আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো, "এই কি 'আপনার মাহী'?" আমার হাসি পেয়ে গেল। সম্মতি জানালাম। আর ওকে বললো, "কি ভাই, আপনি না একটু আগে এই দরজার কাছে আসলেন, ওনাকে (আমাকে) দেখেন নাই?" ঘাড় নেড়ে না সূচক জানালো।
ও মনে হয় এখনি বেরোবে। আমাকে দেখে ও সত্যি অবাক হয়ে গেছে! ওর প্রমি যে অফিসে যাবে ওকে না জানিয়ে এটা ও ভাবতেই পারেনি!! তবে, কলিগের সামনে সেটা ধরা দিল না। আমি নিজেওতো ভাবতে পারিনি যে কখনো, কোনদিন ওর অফিসে যাবো। সারপ্রাইজ দেয়ার ইচ্ছে ছিলো এবং তা সত্যিই দিয়ে দিলাম!!
তার পর আর কি! বেরিয়ে এলাম দুজনে! হেঁটে হেঁটে পার করলাম অনেকটা পথ। ও রিকশা নিতে চেয়েছিল। আমার বাসায় পৌঁছে দিতে চাইলো। আমি বললাম, "রিকশা নিওনা, তাহলে পথ ফুরিয়ে যাবে দ্রুত!" শুনে ও হেসে দিল, "আচ্ছা, ঠিক আছে , চলো।" হেঁটে হেঁটে চলে এলাম বাসা পর্যন্ত! একটা দিন যেন স্বপ্নের মত কেটে গেল! যে স্বপ্ন ঘুম ভেঙ্গে মুছে যাবেনা!